চট্টগ্রাম শনিবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০২৩

সর্বশেষ:

১৬ মার্চ, ২০২২ | ১১:৪৫ অপরাহ্ণ

রশীদ এনাম

নবম মৃত্যুবার্ষিকীতে স্মরণ

বিশ্ববরেণ্য গণিতবিদ ও ভৌতবিজ্ঞানী প্রফেসর ড. জামাল নজরুল ইসলাম

দেশের জন্য অকৃত্রিম ভালোবাসার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানী বীরচট্টলার গর্ব প্রফেসর ড. জামাল নজরুল ইসলাম। ছাত্রজীবন থেকেই তাঁর ঘনিষ্ট বন্ধু ছিলেন, বিস্ময়কর বিজ্ঞান-প্রতিভা শিক্ষক স্টিফেন হকিং। তার সম্পর্কে বলতে গিয়ে স্টিফেন হকিং বলেছিলেন, জেএন ইসলাম আমার রূমমেট এবং আমরা ছিলাম পরস্পর বন্ধু এবং পরস্পরের শিক্ষক। ১৯৬০ সাল থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত হকিং যেসব বিজ্ঞানীদের নিয়ে গবেষণা করেছেন , তন্মধ্যে জেএন ইসলাম ছিলেন অন্যতম।

জগদীশ চন্দ্র বসু প্রথম রেডিও আবিষ্কার করলেও কৃতিত্ব চলে গিয়েছিল মার্কনির কাছে। ঠিক তেমনটি ঘটেছে জেএন ইসলামের   ক্ষেত্রেও। ১৯৭৩-৭৪ সাল পর্যন্ত লন্ডনের কিংস কলেজ ফলিত গণিতের শিক্ষক, ১৯৭৫-৭৮ সাল পর্যন্ত কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়ে সায়েন্স রিসার্চ ফেলো এবং ১৯৭৮ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত লন্ডনে সিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। ৩০ বছরের অভ্যস্ত জীবন, সম্মানজনক পদ, গবেষণার অনুকূল পরিবেশ, বিশ্বনন্দিত নোবেলবিজয়ী গুণীজন সাহচর্য এবং লক্ষ টাকার লোভনীয় চাকরি ছেড়ে দুই মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে শেকড়ের টানে স্বদেশে ফিরে আসেন। অল্পবেতনের চাকুরীতে ১৯৮১ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত বিভাগে যোগদান করেন।  তাঁর কাছে অর্থ যশ খ্যাতি, নোবেল পুরষ্কারের চেয়েও  মূল্যবান ছিল স্বদেশপ্রেম।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনাকালীন জামাল স্যারের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠা করা হয় রিসার্চ সেন্টার ফর ম্যাথমেটিক্যাল এন্ড ফিজিক্যাল সায়েন্স বা গণিত ভৌতবিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র। যার বর্তমান নাম ‘জামাল নজরুল ইসলাম গণিত ও ভৌতবিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র’। অধ্যাপনার পাশাপাশি তিনি পরিবেশ, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং নাগরিক আন্দোলনসহ সামাজিক দায়বদ্ধতার জন্য নিরন্তর কাজ করে গেছেন। গরিব-মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতি ভালোবাসার হাত বাড়িয়েছেন।

তিনি ছিলেন পরোপকারী ও সাদামনের চীরসবুজ এক বিরল চেতনার কীর্তিমান ব্যক্তি। তিনি গবেষণার পাশাপাশি ছবি আঁকা, গান গাওয়া এবং পিয়ানো এবং সেতার বাজাতেন। তিনি দারিদ্র দূরীকরণের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন বাংলাদেশের উপর স্টিমরোলার চালিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন প্রফেসর জামাল নজরুল ইসলাম স্যার বসে থাকেননি। তিনি বাংলাদেশের উপর নারকীয় গণহত্যার কথা জানিয়ে বৃটেনের প্রধানমন্ত্রীর কাছে চিঠি লিখেছিলেন, যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য। ক্যামব্রিজের শিক্ষক ও বিজ্ঞানী হিসেবে তাঁর আবেদন ছিল অত্যন্ত কার্যকর। এই চিঠি পেয়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ করেন।

