চট্টগ্রাম শুক্রবার, ২৫ জুন, ২০২১

৯ জুন, ২০২১ | ২:০৭ অপরাহ্ণ

সুলতানা কাজী

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকাল বন্ধ রাখা যায় না

মহামারি করোনার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের ষোল মাস অতিবাহিত হয়ে গেলো। জীবনে প্রথম এই এতো বড় সময় শিক্ষার্থীরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস করা থেকে বঞ্চিত হলো। সংকট এখন করোনা। স্থবির শিক্ষাব্যবস্থা। ভাবনায় শঙ্কা, ভয়, আতঙ্ক নিত্যসঙ্গী এখন।

আমার স্কুলের কয়েকজন শিক্ষার্থী থেকে জানতে চাইলাম- এই ষোলটি মাস তাদের কীভাবে কাটলো। প্রথমেই, দশম শ্রেণির সামিরা বললো, পুরো বন্ধে সে সৃষ্টিশীল বিভিন্ন কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত করেছে। ইংরেজি ভাষাকে রপ্ত করার বিষয়টাও বললো সে। আরও বললো, স্কুল বন্ধুদের মিস করার কথাটা। বন্দীজীবন ভালো না লাগার কথা ও জানালো। দশম শ্রেণির আদিবার মতে, পুরো বন্ধে সে এতদিন যেসব বই পড়তে পারেনি তা পড়তে পেরে আনন্দিত। ইউটিউব দেখে রান্না রপ্ত করার সাথে ইংরেজিতে দক্ষতা অর্জনের কথাও জানালো সে। অষ্টম শ্রেণির তারফি বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়ে জানালো যে, ক্রিয়েটিভ কাজের সাথে সে বাবা-মাকেও সাহায্য করেছে বিভিন্ন কাজে। স্কুলের টিচার, বন্ধু সবাইকে দীর্ঘ সময় না দেখার ক্ষোভ ও প্রকাশ করলো সে। তার মতে, সব খোলা থাকলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেনো খোলা থাকবেনা?

সপ্তম শ্রেণির ফারিন জানালো, বন্ধটা তার বেশ কাজে লেগেছে। অনলাইনে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে সে সার্টিফিকেটও অর্জন করেছে। স্কুলকে ভীষণ মিস করার কথাও জানালো সে। সপ্তম শ্রেণির আরেক শিক্ষার্থী আনতারার মতে, পুরো বন্ধে তার পরিবারকে কাছে পেয়ে সে ধন্য। সৃষ্টিশীল কাজে নিজেকে পোক্ত করেছে সে ইউটিউব দেখে দেখে। স্কুলের বন্ধুদের খুব মিস করার কথাও বললো সে। এরকম হাজারো কচিমনের কথাগুলো হয়তো একই হবে। যেখানে প্রতিদিন হৈ-হুল্লোড় করে সময় কাটাতো তারা, সেখানে হঠাৎ এসে পড়লো স্থবিরতা। যেটা কারোরই কাম্য নয়। সময় বহমান। ষোলটি মাস চলে গেলো! প্রাপ্তি অপ্রাপ্তি সব মিলিয়ে সময়টা অন্য আবহে বর্তমান।

দু’দিন আগে হোক আর দু’দিন পরে- করোনার তা-ব হয়তো থেমে যাবে। জীবন তার স্বাভাবিক গতি ফিরে পাবে নিশ্চয়ই। এর পরবর্তী হিসেবটা আমাদের এখন থেকেই করতে হবে কিন্তু। আমার মতে, এই দুঃসময়ে একজন শিক্ষার্থীর সবচেয়ে বড় কাজ হবে ঘরের কাজে মা-বাবাকে সাহায্য করা, তাদের নির্দেশ মত চলা। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা। সৃষ্টিশীল বিভিন্ন কাজে নিজেদের দক্ষ করে তোলা। স্বাভাবিক পরিস্থতিতে পড়ালেখার ব্যস্ততার কারণে হয়তো তা হয়ে ওঠেনা। কিন্তু এই অফুরন্ত সময়ে মা-বাবাকে কিছুটা হলেও কাজে সাহায্য করে আশীর্বাদ অর্জন করা, অনেক বড় পূন্যার্জন হবে মনে করছি।

