চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ২১ জানুয়ারি, ২০২০

৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ | ৪:৫৫ পূর্বাহ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক হ ঢাকা অফিস

সুপ্রিম কোর্টে হট্টগোল

খালেদার জামিন শুনানি বাড়াবাড়ির একটা সীমা আছে : প্রধান বিচারপতি

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জামিন শুনানি নিয়ে নজিরবিহীন হট্টগোল হয়েছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে। দুই পক্ষের আইনজীবীদের হট্টগোলের মধ্যে ৭ মিনিট চুপচাপ বসে ছিলেন প্রধান বিচারপতিসহ আপিলের ছয় বিচারপতি। গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা ৩৫ মিনিটে পুনরায় প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন ছয় বিচারপতির আপিল বেঞ্চের কার্যক্রম শুরু হয়। শুনানিতে খালেদার স্বাস্থ্যগত তথ্যের বিষয়ে আদালতের কাছে সময় চান রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। তখন খালেদা জিয়ার আইনজীবী জয়নুল আবেদীন বলেন, আমাদের কাছে প্রতিবেদন আছে। এটর্নি জেনারেল বলেন, কীসের প্রতিবেদন, ওটা ড্যাবের প্রতিবেদন। জয়নুল আবেদীন বলেন, বিএসএমএমইউ’র। জয়নুল আবেদীন আরও বলেন, বুধবার প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘খালেদা জিয়া রাজার হালে আছেন।’ এ পর্যায়ে বিএনপির আইনজীবীরা আদালতে হৈ চৈ ও হট্টগোল শুরু করেন। তবে মওদুদ আহমদসহ কয়েকজন সিনিয়র আইনজীবী তাদের থামানোর চেষ্টা করেন।

এসময় প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘বাড়াবাড়ির একটা সীমা আছে। আমরা আপিল বিভাগে এমন অবস্থা আগে কখনো দেখিনি। অর্ডার দেওয়া হয়ে গেছে। এজলাসে বসে আদালতের পরিবেশ নষ্ট করবেন না।’ এরপর প্রধান বিচারপতিসহ বিচারকরা এজলাস ছেড়ে যান।

এর আগে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন এ প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ১২ ডিসেম্বর দিন ধার্য করেন। খালেদার আইনজীবীরা অবশ্য চাচ্ছিলেন ৭ ডিসেম্বর যেন এ দিন ধার্য করা হয়।
খালেদা জিয়ার মেডিকেল রিপোর্ট দাখিল ও জামিন সংক্রান্ত পরবর্তী শুনানির দিন ধার্যের আদেশ দেওয়ার পরও আদালতকক্ষে বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা অবস্থান-হইচই করতে থাকেন।

আইনজীবীরা জানান, প্রথম দফায় সকাল ১০টার দিকে জামিন শুনানির পরবর্তি দিন ধার্যের আদেশ দিয়ে বিচারপতিরা আদালতকক্ষ ত্যাগ করেন। পরে, বিরতির পর বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বিচারপতিরা আবার এজলাসে আসেন। অন্য মামলার কার্যক্রম শুরু হয়। তখনও বিএনপি-সমর্থক আইনজীবীরা আদালতকক্ষে বসে ছিলেন। তাঁরা হইচই করতে থাকেন। ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ বলে স্লোগান দেন। এক পর্যায়ে খালেদা জিয়ার পক্ষের আইনজীবী জয়নুল আবেদীন ডায়াসে দাঁড়ান। এ সময় আদালত বলে, তাঁরা আপিল বিভাগে এমন অবস্থা আগে কখনো দেখেননি। খালেদা জিয়ার অপর আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, ‘আমি শেষবারের মতো কথা বলতে চাই।’ আদালত বলে, ‘আমরা আদেশ দিয়েছি। আর কোনও কথা শুনব না।’ খালেদা জিয়ার আরেক আইনজীবী মাহবুব উদ্দিন খোকন শুনানির তারিখ এগিয়ে আনার আরজি জানান। আদালত বলেন, ‘আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। বৃহস্পতিবার শুনব।’ এ সময় খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা তুমুল হৈ চৈ ও হট্টগোল করতে থাকেন।

এ অবস্থায় হৈ চৈ এর মধ্যেই আদালতের ক্রম অনুসারে মামলা ডাকা হয়। ১১টা ৪৫ মিনিটের দিকে শুনানির জন্য দাঁড়ান আইনজীবী আজমালুল হোসেন কিউসি। বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা টেবিল চাপড়ানোর মধ্যেও শুনানি করার চেষ্টা করেন আজমালুল হোসেন কিউসি। এ সময় বিএনপিপন্থী কয়েকজন আইনজীবী বলেন, খালেদা জিয়ার জামিন শুনানি ছাড়া আর কোনও মামলার শুনানি হবে না। এক পর্যায়ে সরকার-সমর্থক ও বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি হয়। দুপুর ১২টা ১৫ মিনিটের দিকে বিএনপিপন্থী কয়েকজন আইনজীবী স্লোগান দেন- ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস, শেম শেম, খালেদা জিয়া, খালেদা জিয়া।’ পরে, আজমালুল হোসেন কিউসি যে মামলা শুনানির জন্য দাঁড়িয়েছিলেন, সেটির জন্য বৃহস্পতিবার দিন রাখেন আদালত। পরে বিচারপতিরা আদালতের এজলাস ত্যাগ করেন।

বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা আদালত অবমাননা করেছেন : আদালতে হট্টগোলের পর সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ভবনের উত্তর হলে তাৎক্ষণিক এক প্রতিক্রিয়ায় এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের হৈ চৈ এর ফলে আদালত অবমাননা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, ‘তারা নজিরবিহীন হট্টগোল করেছেন। তাদের বিশৃঙ্খলার জন্য আদালত উঠে যেতে বাধ্য হয়েছেন। তারা আদালতের কার্যক্রম ঠিকমতো চালাতে দেয়নি। এটা খুবই ন্যাক্কারজনক। আমরা সবাই এর প্রতিবাদ জানাচ্ছি। তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রধান বিচারপতির কাছে দাবি জানাচ্ছি।’ মাহবুবে আলম বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু মেডিকেল (বিএসএমএমইউ) জানিয়েছে, যেহেতু তার (খালেদা জিয়া) স্বাস্থ্যের নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা হচ্ছে, এগুলো শেষ করে রিপোর্ট দিতে সপ্তাহখানেক সময় লাগবে। আদালত যখন আমাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে আগামী বৃহস্পতিবার দিন ধার্য করলেন, তখনই বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা চরম হট্টগোল ও গ-গোল শুরু করে। তারা এদিন যে বিশৃঙ্খলা করেছে, এটা অভাবনীয়। আমাদের এই বয়সে আদালতে এমন বিশৃঙ্খলা কোনোদিন দেখিনি।’ তিনি আরো বলেন, ‘তারা আদালতকে একটি অবমাননাকর অবস্থানে নিয়ে গেছে এবং জনসভায় যেমন হট্টগোল হয় সেরকম হট্টগোল আদালতে করেছে। তারা এসব কা- করেছে আদালতের ওপর অবৈধ চাপ সৃষ্টির জন্য।’ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এম আমিন উদ্দিন বলেন, বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের আদালতে এ ধরনের অবস্থান আইনের প্রতি অনাস্থা ও অশ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ।

এটর্নি জেনারেলকে দুষলেন বিএনপির আইনজীবীরা :
জামিন শুনানি নিয়ে আপিল বিভাগের হট্টগোলের পর সংবাদ সম্মেলনে করে বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা দীর্ঘক্ষণ আদালতে অবস্থান করে বিচার কাজ বন্ধ রাখার ঘটনার জন্য রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা এটর্নি জেনারেলকে দায়ী করেছেন। এ ঘটনাকে নজিরবিহীন বলেও উল্লেখ করেন তারা। আইনজীবী সমিতির অডিটোরিয়ামে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন- বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, সিনিয়র আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন, জয়নুল আবেদীন, ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন।

খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, এদিন যে ঘটনা ঘটলো তার সব দায়-দায়িত্ব এটর্নি জেনারেলের। কেননা বেগম জিয়ার মামলায় মেডিকেল রিপোর্টের দরকার হয় না। এ মামলায় সর্বোচ্চ সাজা সাত বছর। সাত বছরই তাকে দিয়েছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ হচ্ছে তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। আজকে তিনি দীর্ঘ দিন ধরে হাজতে রয়েছেন অথচ এই ধরনের মামলায় শত শত আসামি জামিন নিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, আমি প্রথম থেকে বলে এসেছি, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জন্য, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বেগম জিয়াকে জেলে রাখা হয়েছে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া বেগম খালেদা জিয়াকে আইনি প্রক্রিয়ায় মুক্ত করা যাবে না। খালেদা জিয়াকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, একটি বিচারাধীন মামলায় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, খালেদা জিয়া রাজার হালে আছেন। আল্লাহ যদি কোনোদিন সুযোগ দেন বাংলার জনগণও একদিন তাকেও হয়তো এমন সুযোগ দেবেন।

বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, একটা মামুলি মামলায়, মিথ্যা অভিযোগে খালেদা জিয়াকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। তিনি প্রায় একবছর ১০ মাস ধরে জেলে আছেন। কেন এতোদিনে তার জামিন হয়নি আজকে আপনারা তা বুঝতে পারছেন।

The Post Viewed By: 125 People

সম্পর্কিত পোস্ট