চাটগাঁর বরপুত্র মানবতাবাদী বিজ্ঞ সহজ সরল সদালাপি মানুষটি তাঁর জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময়টুকু নিজভূমের জন্য ব্যয় করেন নিঃস্বার্থভাবে। দেশের সহিংসতা মারামারি হানাহানি সমাজে হিংসা ও পুজিঁবাদীদের দৌরাত্ম্য, অসিহষ্ণুতার অশুভ ছায়া তাঁর মনে কষ্টের আঁচড় কাটত। মানুষের মধ্যে যে পশুত্ব লোভ লালসা স্বার্থপরতা তাঁর মনে কষ্ট দিত। তিনি সবসময় সমাজের বৈষম্য, প্রকৃতি ও পরিবেশ এবং গরিবের স্বার্থবিরোধী কাজের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে গেছেন। দেশের শিশুদের কথাও তিনি ভাবতেন, তিনি বলতেন, “শিশুরা আমাদের ভবিষ্যৎ। তাই ভবিষ্যৎকে উজ্জ্বল, মঙ্গল ও নিরাপদ করতে হলে আমাদের সর্বাগ্রে শিশুদের আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং মননশীল অনুভব সৃষ্টির মাধ্যমে শিশুদের আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা যায়”। ২০০১ সালে বিজ্ঞানীরা বলেছিলেন পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। প্রফেসর জামাল নজরুল ইসলাম গণিতের হিসাব কষে পৃথিবীর মানুষকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, সে রকম কোন আশঙ্কা নেই, প্রাকৃতিক নিয়মে সৌরজগতের সবগুলো গ্রহ একই সরলরেখা বরাবর চলে এলেও তার প্রভাবে পৃথিবী নামক গ্রহের কোন ক্ষতি হবে না। সে সময় তাঁর কথাটি সত্য প্রমাণিত হয়েছিল।

ভৌতবিজ্ঞানী এমেরিটাস প্রফেসর জামাল নজরুল ইসলামের লেখা ‘দি আল্টিমেট ফেইট অব দি ইউনিভার্স’ ছিল তাঁর প্রথম এবং শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ। বইটি ১৯৮৩ সালে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস থেকে প্রকাশিত হয়। বইটি ত্রিশটি দেশের ভাষায় অনূদিত হয়। পৃথিবী বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বইটি পাঠ্যবই হিসেবে গৃহীত হয়। এছাড়াও তাঁর উল্লেখ্যযোগ্য বইগুলো হলো ‘রোটেটিং ফিল্ডস ইন জেনারেল রিলেটিবিটি’, ‘এন ইন্ট্রোডাকশন টু ম্যাথমেটিক্যাল কসমোলজি’, ‘ক্লাসিক্যাল জেনারেল রিলেটিভিটি’, ‘এন ইন্ট্রোডাকশন টু ম্যাথমেটিক্যাল ইকনোমিক্স এন্ড সোশ্যাল চয়েস’, ‘কনফাইনমেন্ট এন্ড ¯স্রোডিংগার ইকুয়েশন ফর গাউস থিওরিস’, ‘এন ইন্ট্রোডাকশন টু ম্যাথমেটিক্যাল ইকনোমিক্স’ বইটি প্রফেসর জামাল নজরুল ইসলামে ১৭ বছরের গবেষণার ফল। তিনি বাংলা বই ও রচনা করেছেন, বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ‘কৃষ্ণবিবর’, ‘মাতৃভাষা ও বিজ্ঞান চর্চা’, ‘শিল্পসাহিত্য ও সমাজ’ ‘ভাষা শহীদ গ্রন্থমালা’সহ আরও অনেক প্রবন্ধ রচনা করেগেছেন তবে সবসময় বলতেন, ‘গণিত ছাড়া বিশ্ব অচল’।