শিক্ষার্থীরাই জাতির ভবিষ্যৎ। ভবিষ্যতে তাদেরকেই দেশের হাল ধরতে হবে। বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত হয়ে দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিশ্বকল্যাণে কাজ করবে তারাই। তাই চলমান দীর্ঘ ছুটিকালীন পড়ালেখাকে ছুটি দেয়া যাবে না। এক্ষেত্রে একজন মনীষীর উদাহরণ টানছি- জ্ঞান-বিজ্ঞানের অসংখ্য শাখায় সুগভীর পা-িত্য অর্জনকারী বিখ্যাত জ্ঞানতাপস ‘আল বেরুনি’ মৃত্যুশয্যায় শায়িত। এ সময় তাঁর এক বন্ধু তাঁর সাথে দেখা করতে আসলেন। বেরুনি এ অবস্থায় তাকে প্রশ্ন করে বসলেন গণিত সম্পর্কে। প্রশ্ন শুনে বন্ধুটি বিস্ময় ভরা কণ্ঠে বললেন, তুমি এ অবস্থায় ও নতুন কিছু জানতে চাচ্ছ? বেরুনি বললেন, প্রশ্নের সমাধান জেনেই মৃত্যুসুধা পান করা উত্তম নয় কি? বন্ধুটি চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই আল বেরুনি মৃত্যুবরণ করলেন। সুতরাং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পড়ালেখা করে জ্ঞানার্জন করাই জ্ঞানীর কাজ।

বর্তমানে অনলাইন পড়াশোনার কারণে কম্পিউটার, ল্যাপটপ, আইপ্যাড, ট্যাব, মোবাইল ফোন ইত্যাদি আমাদের পরিবারের সদস্য বলে বিবেচিত হচ্ছে। কিন্তু আমাদের খেয়াল রাখতে হবে, কোনোভাবেই যেন ওদের আসক্তি চলে না আসে এসবের প্রতি। মনোবিদদের মতে, আসক্তির ফলে ঘুমের সমস্যা হবে, ঘুম পরিপূর্ণ না হলে মস্তিষ্কের অপরিপক্কতা তৈরি হতে পারে। শরীরে দেখা দিতে পারে নানা প্রতিকূলতা। পারসোনালিটি ডিসঅর্ডার আসতে পারে। মানসিক ও মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা হতে পারে। এ প্রতিকূলতা থেকে রেহাই পেতে আমার মতে সুস্থ ধারার গান শোনা, ভালো মানের সুস্থ ধারার মুভি দেখা, খেলাধুলা, শরীরচর্চা বিষয়ক কন্টেন্ট দেখার ব্যাপারে আমরা তাদের উদ্বুদ্ধ করতে পারি।

করোনাকালীন এ সময়টা আসলে শিক্ষার্থীদের খাঁটি জ্ঞান অর্জনের, মনের আনন্দে পড়ার এক বিশাল সুযোগ করে দিয়েছে বিধাতা। যদি মূল বইটা পড়া হয়ে যায়, দেখা যাচ্ছে তাদের এক ধরণের চোখ খুলে যায়। জ্ঞানের দিগন্ত প্রসারিত হয়ে যায় তখন। যা পড়েছে, চিন্তা করেছে সেগুলোর ওপর বাংলা ও ইংরেজি যার যেটা ইচ্ছা, কিছু টপিক লিখতে দিলে ওরা মনের আনন্দে লিখে ফেলার চেষ্টা করবে বলে আমি আশাবাদী। তাতে ওদের লেখার ক্ষমতা বাড়বে, সৃজনশীলতা প্রকাশ পাবে, পরীক্ষায় মুখস্তের অভ্যাসও কমে যাবে। আর এভাবে দীর্ঘ গৃহবন্দীত্বের সময়টাও কেটে যাবে। ভয়, উৎকন্ঠা ও উদ্বেগকে প্রশ্রয় না দেয়ার পক্ষে শিক্ষার্থীদের  কাউন্সেলিং করতে হবে। মানসিকভাবে সবাইকে স্ট্রং থাকতে হবে। এটাই একমাত্র মেডিসিন বলে আমি মনে করি। করোনাকে ভয় নয় বরং সচেতনতা এবং আন্তরিকভাবে ব্যক্তিগত সুরক্ষা অবলম্বন করার মাধ্যমে আমাদের নতুন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে হবেই। নিশ্চয়ই দুঃসময় একদিন দূর হয়ে সোনালি রঙিন আলো আসবে। ততদিন সাবধানে থাকি সবাই। নিজে বাঁচি, অন্যকে ও বাঁচাতে এগিয়ে আসি। সবার সুস্থতা কামনায়….

লেখক: সুলতানা কাজী সহকারি শিক্ষক, অংকুর সোসাইটি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়।

পূর্বকোণ/এএ

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 249 People