চট্টগ্রাম শনিবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২১

৯ অক্টোবর, ২০২১ | ১০:৩৮ অপরাহ্ণ

মাহফুজ পারভেজ

রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাড়ছে নিরাপত্তা ঝুঁকি

বিশ্বের যেকোনও স্থানে শরণার্থীদের সমাবেশ হলে সামগ্রিক নিরাপত্তার ঝুঁকির পাশাপাশি বেশ কিছু অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়। রোহিঙ্গা ইস্যুও এর ব্যতিক্রম নয়। কারণ, শরণার্থীদের আগমনে মানবিক-সামাজিক নিরাপত্তা, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, আন্তরাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ইত্যাদি ক্ষেত্রে নানাধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়।

এসব নানাবিধ বিপদের মধ্যেই আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস এন্ড হিউম্যান রাইটস এর চেয়ারম্যান মুহিবুল্লাহ (৪৬) নিহত হওয়ায় বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা ঝুঁকি আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সৃষ্ট বিশাল মানবিক সঙ্কট কবলিত হয়ে সেদেশের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ঢল নামে বাংলাদেশে। বর্মী সেনাদের বর্বর অত্যাচারে বাস্তুচ্যুত ১০ লাখ রোহিঙ্গা দফায় দফায় দেশ ছেড়ে বাংলাদেশের কক্সবাজার সীমান্তে আশ্রয় নেয়।

স্থানীয় বাংলাদেশি কমিউনিটির উদার সমর্থন এবং বাংলাদেশ সরকারের নেতৃত্বে বহুজাতিক সহায়তা প্রচেষ্টার কারণে রোহিঙ্গা বিষয়ক মারাত্মক মানবিক সঙ্কট এড়ানো সম্ভব হলেও ধীরে ধীরে নানামুখী সমস্যা দেখা দিতে থাকে। এর মধ্যে প্রধান হলো শরণার্থীদের প্রত্যাবাসন ‘করা’ এবং ‘না-করা’ বিষয়টি। সদ্য-নিহত মুহিবুল্লাহ আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে রোহিঙ্গাদের অধিকার আদায়ের জন্য এডভোকেসি করতেন এবং স্বদেশে প্রত্যাবাসনের চাপ দিতেন। তিনি ছিলেন ‘রোহিঙ্গা কমিউনিটির ভাইটাল ভয়েস’ এবং সবসময় তাদের নিরাপদ এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পক্ষে ছিলেন। তিনি রোহিঙ্গাদের জীবন এবং ভবিষ্যৎ নিশ্চিতের পক্ষে সোচ্চার কণ্ঠ ছিলেন।

মুহিবুল্লাহর মৃত্যুর ঘটনা শুধু রোহিঙ্গাদের অধিকারকে অবজ্ঞা করবে না, তাদের প্রত্যাবাসনের উদ্যোগেও বিঘ্ন ঘটাবে। এতে কোন পক্ষের লাভ হয়েছে সেটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। এর ফলে রোহিঙ্গাদের ‘থাকা’ ও ‘চলে যাওয়ার বিষয়টি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে।

প্রত্যাবাসনের পক্ষে-বিপক্ষের মতো আরও অনেক বিপজ্জনক নিরাপত্তা ইস্যু তৈরি হয়েছে রোহিঙ্গা সংক্রান্ত বিষয়সমূহকে ঘিরে। যার মধ্যে রোহিঙ্গা ক্যাম্পসমূহে অস্ত্র ও মাদকের অনুপ্রবেশ যেমন আছে, তেমনিভাবে রয়েছে মানবপাচার, যৌনব্যবসা এবং রোহিঙ্গা-স্থানীয়দের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের মতো স্পর্শকাতর বিষয়। পাশাপাশি মানবিক দিক থেকে পানি, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, পুষ্টি এবং সুরক্ষাসহ মৌলিক নিরাপত্তা সেবাগুলোতে ক্রমেই চাপে পড়ছে এবং শরণার্থীদের কারণে বনাঞ্চল উজাড়ের মাধ্যমে সামাজিক ও পরিবেশগত বিপদ তীব্রতর হচ্ছে।

মুহিবুল্লাহ নিহত হওয়ার ঘটনায় বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে রোহিঙ্গা আশ্রিত এলাকার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার পাশাপাশি সামগ্রিক নিরাপত্তাঝুঁকির নাজুক চিত্রটিও সামনে চলে এসেছে। ভৌগোলিকভাবে ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল’ এবং ‘গোল্ডেন ক্রিসেন্ট’-এর মাঝে অবস্থিত হওয়ায় বাংলাদেশের উল্লেখিত এলাকা অস্ত্র, মাদক ও মানবপাচারের একটা আদর্শ রুট। এই অঞ্চল ক্ষুদ্রাস্ত্র পাচারের জন্য ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন চক্র প্রান্তিক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে মাদক ও ক্ষুদ্রাস্ত্র পাচারের বাহক হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করে। আশঙ্কা রয়েছে স্থানীয় মাদকচক্র এবং সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর শক্তি সঞ্চয়ের ফলে মাদক ও অস্ত্র আরও সহজলভ্য হয়ে উঠবে, যা নিরাপত্তাকে আরও হুমকির মুখে ঠেলে দিতে পারে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কথা বলে সাংবাদিকরা জানতে পেরেছেন যে,  নিজেদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ ও ক্ষমতা বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘাত-সংঘর্ষে জর্জরিত রোহিঙ্গা ক্যাম্প। মাদকসহ নানাধরনের অবৈধ ব্যবসার আধিপত্যকে কেন্দ্র করেও প্রতিনিয়ত সংঘাত হচ্ছে। এ ছাড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর সঙ্গে মিয়ানমারের যোগাযোগ ও ইন্ধন থাকার দাবি করেছেন কেউ কেউ। রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর অস্ত্রের প্রধান উৎস ধরা হয়  মিয়ানমারকে। সহায় সম্বল ফেলে চার বছর আগে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের হাতে এত অস্ত্র চলে আসায় এসব প্রশ্ন জোরালো হচ্ছে।

এর ফলে প্রায়ই রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা বেপরোয়া হয়ে উঠতে দেখা যায়। সাধারণ রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীও সন্ত্রাসীদের ভয়ে তটস্থ। তুচ্ছ ঘটনায় ভারী অস্ত্র ব্যবহার, মুহূর্তেই রক্তপাত ও খুনোখুনির কারণেই রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের নিয়ে নিয়মিত আতঙ্ক ও উদ্বেগের শিকার হচ্ছেন শরণার্থী ও সাধারণ মানুষ। কক্সবাজারের সীমান্তবর্তী উখিয়া ও টেকনাফের ৩৪টি ছোট-বড় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দলগত সন্ত্রাসী তৎপরতা, মাদক-মানব পাচার, চাঁদাবাজি, অপহরণ বাণিজ্য ও দোকান দখল থেকে শুরু করে তুচ্ছ ঘটনায়ও ব্যবহার করা হচ্ছে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র। গত  ৪ বছরে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও ক্ষমতার প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে শতাধিক হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সন্ত্রাসীদের দমন ও ক্যাম্পগুলো শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে যৌথ অভিযান শুরু করা হলেও সংঘর্ষ থেমে নেই। ধারাবাহিক রক্তারক্তির সর্বশেষ বলি হয়েছেন রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহ। ক্যাম্পের পাশাপাশি সন্ত্রাসীরা দুর্গম জঙ্গলের পাহাড়ি আস্তানায় অবস্থান করে। রাতে তারা নেমে আসে ডাকাতিসহ খুন খারাবি করতে। এমনকি পেশাদার এসব খুনি চুক্তিতে খুনের কাজও করে বলে মিডিয়ার অনুসন্ধানে জানা গেছে। সন্ত্রাসী দলের অস্ত্রের মহড়ায় খুন-জখম, মাদক, মানব পাচার, চাঁদাবাজি, অপহরণ-দোকান বাণিজ্য এবং আধিপত্য বিস্তারের সন্ত্রস্ত পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে প্রায়ই।

