চট্টগ্রাম সোমবার, ১৭ মে, ২০২১

সর্বশেষ:

১৩ এপ্রিল, ২০২১ | ৫:২২ পূর্বাহ্ণ

আতিকুল ইসলাম

ভ্রমণ

সিয়াটল টু নিউ ইয়র্ক : উই আর দ্যা সিক্স গাইজ

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

৯০ দশকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত অবশ্য নিউইয়র্ক শহরটি নিরাপদ শহর ছিল না, তার কালসাক্ষি আমি নিজেই। দুর্বৃত্তরা দু’বার টাকা ছিনিয়ে নিয়েছে আমার কাছ থেকে। পথে তেমন আর কথা হল না তাঁর সাথে। বুড়ো ঘুমিয়ে পড়লেন, সাথে আমিও।
রাত সোয়া একটার দিকে পৌঁছলাম মাইলস সিটি। দু ঘণ্টার মত বিরতি এখানে। বাস বদল হবে। তাই আমাদের স্যুটকেসগুলো কালেক্ট করে ওয়েটিং লাউঞ্জে ভারি জ্যাকেট খুলে বসলাম। চোখে রাজ্যের ঘুম। ঘণ্টাখানেক পর এক বন্ধু জাগিয়ে দিলেন। একজন ভবঘুরে কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তি আমাদের জ্যাকেটগুলো নিয়ে নিয়েছেন, কিছুতেই ফেরত দিচ্ছেন না। আমাকে পাঠানো হল জ্যাকেটগুলো উদ্ধার করতে। আমি জ্যাকেট ফেরত চাইতেই রেগে গেলেন তিনি। বললেন জ্যাকেটগুলো তারাই, কুড়িয়ে পেয়েছেন। স্টেশনে ইউনিফরম পরিহিত আরেকজন কৃষ্ণাঙ্গ ভদ্রলোককে অনুরোধ করে জ্যাকেট উদ্ধার করা হল।
যুক্তরাষ্ট্রে কৃষ্ণাঙ্গ মানুষগুলোকে কখনই নিগ্রো, নিগার বা নিগা বলা যাবে না। আমেরিকার সংষ্কৃতিতে এটি খুবই অপমানজনক একটি শব্দ। শুধুমাত্র একজন কৃষ্ণাঙ্গই আরেকজন কৃষ্ণাঙ্গকে এ নামে ডাকতে পারবেন। নিগ্রো, যার বাংলা অর্থ হচ্ছে কালো (কালো রং), সেটার উৎপত্তি ল্যাটিন ভাষা থেকে। ল্যাটিন ভাষায় এ শব্দটি হচ্ছে নেগ্রো (হবমৎড়), কৃষ্ণাঙ্গ বাদে অন্য সবাই তাদের ব্ল্যাক বলে ডাকতে হবে। ৯০ দশকের মধ্যভাগে অবশ্য রেডিও, টিভিতে ঘটা করে বলা হল তাদের যেন সবাই আফ্রিকান-আমেরিন বলে সম্বোধন করেন (ঢ়ড়ষরঃরপধষষু পড়ৎৎবপঃ) আর আমাদের এইসান-আমেরিকান। কৃষ্ণাঙ্গ বাদে কোন ব্যক্তি যদি তাদের নিগ্রো বলেন তাহলে মার খাবার সম্ভাবনা শত ভাগ।
নর্থ ডাকোটা অঙ্গরাজ্যের রাজধানী বিসমার্ক শহরের উদ্দেশ্যে যখন রওনা দেই তখন ঘড়িতে ভোর পৌনে চারটা। অনেক যাত্রী উঠেছেন বাসে। বাস প্রায় ভর্তি। পাশাপাশি বসতে পারিনি আমরা। বাসের সামনের দিকটায় বন্ধু শাহিনের পাশে বসলেন শেতাঙ্গ এক যুবতী মেয়ে। নটরডেম কলেজের ছাত্র শাহিনের সাহস ছিল মেলা। শাহিন গল্প জুড়ে দিল। আমরা পেছন থেকে সবাই মিটি মিটি হাসছি। বন্ধুত্ব করবার চেষ্টা চলছে। আমরা অনেকেই ঘুমিয়ে পড়লাম। বোধ করি শাহিন ঘুমালো না।
বিসমার্ক শহরে ঢুকতেই ড্রাইভার জানালেন ঘড়ির কাটা এক ঘণ্টা বাড়িয়ে দিতে। ঘড়িতে সকাল সোয়া ন’টা বাজলেও তা সোয়া দশটা করে নিলাম। আমরা এবারে মাউন্টেন টাইম জোন থেকে সেন্ট্রাল টাইম জোনে প্রবেশ করলাম। নর্থ ডাকোটা বিভিন্ন জাতের গম উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত। কিম্বার্লি নামের সেই মেয়েটি শাহিনকে তার ফোন নাম্বার দিয়ে বিদায় নিলেন। শাহিন ফোন করার প্রতিশ্রুতি দিলেন। জানা গেলো তার ১৬ বছর বয়সের একটি মেয়ে আছে। বেচারা শাহিন!
দু’ঘণ্টা বিরতি। বাস বদল হবে না। তাই স্যুটকেস আর বের করা হল না। আমার ভারী খাবার খেলাম। যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় সব রেস্টুরেন্টে সকাল এগারোটা থেকে আড়াইটা পর্যন্ত লাঞ্চের সময়। সবাই ঠিক করলাম মেক্সিকান খাবার খাবো। কারণ তাতে রাইস আছে। গত ক’দিন রাইস খেতে না পেরে খুব কষ্টে ছিলাম। সাধে কি আর বলে, ‘মাছে, ভাতে বাঙালি!’ তবে তাদের রাইসে ফ্লেভার আছে, সাথে জার্ক চিকেন। জার্ক চিকেন অনেকটা রতিসরি চিকেনের মতো, কিন্তু একটু ড্রাই। যত টাকাই হোক ভাত চাই-ই চাই। জনপ্রতি প্রায় ১০ ডলার।
ডলার কিনেছিলাম বত্রিশ টাকা করে তাতে খাবারের দাম পড়ল তিনশ বিশ টাকা। তাতে কি? খাচ্ছি, এ সময় পি এ সিস্টেমে শোনা গেল ফার্মো গামি আমাদের বাস সহসাই ছাড়বে। তড়িঘড়ি করে আধ-খাওয়া খাবারের বাক্স নিয়ে বাসে উঠতে গেলে আমাদের বলা হল বাসে ভারী খাবার নেয়া যাবে না। কি আর করা, খাবারের বাক্স ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে অনেকটা খালি পেটে বাসে উঠতে হল।
কিছুদূর যেতেই হঠাৎ ঘন তুষারপাত শুরু হলো। বাসের গতি কমে গেলো। সাদা তুলোর বলের মতো তুষার আবছা করে দিলো দৃষ্টি। ড্রাইভার সাহেবের সামনে ওয়াইফার ব্লেড দুটো যেন পাল্লা দিয়ে উইন্ডশিল্ড পরিষ্কার করছে। কিছুদূর যাবার পর দেখলাম হাইওয়ের পাশে বরফে পিছলে একটি গাড়ি উপুড় হয়ে পড়ে আছে। আশেপাশে কেউ নেই। একটু ভয় পেয়ে গেলাম। আমরা সবাই তরুণ, কুড়ি থেকে পঁচিশের মধ্যে সবার বয়স। কেউই এ বয়সে এ সুন্দর পৃথিবী ত্যাগ করতে রাজি নই। সামনের সিটের হাতল শক্ত করে ধরে রাখলাম। প্রার্থণা করলাম আমাদের যেন এ অবস্থায় পড়তে না হয়। ড্রাইভার জানালেন আমরা সামনের রেস্ট এরিয়ায় থামবো। তুষারপাত কমবার জন্য অপেক্ষা করবো।
যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারস্টেট হাইওয়েগুলোতে দু’দিকের রাস্তার মাঝে সাধারণত সবুজ ঘাসে ঢাকা কিছু খলি জায়গা থাকে যাকে মেডিয়ান স্ট্রিপ বলা হয়। দুর্ঘটনায় কবলিত এদিককার গাড়ি যেন ওদিকটায় ছিটকে পড়ে প্রাণহানি না ঘটে তাই এই ব্যবস্থা। প্রতি দশ থেকে তিরিশ মাইলের মধ্যে রেস্ট এরিয়ার দেখা মেলে হাইওয়েগুলোতে। যে সমস্ত হাইওয়েতে গাড়ি কম চলে সে সমস্ত হাইওয়েতে এদের দূরত্ব পঞ্চাশ মাইলেরও অধিক। রেস্ট এরিয়াতে পেট্রোল পাম্প ছাড়াও সাধারণত ফুড কোর্ট আর ভিজিটর ইনফরম্যাশন বুথ দেখা যায়। পেট্রোলকে গ্যাস বলা হয় এ দেশে আর প্যাট্রোল পাম্পকে গ্যাস স্টেশন বা ফিলিং স্টেশন। ৪৯টি স্টেটে আপনি চাইলে নিজে গাড়ির তেল ভরতে পারবেন। শুধু মাত্র নিউ জার্সি স্টেটে এটেনডেন্ট আপনার গাড়িতে তেল ভরে দিতে পারবেন। ১৯৪৯ সালে এ স্টেটে “ঞযব জবঃধরষ এধংড়ষরহব উরংঢ়বহংরহম ঝধভবঃু অপঃ ধহফ জবমঁষধঃরড়হং” আইন পাশ করা হয়। এ আইনের আওতায় গাড়ির চালক নিজে তেল ভরা আইনত দ-নীয়।