দিপ্তীমান বিশ্ববিজ্ঞানী প্রফেসর জামাল নজরুল ইসলাম ভারত, পাকিস্তান, ক্যামব্রিজ, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জাপান, ইটালি, জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশে পড়ালেখার পাশাপাশি গবেষণা, অধ্যাপনা করেছেন। তার সাথে বিশ্বের নোবেল বিজয়ীদের নিবিড় বন্ধুত্ব ও ঘনিষ্ঠতা ছিল। অনেকে ছিল তাঁর গবেষণার সহকর্মী। তাঁদের মধ্যে অন্যতম নোবেল বিজয়ী পদার্থ বিজ্ঞানী আবদুস সালাম, ওয়েনবার্গ, জোসেফসন, ফ্রিম্যান ডাইসন, রিচার্ড ফাইনম্যান, সুব্রক্ষনিয়াম চন্দ্রশেখর, অমর্ত্য সেন এবং অমিয় বাগচী,জয়ন্ত নারলিকর, ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ জিম মার্লিস, হকিং, রজার পেনরোজ, জ্যা অ্যান্দুজ, মার্টিন রিজ, লুইজ জনসন, হোয়েল, জন টেইলর, অধ্যাপক জ্যাজ ওয়ান প্রমুখ।

জামাল স্যারের সাথে সবচেয়ে বেশি সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক ছিল অমর্ত্য সেন এবং স্টিভেন হকিং-র সাথে। হকিং চাইতেন, জামাল নজরুল ইসলাম লন্ডনে থেকে যাক। হকিং বলতেন, ‘তুমি এখানে থেকেও তো দেশের জন্য অনেক কাজ করতে পারো’। জামাল নজরুল ইসলাম বলতেন, ‘না আমি দেশে থেকে দেশের জন্য দেশীয় পদ্ধতিতে কাজ করব’। আহা দেশের জন্য কি মায়া কি প্রেম। এই প্রেম মায়া না থাকলে হয়ত তিনিও আজ হতেন একজন নোবেল বিজয়ী। তিনি ক্যামব্রিজে বিএ ডিগ্রিতে অসাধারণ ফলের জন্য টাইসন মেডেল লাভ করেন। ১৯৬২ সালে স্মিথস প্রাইজ লাভ করেন। ১৯৬৫ সালে ভারতের তৃতীয় সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান পদ্মভূষণ লাভ করেন। ১৯৬৭ সালে অ্যাডামস প্রাইজ লাভ করেন। ২০০৪ সালে ভারতের পদ্মবিভূষণ লাভ করেন। ২০১১ সালে তিনি মহারাষ্ট্র সরকারের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান মহারাষ্ট্র ভূষণ পুরস্কার লাভ করেন, এছাড়া তিনি একুশে পদক, বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমি স্বর্ণপদক, জাতিয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি পদক, থার্ড ওয়ার্ল্ড একাডেমি লেকচার পদক লাভ করেন।

এই মহান বিজ্ঞানীর সাথে আমার অনেক স্মৃতিময় ক্ষণ আছে। তার কথামালার পরতে পরতে ছিল তীক্ষ্ম মেধামিশ্রিত আলোকশিখা। বিশ্ববরেণ্য পদার্থবিজ্ঞানী, ভৌতবিজ্ঞানী, গণিতবিদ, বিশ্বতত্ত্ববিদ, অর্থনীতিবিদ, জ্যোতিবিজ্ঞানী ও চট্টগ্রামের জিয়নকাঠি এমেরিটাস প্রফেসর জামাল নজরুল ইসলাম স্যার ২০১৩ সালের ১৬ মার্চ চট্টগ্রামের একটি প্রাইভেট হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তিনি চীরতরে শুয়ে আছেন, চট্টগ্রাম নগরীর গরীব উল্লাহ শাহ মাজার কবরস্তানে। মহান আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ, তিনি যেন তাঁকে জান্নাতের উচ্চমকাম দান করেন। তাঁকে স্বাধীনতা পদক প্রদান এবং তাঁর নামে দেশের প্রত্যেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘জামাল নজরুল গবেষণা ইনস্টিটিউট’সহ হলের নামকরণ ও তাঁর নামে একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা উচিত।

লেখক: রশীদ এনাম, প্রাবন্ধিক

 

পূর্বকোণ/সাফা/পারভেজ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট