চট্টগ্রাম রবিবার, ১১ এপ্রিল, ২০২১

সর্বশেষ:

২৫ মার্চ, ২০২১ | ১:২৪ অপরাহ্ণ

মনিরুল ইসলাম রফিক

রমজান-পূর্ব মাস শাবান ও পবিত্র শ’বে বরাত

হিজরী সন মোতাবেক পবিত্র শাবান মাসের ১৪তারিখ দিনগত জ্যোৎস্নাময় রজনী পবিত্র শবে বরাত। আবার শ’বে বরাতের পক্ষকাল পরে শুরু হচ্ছে সিয়াম সাধনার মাস রমজান। রমজানুল মোবারক মুসলিমসমাজে সর্বাধিক আলোড়ন সৃষ্টিকারী ও বহু ঘটনার পুণ্য স্মৃতিবাহী বরকতময় মাস। মাসটি মাতিয়ে যায় এর আগের ও পরের মাসগুলো। রমজানের আগের মাসে চলে মাসব্যাপী সিয়াম সাধনার প্রস্তুতিমূলক মহড়া ও ব্যস্ততা। মাহে রমজানের পরের মাসে থাকে সিয়াম ও ঈদুল ফিতরের নানা জের ও আমেজ।

এখন আরবী শা’বান মাস, দোরগোরায় পবিত্র শবে বরাত বা লাইলাতুল বরাত। মাহে রমজানকে সফল করে তোলার জন্য শাবান মাসের বহুবিধ কর্মসূচী রয়েছে। এ’টি জীবন সাধনার এক বিনিসুতোর বন্ধনে আবদ্ধ পিরিয়ড। মহানবী হুজুরে পুর নুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুন্দর বলেছেন, রজব মাস হলো পুণ্যের ক্ষেতে বীজ বপনের মাস, শা’বান উঠতি ক্ষেতে পানি সিঞ্চন বা সরবরাহের মাস আর রমজান হলো পূণ্য ফসল ঘরে তোলার মাস। সুতরাং যে ব্যক্তি রজবে বীজ ফেলবে না, শা’বানে তাতে পানি দেবে না সে ব্যক্তি কিভাবে রমজানের মাহিনায় ভাল ফসল লাভের আশা করতে পারে?

মহানবীর (সা.) উপরোক্ত বাণী থেকেই আমরা মাসগুলোর ধারাবাহিকতা রক্ষার গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারি। আমরা হযরত রাসূলে কারীমের (সা.) জীবনে আরো দেখি, তিনি এ ধারাবাহিকতা রক্ষার তাওফীক দানের জন্য প্রায়শই পরওয়ার দিগার আল্লাহতায়ালার দরবারে দোয়া, মোনাজাত করতেন। তিনি বলতেনঃ আল্লাহুম্মা বা-রিক লানা ফি রাজাবা ওয়া শা’বা-না ওয়া বাল্লিগনা’র রমজানা’- হে আল্লাহপাক। তুমি আমায় রজব ও শা’বানে বরকত দাও আর রমজান পর্যন্ত পৌঁছার সৌভাগ্য দান কর।’ আমরাও যেন হুজুরে আকরাম (সা.) এর কণ্ঠের সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে এ দোয়া ও প্রত্যাশা পোষণ করি।

কোন প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়ার জন্য এবং তাতে কৃতিত্ব ও বিজয় লাভের জন্য অবশ্যই কিছু সুনির্দিষ্ট প্রস্তুতি পর্ব পালন করতে হয়। দিতে হয় প্রয়োজনীয় মহড়া, তদ্রুপ রমজানে মাসব্যাপী কৃচ্ছতা সাধনের যে প্রতিযোগিতা, আমিত্ব বিলুপ্ত করে ইনসানিয়াত গড়ার যে প্রত্যয় তা সফল করার জন্য শা’বান মাস ও পবিত্র শবে বরাতের আমল অনিবার্য।

হযরত রাসূলে কারীম (সা.) এ মাসে তাই রোজার অভ্যাস করার জন্য তাগিদ দিয়েছেন, দান সাদকা করার জন্য বলেছেন, গুরুত্বারোপ করেছেন রাত্রি জাগরণের উপর। রোজা রাখার তাগিদ করতে গিয়ে তিনি এরশাদ করেছেনঃ নাক্কু আবদা নাকুম বিসাউমি শা’বান-অর্থাৎ তোমরা তোমাদের শরীরকে শাবান মাসে রোজা রেখে পাক-পবিত্র করে নাও রমজানের সিয়াম সাধনার সুবিধার জন্য। যে এ মাসে তিনটি রোজা রাখবে তার গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। হযরত মুহাম্মদ (সা.) নিজে এ মাসে প্রায়ই রোজা রাখতেন। আমরা আসন্ন পবিত্র শবে বরাতকে সামনে রেখে এ তিনটি রোজা রাখতে পারি, অথবা মাসের যে কোন সময় রাখা যায়।

রাত জাগা সম্পর্কে আঁ-হযরত (সা.) বলেনঃ তিনটি আওয়াজ, আল্লাহর বেশ পছন্দ। ১) মোরগের আওয়াজ। যেহেতু মোরগ প্রতুষে আওয়াজ ও জিকির করে বণি আদমের ঘুম ভাঙ্গায়। ২) কুরআন তিলোয়াতকারীর কণ্ঠ। কারণ ঐ কণ্ঠে খোদার মহিমা প্রকাশ পায়। ৩) আর ঐ ব্যক্তির সুর যে ব্যক্তি শেষ রাতে আল্লাহর ধ্যানে (যখন সারা দুনিয়া ঘুমের ঘোরে অচেতন) করুণ আবেগময় চিত্তে খোদাকে ডাকে।’ তিনি আরো বলেছেনঃ ঘুম হলো মৃত্যুর ভাই, জান্নাতের আহালগণের মৃত্যু হয় না। পক্ষান্তরে দোযখীদের মরণও নেই জীবনও নেই।

অর্থাৎ জান্নাত প্রত্যাশীরা আল্লাহর দীদারের জন্য পাগলপারা হয়ে ঘুমকে তুচ্ছজ্ঞান করে ইবাদতকে প্রধান্য দেয়। আর প্রকৃত জান্নাতবাসীদের তো মৃত্যু নেই। পক্ষান্তরে দোযখের শাস্তি ও ভয়াবহতা এতো বেশী যে, তা থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার মত জীবনও নেই মৃত্যু হবেনা। কঠিন যন্ত্রনায় দাহ হতে হবে প্রতিনিয়ত। তাই ঘুমের আধিক্য পরিহার করে আমাদের উচিৎ ইহ-পরকালের সরোসামান যোগাড় করা। পবিত্র শবে বরাত উপলক্ষ্যে আল্লাহপাকের অগণিত প্রিয় বান্দাগণ রাত্রি জাগরণ করে। ইবাদত বন্দেগীতে তিলাওয়াত ও রোনাজারীতে দিবানিশি গুজরান করে। মুনাজাতে বলে: আল্লাহুম্মা ইন্না আসআলুকাল জান্নাহ ওয়া নাউযুবিকা মিনান্নার’!  খুদাওয়ান্দ কুদ্দুস। আমরা তোমার নয়নাভিরাম বেহেশতের ভিখারী আর কঠিন আযাবস্থল জাহান্নাম থেকে পানাহ কামনা করি।

এ মাস আসলেই ইসলামী সোনালী যুগের মু’মিন মুসলমানরা ক্রমেই কুরআন তিলাওয়াতের দিকে মনোনিবেশ করতেন এবং অধিক পুণ্যলাভের আশা ও সমাজের নিঃস্ব অসহায়দের সুবিধার কথা বিবেচনা করে দান-সদকায় বেশ তৎপর হয়ে উঠতেন। এতে আলোকিত হয়ে উঠত নিজের অন্ধকার হৃদয়ের জগত আর গরীব মানুষেরা একটু সচ্ছল হয়ে সিয়ামের মাসের খরচ পোষিতে নিতে পারতো। আমাদেরকেও এসব ঐতিহ্য বজায় রাখতে হবে একটি সামাঞ্জস্যপূর্ণ ভ্রাতৃত্বময় সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য। (খুতবা ইবন নুবাতা)