স্থানীয় সূত্রগুলোর মতে, সমুদ্র, উপকূল, সীমান্ত জল-পাহাড়ি-জনপদ দিয়ে অস্ত্র আসছে। পাশাপাশি অস্ত্র তৈরির কারিগর এনে ক্যাম্প সংলগ্ন পাহাড়ি জনপদে অস্ত্র নির্মাণ করছে সন্ত্রাসীরা। সীমান্তের সবগুলো রুট দিয়ে মাদক চালানের সঙ্গে অস্ত্র ঢুকছে। চলছে অপহরণ ও মানব পাচার।

বিশেষজ্ঞরা শনাক্ত করেছেন যে, রোহিঙ্গাদের মধ্যে আছে এইডস আক্রান্ত মানুষ। বাংলাদেশে এখন কলেরা না থাকলেও রোহিঙ্গাদের মধ্যে রয়েছে সেই সমস্যাও। বন উজার হচ্ছে, পাহাড় কেটে ধ্বংস করছে তারা। দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক-পরিবেশগত ঝুঁকিও আছে এর সঙ্গে। আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যাও প্রকট হচ্ছে। সব মিলিয়ে এসব নিরাপত্তার ঝুঁকিগুলো মোকাবেলা করাই বিরাট বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তদুপরি, আশ্রিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বিভিন্ন মানবিক নিরাপত্তাঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যে খাদ্যনিরাপত্তা, স্বাস্থ্যনিরাপত্তা, জীবিকার নিরাপত্তা এবং মানবপাচারসংক্রান্ত নিরাপত্তার ঝুঁকি প্রধান। আন্তর্জাতিক মানবপাচারচক্র রোহিঙ্গাদের প্রতি শকুনের দৃষ্টি দিয়ে রেখেছে। বেশির ভাগ আগত রোহিঙ্গা পরিবারের মধ্যে কোনও পুরুষ সদস্য নেই, অধিকাংশই নারী ও শিশু। ফলে বিভিন্ন পাচারচক্র তাদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে তাদের বিদেশে যৌনকর্মী এবং শিশুশ্রমিক হিসেবে পাচার করার চেষ্টা করছে, যার প্রভাবে স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তাও বিপদাপন্ন।  নিতান্ত মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে নানা ঝুঁকি সৃষ্টি হওয়ায় সমগ্র অঞ্চলে নানামুখী বিপদের ডালপালা ছড়াচ্ছে। সন্ত্রাস, মাদক, শরণার্থী কবলিত কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে এখন স্থানীয় নাগরিকরা সংখ্যালঘু। এমনতাবস্থায় নানাবিধ নিরাপত্তা ঝুঁকির পাশাপাশি প্রচন্ড সামাজিক ও সম্প্রদায়গত সংঘাতের বিস্তৃতি ঘটার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। এরই মাঝে আর্থিক খাতে, ব্যবসা-বাণিজ্যে ও শ্রমবাজারে স্থানীয়রা শরণার্থীদের কাছে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে।

সামগ্রিকভাবে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কেন্দ্র করে আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও আইন-শৃঙ্খলা বিষয়ক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে নানা রকমের ঝুঁকি ও বিপদের বিষয়গুলো আর এড়িয়ে যাওয়ার অবস্থায় নেই। বিশেষত, মুহিবুল্লাহ হত্যাকান্ডের ফলে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তার ঝুঁকিগুলো সুস্পষ্ট অবয়বে উপস্থিত হয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে এসব নিরাপত্তার বিপদগুলো আরও তীব্র ও সহিংস রূপ লাভ করার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আরও ভয়ের বিষয় হলো, রোহিঙ্গা আশ্রিত এলাকার পাশেই স্পর্শকাতর পার্বত্য চট্টগ্রাম।  ফলে এসব অতীব গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থানে বিরাজমান ও সম্ভাব্য নিরাপত্তা বিপদসমূহকে দ্রুত প্রশমিত করা অপরিহার্য।

লেখক: মাহফুজ পারভেজ প্রফেসর, রাজনীতিবিজ্ঞান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

পূর্বকোণ/সাফা/পারভেজ

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 263 People

সম্পর্কিত পোস্ট