চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২১

সর্বশেষ:

৩ আগস্ট, ২০২১ | ১১:২১ অপরাহ্ণ

ড. মোহাম্মদ আরিফ

জেনারেশন গ্যাপ, মেলবন্ধন ঘটাবেন যেভাবে

Traditionalist, Baby Boomers, Generation X, Millennials, Generation Z-GB এই শব্দগুলো অনেকের কাছেই বেশ পরিচিত। মূলত Generation Gap (জেনারেশন গ্যাপ) বা প্রজন্মগত ব্যবধান বোঝাতে এগুলো ব্যবহৃত হয়। প্রথম দেখায় তেমনটা গুরুত্বপূর্ণ না মনে হলেও আসলে প্রজন্মগত ব্যবধানের ধারণাটি বেশ পুরনো ও আলোচিত।

সভ্যতার বহুবিধ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চিন্তাধারা, বিশ্বাস এবং আদর্শেরও পরিবর্তন ঘটে, যা জেনারেশন গ্যাপ বা প্রজন্মগত ব্যবধানের সৃষ্টি করে। সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, শৈল্পিক, ইত্যাদি বিভিন্ন কারণে সৃষ্ট প্রজন্মগত ব্যবধান মূলত একটি মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ, যা হচ্ছে তরুণসমাজ এবং পূর্ববর্তী প্রাপ্তবয়স্ক সমাজগুলোর মধ্যকার প্রভেদ।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সামাজিক এবং নৈতিক মূল্যবোধ, যা পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি দ্বারা অনেকাংশেই প্রভাবিত হয় এবং পাল্টা প্রভাব সৃষ্টি করে, তা প্রজন্মগত ব্যবধানকে পরিচালিত করে আর এই প্রভাব যেমন সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত হতে পারে, তেমনি সামাজিক বা অন্য কোনো বৃহৎ পরিসরের কোনো পরিবর্তন দ্বারাও হতে পারে। কিন্তু যেহেতু একেক প্রজন্মের পরিবর্তন ও বিশ্বাসের উৎস একেক রকম, সেহেতু এক প্রজন্মের সঙ্গে আরেক প্রজন্মের মেলবন্ধন করতে পারাটা একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং অনেক ক্ষেত্রেই কঠিন বিষয়।

যেমন ধরা যাক, ১৯৬০ সালের দিকে, Baby Boomers প্রজন্মের সময়কালে তরুণসম্প্রদায় বিকশিত হয় সামাজিক ভারসাম্য এবং নারী-অধিকারের দাবিতে; আধুনিক প্রযুক্তি ছিল এর বিকাশকালে এবং বিশ্বের এক প্রান্তের সঙ্গে অন্য যোগাযোগ ও পরিচয়ের মাধ্যম ছিল অনেকাংশেই শুধু তৎকালীন গণমাধ্যম এবং ডাকবিভাগ নির্ভর।

তরুণেরা তখন পড়তেন বই, পত্রিকা, ম্যাগাজিন এবং জানতেন পুরোবিশ্ব সম্পর্কে। ২০০০ সালে এসে Generation Z নামক তরুণসম্প্রদায় দেখে নগরায়ণ ও বিশ্বায়নের প্রভাবে প্রভাবিত সমাজ, যা আধুনিক প্রযুক্তি যেমন, ইন্টারনেট ও স্যাটেলাইট-এর আশীর্বাদপুষ্ট। এ সময়ের তরুণরা ইন্টারনেটের মাধ্যমে মুহূর্তেই দেশ-বিদেশের সংবাদ, বিনোদন, খেলাধুলা থেকে শুরু করে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ইত্যাদি সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করে ফেলে ঘরে বসেই। যেহেতু দুইপ্রজন্মের আদর্শ ও শিক্ষাগত ভাবধারা ভিন্ন, এটি খুবই স্বাভাবিক যে দুইপ্রজন্মের মেলবন্ধনের বিষয়গুলোও হবে অনেকাংশেই জটিল। তবে আদর্শ ও চিন্তাগত ভিন্নতা থাকলেও বিভিন্ন জটিলতা থেকে দূরে থেকে প্রজন্মগত মেলবন্ধনও সম্ভব।