এ মাসের গুরুত্বপূর্ণ বিশেষত্ব হল পবিত্র শবে বরাত। বছরে অত্যধিক পূণ্যময় রাতের মধ্যে এ’টি অন্যতম। নবী পত্নী হযরত আয়েশা (রাদি.) হতে একটি হাদীস বর্ণিত আছে। তিনি বলেনঃ আমি এক রাতে মহানবীকে (সা.) যথাস্থানে না পেয়ে খুঁজতে থাকি। হঠাৎ দেখি তিনি সেজদারত। কিন্তু তার দীর্ঘক্ষণ সিজদাবনত অবস্থা দেখে আমার মনে এ সন্দেহ হয় যে, হয়তো আঁ-হযরতের (সা.) প্রাণবায়ু বের হয়ে গেছে। আমি তাড়াতাড়ি এসে তাঁর পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলী নাড়া দিলাম। ক্ষণিক পরে তিনি উঠে পড়েন এবং আমাকে উদ্দেশ্য করে বলেনঃ আয়েশা! তুমি কি জান না আজ কোন রাত? আজ তো লাইলাতুন নিস মিন শাবান অর্থাৎ শাবান মাসের ১৫ তারিখের রাত।’

মা-সাবাতা বিস সুন্নাহর বর্ণনা থেকে জানা যায়, মহান আল্লাহ প্রত্যেক রাতেই পৃথিবীর আসমানে তাশরীফ আনেন, তার সে আগমন ঘটে রাতের শেষ তৃতীয়াংশে। তবে শাবানের ১৫ তারিখের রাতের ব্যাপারটি এর ব্যতিক্রম। সে রাতে মাগরিবের ওয়াক্ত থেকে আল্লাহর শুভাগমন ঘটে এবং তিনি ফজর পর্যন্ত রহমতের ফল্গুধারা বিতরণ করেন-। আমাদের উচিৎ, ইবাদত বন্দেগী ও রোনাজারীর মাধ্যমে এ পবিত্র রজনী অতিবাহিত করা। এমন কোন কর্মকান্ডে অংশ নেয়া উচিৎ নয় যার দ্বারা রজনীটির ভাবগম্ভীর পরিবেশ বিঘ্নিত হয় এবং মু’মিন মুসলমানদের নিরবচ্ছিন্ন ধ্যানে বিড়ম্বনার সৃষ্টি হতে পারে।

বর্তমান যুগে দেখা যাচ্ছে শবে বরাত নিয়ে এক পক্ষের চলছে বাড়াবাড়ি আরেক পক্ষের চলছে ছাড়াছাড়ি। কেউ কেউ শবে বরাতকে নিয়ে ইসলাম ও ইবাদাতের নামে নানা বিদআত ও কুসংস্কার কাজে লিপ্ত হয় আবার অন্য পক্ষ হঠাৎ করে বলে বেড়াচ্ছে শবে বরাত বা লাইলাতুন নিসফ মিন শাবান নামে পালনীয় কিছু নেই। আমরা উভয় পক্ষের বাড়াবাড়িতে নেই। আমরা মনে করি এটি যুগ যুগ ধরে প্রমাণিত ও পালিত একটি নফল ইবাদাতের রজনী । মাহে রমজানের আগে রোজাদারদের জন্য এ রজনী একটি ভিন্ন উদ্দীপনা ও প্রস্তুতি নিয়ে আসে।

এ বিষয়ে ইসলামের প্রকৃত কনসেপ্ট কি, শবে বরাত আসলেই কি কি কাজ কিভাবে আঞ্জাম দিলে মহান স্রষ্টার সন্তুুষ্টি ও ক্ষমা অর্জন করা যায় তা আগেই জেনে নেয়া উচিৎ। ইবাদতে একটু শিরক কিম্বা ভ্রান্তির মিশ্রণ সমূদয় সার্থকতা ধূলিস্যাত করে দিতে পারে। নফল নামাজ, কুরআন তিলোয়াত, তাসবীহ-তাহলীল ও সব ক’টি পাঞ্জেগানা নামাজ জামায়াতের সাথে আদায় করতে পারাই হলো এ রাতে একজন মু’মিনের জন্য সৌভাগ্যের ব্যাপার। তাই এ মাহে শাবান, পবিত্র লাইলাতুল বারাআত এবং আসন্ন রহমত বরকত ও মাগফিরাতের মাস মাহে রমজানের পবিত্রতা রক্ষায় এবং এ থেকে ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার জন্য আমাদের ইখলাসের সাথে কাজ করতে হবে। আল্লাহ আমাদের তাওফীক দিন।

লেখক: মনিরুল ইসলাম রফিক অধ্যাপক, টিভি উপস্থাপক ও জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত খতীব।

পূর্বকোণ/এএ

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 259 People

সম্পর্কিত পোস্ট