চট্টগ্রাম সোমবার, ১৮ জানুয়ারি, ২০২১

সর্বশেষ:

২৯ আগস্ট, ২০২০ | ২:১৬ অপরাহ্ণ

মো. দিদারুল আলম

করোনাকালে বাল্যবিয়ে ও শিক্ষা থেকে ঝরেপড়ার ঝুঁকি

করোনা ভাইরাস সংক্রমণ রোধে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ। এই ভাইরাসের কারণে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে অনেক অভিভাবক কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েছেন। কাজ না থাকায় অনেকের ঘরেই অভাব। সামাজিক নিরাপত্তার বিষয় চিন্তা করে অনেক বাবা-মা কন্যাশিশুটিকে নিজের কাছে রাখতে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। এ পরিস্থিতিতে গ্রাম ও শহরে কন্যাশিশুকে লুকিয়ে বিয়ে দিচ্ছেন অনেক অভিভাবক। ফলে দেশে ব্যাপকহারে বেড়ে গেছে বাল্যবিয়ে।

করোনাভাইরাস প্রার্দুভাবের কারণে গত ক’মাসে দেশে বাল্যবিয়ের হার স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে বলে সাম্প্রতিক এক জরিপে উঠে এসেছে। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের (এমজেএফ) টেলিফোন জরিপে বলা হয়েছে, জুন মাসে ৪৬২টি কন্যাশিশু বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ২০৭টি বাল্যবিয়ে বন্ধ করা গেছে। তার আগের মে মাসেও ১৭০টি বাল্যবিয়ে হয়। অবশ্য বন্ধ করা গেছে ২৩৩টি। জরিপে আরও দেখা যায়, জুন মাসে দেশের ৫৩ জেলায় মোট ১২ হাজার ৭৪০ জন নারী ও শিশুনির্যাতনের শিকার হয়েছেন। মে মাসে এই সংখ্যা ছিল ১৩ হাজার ৪৯৪। জুনে নির্যাতনের শিকার নারীদের মধ্যে তিন হাজার ৩৩২ জন নারী ও শিশু আগে কখনোই নির্যাতিত হননি।

জুনের শুরুতে বেড়েছে শিশুনির্যাতন। শিশুরা তাদের বাবা-মায়ের হাতেই নির্যাতনের শিকার। গৃহবন্দি থাকার কারণে এমন নির্যাতন বেড়েছে। জুনে ৫৩ জেলায় মোট ৫৭ হাজার ৭০৪ জন নারী ও শিশুর সঙ্গে কথা বলে এই জরিপ করা হয়েছে বলে জানানো হয় সংবাদ সম্মেলনে। ২০১৮-২০৩০ সালের মধ্যে বাল্যবিয়ে নিরোধ সংক্রান্ত ন্যাশনাল একশন প্লান বাস্তবায়নে এবং করোনার কারণে কন্যাশিশু ও কিশোরী মেয়েদের সামাজিক নিরাপত্তা বিধানে চলতি অর্থবছরে কোনো নির্দিষ্ট বরাদ্দ রাখা হয়নি, যদিও বাংলাদেশ সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে বাল্যবিয়ে এবং জোর করে বিয়ে বন্ধ করার ব্যাপারে অঙ্গীকারবদ্ধ।

বাল্যবিয়ে রোধে ২০১৭ সালে একটি আইন পাস হয়েছে। ওই আইনে বলা হয়, কোনো নারী ১৮ বছরের আগে এবং কোনো পুরুষ ২১ বছরের আগে যদি বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন, তাহলে তাকে দুইবছর কারাভোগ করতে হবে। যারা বিয়ে সম্পন্ন করবেন তাদেরও একই শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। ইউনিসেফের তথ্যে বলা হয়, এদেশে ৫৯ শতাংশ মেয়ের বয়স ১৮ বছর হওয়ার আগেই বিয়ে হয়। আর ২২ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয় ১৫ বছরের আগে। বাল্যবিয়ের দিক দিয়ে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। আমাদের দেশে বাল্যবিয়ে দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে যে শাস্তির বিধান রয়েছে, তা অনেকে জানে না। আইনে শাস্তির বিষয়টি সবাইকে জানাতে হবে। বাল্যবিয়ের ক্ষতির বিষয়েও সচেতন করতে হবে। আইনের সঠিক প্রয়োগ হলে দেশে বাল্যবিয়ে কমে আসবে।

বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ একটি মারাত্মক সমস্যা। ইউনিসেফের শিশু ও নারী বিষয়ক প্রতিবেদন অনুসারে বাংলাদেশের ৬৪% নারীর বিয়ে হয় ১৮ বছরের আগে। বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন অনুসারে ছেলেদের বিবাহের বয়স নূন্যতম একুশ এবং মেয়েদের বয়স আঠারো হওয়া বাধ্যতামূলক। অশিক্ষা, দারিদ্র, নিরাপত্তাহীনতা ও সামাজিক নানা কুসংস্কারের কারণে এ আইনের তোয়াক্কা না করে বাল্যবিবাহ হয়ে আসছে।
বাল্যবিবাহের প্রধান কুফল : নারীশিক্ষার অগ্রগতি ব্যাহত হওয়া ছাড়াও বাল্যবিবাহের কারণে মাতৃমৃত্যুর ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে। মা হতে গিয়ে প্রতি ২০ মিনিটে একজন মা মারা যাচ্ছেন। অন্যদিকে প্রতি ঘণ্টায় মারা যাচ্ছে একজন নবজাতক। নবজাতক বেঁচে থাকলেও অনেক সময় তাকে নানা শারীরিক ও মানষিক জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়। অপ্রাপ্তবয়স্ক মা প্রতিবন্ধী শিশু জন্মদান করতে পারে। এছাড়া এতে গর্ভপাতের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায় বাল্যবিবাহের ফলে বিবাহবিচ্ছেদের আশঙ্কা তৈরি হওয়া ছাড়াও নানা পারিবারিক অশান্তি দেখা দেয়।
বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের উপায় : বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনটি বাস্তবায়নে ব্যাপক প্রচার/প্রচারণা করা প্রয়োজন। রেডিও, টেলিভিশনে ও সংবাদপত্রের মাধ্যমে বাল্য বিবাহের কুফল সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করা যেতে পারে। গ্রামপর্যায়ে উঠান বৈঠক ও মা সমাবেশ এক্ষেত্রে ফলপ্রসূ হবে। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করার জন্য প্রয়োজনে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাতক্ষণিক বিবাহ বন্ধসহ মামলা রজ্জু করা যেতে পারে। জন্মনিবন্ধন সনদ ব্যতীত কোনো অবস্থায়ই নিকাহ রেজিস্টার যেন বিবাহ নিবন্ধন না করেন, সেরূপ আইন প্রণয়ন করা যেতে পারে প্রতিটি ইউনিয়নে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা যেতে পারে। নবম ও দশম শ্রেণির পাঠ্যবইতে এ বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হলে এর সুফল পাওয়া যাবে। জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে বেসরকারি সংস্থাগুলোও উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারে।

শেষ কথা : সরকারের দিনবদলের অঙ্গীকার রয়েছে ২০২১ সালের মধ্যে শিশুমৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ৫৪ থেকে কমিয়ে ১৫ করা হবে। ২০২১ সালের মধ্যে মাতৃমৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ৩.৮ থেকে কমিয়ে ১.৫ করা হবে। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করা না গেলে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে না। বাল্যবিবাহ সংকুচিত করে দেয় কন্যাশিশুর পৃথিবী। আমরা যদি সবাই সচেতন হই তাহলে কন্যাশিশুদের অধিকার প্রতিষ্ঠা হবে।
দেশে মা ও শিশুর অকাল মৃত্যু রোধ করা সম্ভব হবে। তাই বাল্যবিবাহ বন্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে এখন থেকেই। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্ঠা ছাড়া বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ সম্ভব নয়।

লেখক: মো. দিদারুল আলম প্রাবন্ধিক।

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 369 People

সম্পর্কিত পোস্ট