প্রজন্মগত মেলবন্ধন ঘটানোর জন্য সবার আগে প্রয়োজন একে অপরকে বোঝার মনমানসিকতা, চিন্তাধারার উদারতা এবং সম্মান প্রদর্শনের মনোভাব থাকা। তরুণ হোক বা প্রাপ্তবয়স্ক, আমাদের মনে রাখতে হবে যে আমাদের সময়ের নীতিবিশ্বাসের সঙ্গে আমাদের পূর্ববর্তী বা পরবর্তী সময়ের নীতিবিশ্বাস অবশ্যই আলাদা হবে, কিন্তু এর মানে এই নয় যে সেই আলাদা নীতিবিশ্বাস কল্যাণকর নয়।

আরো মনে রাখতে হবে যে সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, ধার্মিক ও অন্যান্য পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতিই মানুষের চিন্তাধারায় সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন আনে, যার কারণে মানুষকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। এতে কোনো দোষ বা ত্রুটি খোঁজার চেয়ে সে মানুষের দৃষ্টিকোণ বোঝার চেষ্টা করলে বরঞ্চ তারদিকের গল্পটি জানা এবং বোঝা যায়। যার মাধ্যমে মা-বাবা বা বয়োজ্যেষ্ঠরা যেমন সন্তানতুল্য মানুষের মনকে বুঝতে পারবে, তেমনি সন্তানরাও তাদের বয়োজ্যেষ্ঠদের চিন্তাধারার কারণ বুঝতে পারবে।

বেশকিছু উপায়ে প্রজন্মগত ব্যবধান জানা ও বোঝা যায়। যেমন একসঙ্গে কাজ করার মাধ্যমে, তা কর্মক্ষেত্রে হোক বা সামাজিক কোনো আচার-অনুষ্ঠানে, পারস্পরিক বিশ্বাস ও মূল্যবোধে আলোচনার দ্বারা উভয়পক্ষের স্বীকৃত ভিত্তি খুঁজে নেওয়ার মাধ্যমে, নিজেদের বিশ্বাস, ভালো লাগার বিষয়বস্তু, অভিজ্ঞতা ইত্যাদি আলোচনার মাধ্যমে এবং সার্বিকভাবে একে অপরের মতাদর্শকে বোঝার চেষ্টা করার মাধ্যমে, তা যেমনই হোক না কেন। একে অপরের চিন্তাধারাকে প্রভাবিত করাই শুধু প্রজন্মগত মেলবন্ধনের উদ্দেশ্য নয়, আবার আরেকজনকে নিজের আদর্শে গড়তে চাওয়াটাও কোনো সমাধান নয়।

সবার আগে আমাদের বুঝতে হবে, যে যেই প্রজন্মেরই হোক না কেন, অনেকটাই পরিস্থিতির শিকার হয়ে তাদের চিন্তাধারা ও জীবনযাত্রা প্রভাবিত হয়েছে এবং এই জীবনধারার সঙ্গে তারা অভ্যস্তও হয়ে গেছে। সুতরাং, তাদের চিন্তাধারা ও মূল্যবোধকে বুঝতে হবে। একটি মুদ্রার অবশ্যই দুইটি পিঠ থাকবে। তেমনি একে অপরের প্রজন্মকে চেনা-জানাও সম্মান করা ছাড়া পারস্পরিক মেলবন্ধন ঘটানো সম্ভব নয়। সভ্যতার বিকাশ ও উন্নতি চালিয়ে যেতে হলে তাই Generation Gap বা প্রজন্মগত ব্যবধানকে আরো জানতে, বুঝতে ও গুরুত্ব দিতে হবে।

লেখক: মোহাম্মদ আরিফ সিনিয়র লেকচারার, স্কুল অফ বিজনেস, ইউনিভার্সিটি অফ ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি চট্টগ্রাম (ইউসিটিসি)।

পূর্বকোণ/সাফা/পারভেজ

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 370 People

সম্পর্কিত পোস্ট