চট্টগ্রাম শনিবার, ২৯ জানুয়ারি, ২০২২

সর্বশেষ:

২৮ নভেম্বর, ২০২১ | ৯:৪২ অপরাহ্ণ

নোমান আহমাদ ছিদ্দিকী

শ্রদ্ধার সাথে স্মরণীয় একটি নাম স্থপতি তসলিমউদ্দিন চৌধুরী

স্থপতি তসলিম উদ্দিন চৌধুরী চট্টগ্রামের প্রিন্ট মিডিয়া তথা সংবাদপত্র জগতে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণীয় একটি নাম। চট্টগ্রামের পাঠকপ্রিয় বহুল প্রচারিত দৈনিক পূর্বকোণের সাবেক সম্পাদক স্থপতি তসলিমউদ্দিন চৌধুরী ২০১৭ সনে ঢাকার ধানমন্ডি রেনেসাঁ হাসপাতাল এন্ড রিসার্চ  ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন।

তাঁর জীবনকাল খুব দীর্ঘ নয়। মাত্র ৬৪ বছরের মহার্ঘ জীবনটিকে তিনি মানুষের কল্যাণে এমনভাবে কাজে লাগিয়েছেন যে তা সবার কাছে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও প্রেরণার এক অনন্য দৃষ্টান্তে পরিণত হয়েছে। স্থপতি তসলিমউদ্দিন চৌধুরী ছিলেন মূলত স্থাপত্যবিদ্যার এক কৃতীজন। তবে বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এই স্থপতি দেশ ও জনসেবার মহান ব্রত নিয়ে  মিডিয়া জগতকেই কর্মসাধনার ক্ষেত্র হিসাবে বেছে নেন। প্রতিভার দীপ্তি ছড়িয়ে সংবাপত্র জগতে উপস্থিত হন একজন জননন্দিত, দক্ষ ও কুশলী সাংবাদিক হিসাবে।

সাংবাদিকতা, সম্পাদনাসহ সব ক্ষেত্রেই তিনি উন্নত ও আধুনিক চিন্তার ছাপ রেখেছেন, হয়েছেন সংবাদপত্র জগতের অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। নানা মেধাবী পরিকল্পনায় তিনি পূর্বকোণকে ঢেলে সাজান এবং জাতীয় মানের সংবাদপত্রে উন্নীত করেন। তিনি দৈনিক পূর্বকোণকে জনসম্পৃক্ততার তুঙ্গ শিখরে নিয়ে যান। সংবাদপত্র জগতে বস্তুনিষ্ঠ ও সৎ সাংবাদিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তিনি।

অপরদিকে তিনি ছিলেন চিন্তায় ও মননে আধুনিক এবং স্পষ্টভাষী। তিনি ছিলেন সংস্কারমুক্ত, ধর্মপ্রাণ অসাম্প্রদায়িক একজন আলোকিত মানুষ। নিখুঁতভাবে পত্রিকা সম্পাদনার গুরুদায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি নানা সমাজ উন্নয়নমূলক কাজেও নিযুক্ত ছিলেন। তিনি অসংখ্যা শিক্ষা ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের সাথে নিযুক্ত ছিলেন। আজীবন তিনি নানানভাবে চট্টগ্রামের উন্নয়ন আন্দোলনে সম্পৃক্ত ছিলেন, ছিলেন শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির একনিষ্ঠ অনুরাগী। স্থপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ হিসাবে দেশের অর্থনৈতিক চালিকা শক্তির কেন্দ্র ভূমি তথা তাঁর প্রিয় শহর চট্টগ্রামকে তিনি একটি পরিকল্পিত নগরী হিসাবে গড়ে তোলার অভিপ্রায় ব্যক্ত করতেন আমৃত্যু।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন সংগ্রাম পরিষদের প্রেসিডেন্ট হিসেবে বহু সভা, সেমিনার, সিম্পেজিয়াম করে চট্টগ্রামের মানুষের সুখ দুঃখের কথা তিনি বলেছেন বিরামহীন গতিতে একই সাথে নাগরিক অধিকার বাস্তবায়নের বিভিন্ন দাবীও তুলে ধরেছিলেন নানান মহলে। তিনি অসংখ্য শিক্ষা, সেবামূলক ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।

তিনি চট্টগ্রামের ভেটরিনারী ও এনিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য, বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট চট্টগ্রাম চ্যাপটার এর প্রাক্তন সভাপতি, চট্টগ্রাম ডায়বেটিস এসোসিয়েশন এর আজীবন সদস্য, চিটাগাং ডেইরী ফার্ম এসোসিয়েশন এর প্রেসিডেন্টসহ অনেকগুলো জনহিতকর ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত ছিলেন।  অসাম্প্রদায়িক এই মানুষটি ধার্মিক মানুষকে শ্রদ্ধা করতেন  কিন্তু নিজে ‘গোঁড়া ধার্মিক’ হয়ে যাননি কখনো।

তিনি সদা পরিশ্রমী ও বলিষ্ঠ মানসিকতা ধারণ করতেন। চরম অসুস্থতা নিয়েও তিনি নিয়মিত অফিস করতেন। ক্ষণজন্মা মহৎ পুরুষ এই কীর্তিমানের মৃত্যুতে দেশ ও জাতির অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। আধুনিক গতিময় সাংবাদিকতা জগতের পথিকৃৎ স্থপতি তসলিমউদ্দিন চৌধুরী গণমানুষের মনন ও মানসিকতার পরিবর্তন, সভ্য ও সুন্দর সমাজ গঠনে আজীবন কাজ করে গেছেন।

সামাজিক অবক্ষয় রোধ, মূল্যবোধের  চর্চা ও বিস্তার ঘটানোর ক্ষেত্রে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন। তিনি  ছিলেন ভীষণ রকম আত্মপ্রচারবিমুখ একজন দৃঢ়প্রত্যয়ী মানুষ। নিজেকে অন্তরালে রাখতেই তিনি পছন্দ করতেন। শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্থপতি মরহুম তসলিমউদ্দিন চৌধুরী বিরাজমান থাকবেন চট্টগ্রামবাসীর হৃদয়ে। কর্মবীর, স্পষ্টবাদী, জননন্দিত, মহাপ্রাণের এই বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করি।

লেখক: অধ্যাপক নোমান আহমাদ ছিদ্দিকী সামুদ্রিক পরিবেশ গবেষক, মেরিন ফিশারীজ একাডেমী, চট্টগ্রাম

 

পূর্বকোণ/সাফা/পারভেজ

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 432 People

সম্পর্কিত পোস্ট