চট্টগ্রাম শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

সর্বশেষ:

২৬ জুলাই, ২০১৯ | ১:১৮ এএম

রোকেয়া হাসনাত

স্থাপত্য শিল্পে বাংলাদেশ

আমা দের বাংলাদেশ প্রাচীন কাল থেকে ভারত বর্ষের সমৃদ্ধ অঞ্চলরূপে পরিগণিত। নদী বিধৌত উর্বর অঞ্চল হিসেবে যুগে যুগে তুরস্ক, গ্রীস, পতুর্গাল, আরব, ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড থেকে ব্যবসায়ী এবং ধর্ম প্রচারকরা এদেশে এসে স্থায়ী বাসস্থান গড়ে তুলেছিলো।
ধারণা করা হয় যে, কমপক্ষে দশ লক্ষ বছরেরও পূর্বে শীলা গঠনের তৃতীয় যুগে হিমালয়ের পাদদেশে বাংলাদেশ ভূখ-ের সৃষ্টি হয়েছে। এখানে সভ্যতা এবং মানুষের বসতি গড়ে উঠে দশ থেকে পনেরো হাজার বছর পূর্বে নব্য পাথর যুগে। তাই বাংলাদেশ ঐতিহাসিক ভাবে বহু পুরানো সভ্যতার অংশীদার।
নদী ও সাগরের পলিমাটি দিয়ে সৃষ্ট বলে এদেশের প্রাচীনতম স্থাপনাগুলো ছিলো মাটি, বাঁশ ও কাঠের তৈরি। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি প্রকৃতির খামখেয়ালিপনা এবং মানুষের ধ্বংসাত্মক কর্মকা-ে এদেশে প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন খুব কম।
নদীর গতি প্রকৃতির পরিবর্তন ও ভাঙনের ফলে প্রাচীন বাংলার কর্ণসুবর্ণ, তা¤্রলিপি, কটিবারসা, পঞ্চনাগীরি ও রামপাল শহরের মতো অনেক সভ্যতা বিলীন হয়ে গেছে।
আমাদের বাংলাদেশে বর্তমানে পরিলক্ষিত সবচেয়ে প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন হচ্ছে বগুড়ার মহাস্থানগড়। খৃষ্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে গুপ্ত ও পাল রাজত্বকালে এই বসতি গড়ে উঠে। পরবর্তী তিনটি যুগে এটির সংস্কার হয়। তবে বর্তমান ধ্বংসাবশেষ গুলো অষ্টম থেকে একাদশ শতাব্দীতে বৌদ্ধ রাজাদের তৈরি বলে জানা গেছে।
মহাস্থানগড়ের ধ্বংসপ্রাপ্ত স্থাপনাগুলোর জ্যামিতি নকশা এটাই প্রমাণ করে যে বাংলাদেশে সেকালে উঁচুমানের স্থাপত্য কৌশল প্রয়োগ করা হতো।
বিদেশী সভ্যতা আগমনের সাথে স্থাপত্য শিল্পে প্রভূত পরিবর্তন আসে।
প্রাচীন হিন্দু সভ্যতা, ত্রয়োদশ থেকে ষোড়শ শতাব্দীর মুসলিম ও পতুর্গীজ সভ্যতা, ষোড়শ থেকে অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত মোগল সভ্যতা এবং অষ্টাদশ থেকে বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত ব্রিটিশ সভ্যতার সংমিশ্রণ এদেশের স্থাপত্যগুলোতে ব্যাপক প্রভাব রাখে।
বহু নিদর্শনের মধ্যে বাংলাদেশে হিন্দু সভ্যতার ঢাকেশ^রী মন্দির, পাবনার জর বাংলা মন্দির, দিনাজপুরের কান্তজীর মন্দির, মুসলিম সভ্যতার সুলতানি কালের খুলনার বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদ, দিনাজপুরের সুরা মসজিদ, টাংগাইলের আতিয়া মসজিদ, মোগল সভ্যতার ঢাকার সাত মসজিদ, বিবি পরির মসজিদ, লালবাগ দূর্গ, ছোট কাটরা, বড় কাটরা এবং ব্রিটিশ সভ্যতাকালে আহসান মঞ্জিল, হোসনি দালান, কার্জন হল, চট্টগ্রামের সিআরবি ভবন, পুরানো রেলওয়ে স্টেশন, কোর্ট বিল্ডিং, পি কে সেন ছয়তলা ভবন এবং পাকিস্তান সময়কালে শেরে বাংলা নগর, জাতীয় সংসদ ভবন, কমলাপুর রেল ষ্টেশন এখনো কালের সাক্ষী হয়ে আছে।
চট্টগ্রাম নগরীতে পতুর্গীজদের তৈরি বহু স্থাপনা এখন আর অবশিষ্ট নেই।
পতুর্গীজ দূর্গ হিসেবে তৈরি চট্টগ্রাম মুসলিম হাইস্কুল ভবন ও ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজ ভবন সংরক্ষণ করা হয় নি। সভ্যতাকে ধরে রাখতে গেলে আমাদের পুরানো ও ঐতিহ্যম-িত সভ্যতার নিদর্শনসমূহ সংরক্ষণ করা একান্ত আবশ্যক। কালের পরিক্রমায় পুরানো অনেক কিছুই নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু নিজের শিকড়কে ধরে রেখে অগ্রযাত্রা নিশ্চিত করার জন্য পুরানো স্থাপনাসমূহ আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে অবিকল রেখে দেওয়াই আমাদের কর্তব্য। কেননা, ঐতিহ্যই একটি জাতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করে।
এটা বলা অনস্বীকার্য যে, সভ্যতা অতীতের ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে থাকে।
প্রাচীন স্থাপনা সংশ্লিষ্ট সময়ের ঐতিহ্য, কৃষ্টি, সংস্কৃতি এবং সভ্যতার সাক্ষী। তাই প্রাচীন স্থাপত্যসমূহ আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে নবায়ন করে অবিকল আকৃতিতে সংরক্ষণ করা হলে যে কোন দেশ ও জাতির ইতিহাস অনেকাংশে সমুন্নত রাখা যায়।

The Post Viewed By: 127 People

সম্পর্কিত পোস্ট