কচ্ছপ গতিতে চলছে আমাদের বাস। সামনের রেস্ট এরিয়া প্রায় ১১ মাইল দূরে। রাস্তা যেন আর ফুরায় না। আমরা সবাই শক্ত হয়ে বসে আছি। প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট পর রেস্ট এরিয়াতে ঢুকে পড়ল আমাদের বাসটি। মাটিতে ছয় ইঞ্চির মতো তুষার দেখা যাচ্ছে। বাস থেকে নেমে এর উপর দিয়ে হেটে ফুড কোর্টে যেতে হবে। আমাদের অনেকেরই এই প্রথম তুষারপাত দেখা। আমি অবশ্য এর আগে জাপানের টোকিং শহরে তুষারপাত দেখেছি। বাস থেকে নামতেই উত্তেজনায় বন্ধু নিপু হোঁচট খেয়ে বরফের উপর পড়ে গেল। আমরা তাকে নিয়ে খুব হাসাহাসি করলাম। শাহিন চোখ বন্ধ করে হা করে বলফ গিলছে। যেন অমৃত সুধা পান করছে। তার দেখাদেখি আমরাও জিহ্বা বের করে বরফ গিলছি। দুষ্ট জসিম মাটি থেকে এক গাদা বরফ হাতে নিয়ে আমার মুখে ভরে দিল। থু থু করতে করতে ফুড কোর্টে পৌঁছালাম বাকিদের সাথে। ড্রাইভার আমাদের সাথে আসলেন না। বোধ করি তিনি সব গুছিয়ে আসবেন। ফুড কোর্টে ঢুকেই দেখি ফাস্ট ফুডের দোকান “জড়ু জড়মবৎং” আমেরিকার একটি ফ্রেঞ্চাইজ খাবারের দোকান। ১৯৫৫ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার সেন বার্নার্দিনো (ঝধহ ইবৎহধৎফরড়হব) শহরে ৫৩ বছর বয়সী নি¤œ মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম রে ক্রক (জধুসড়হফ অষনবৎঃ কৎড়প) ম্যাকডোনাল্ড দোকানটি ক্রয় করেন। এ দোকানটিতে দু’ভাই, যাদের ডাকা হত ম্যাকডোনাল্ড ব্রাদার্স, বার্গার, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই এবং সেক (ংযধশব) বিক্রয় করতেন। রে এ নামটি ব্যবহার করে ফ্রেঞ্চাইজ সিস্টেম তৈরি করেন যেটাকে পৃথিবীর সবচাইতে সেরা সফল ব্যবসায়ী চিন্তাধারা বলে বিবেচনা করা হয়। এ সিস্টেমে তিনি দোকনের সবকিছু সরবরাহ করবেন কিন্তু তিনি দোকানের মালিকানা নেবেন না। নেবেন লভ্যাংশের মাত্র চার শতাংশ। ১৯৮৪ সালে রে যখন মারা যান তখন তার একাউন্টে ছিল ৬০০ মিলিয়ন ডলার যা আজকের টাকায় এক বিলিয়ন ডলারেরো বেশি। এ ব্যবসার সফলতা অনুসরণ করে অনেক ফাস্ট ফুড চেইনের জন্ম হয়। রয় রজার্স ম্যাকডোনাল্ডসের মতই অন্য একটি ফ্রেঞ্চাইজ ফাস্ট ফুড চেইন। রয় রজার্স দোকানের একটি মেনুতে পাওয়া যাবে আটটি ফ্রায়েড চিকেনের পিস, সাথে আসবে বিস্কিট। আমরা যেটাকে বিস্কিট বলি বাংলাদেশে সেটাকে এদেশে বলে কুকি (ঈড়ড়শরব) বিস্কিট বলতে বেশ মজাদার ছোট একটি পাউরুটিকে বোঝায়। আমরা ছ’জন দু’বাকেট চিকেন নিলাম। (পরবর্তী অংশ দেখুন আগামি সোমবার)

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 210 People

সম্পর্কিত পোস্ট