চট্টগ্রাম শুক্রবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৯

২০ নভেম্বর, ২০১৯ | ২:৫৪ পূর্বাহ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা অফিস

লবণ গুজবে অস্থিরতা

মন্ত্রণালয়ের প্রেসনোট হ মজুদ সাড়ে ছয় লাখ মে. টন হ গুজব ছড়ালে কঠোর ব্যবস্থা হ গুজব না ছড়াতে মেয়রের আহ্বান

দেশে লবণ বিপণনকারী শীর্ষ চারটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, দেশে লবণের কোনো ঘাটতি নেই; বরং বাড়তি লবণ নিয়ে কোম্পানিগুলো ও চাষীরা বিপাকে আছেন। দাম বাড়ার আশঙ্কা পুরোটাই গুজব। দেশের বিভিন্ন জেলায় হঠাৎ করেই লবণ কেনার হিড়িকের পরিপ্রেক্ষিতে কোম্পানিগুলো তাদের মজুদ সম্পর্কে এসব কথা জানায়।

লবণ সরবরাহকারী শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান এসিআই সল্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ আলমগীর বলেন, ‘এটি সম্পূর্ণ গুজব। সরবরাহের কোনো সমস্যা নেই। আমরা একটি পয়সাও দাম বাড়াইনি।’ তিনি বলেন, ক্রেতাদের আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। মোল্লা সল্টের মহাব্যবস্থাপক আবদুল মান্নান বলেন, তিনি কক্সবাজারে রয়েছেন। সেখানে চাষীদের কাছেই চার লাখ টনের মত লবণ মজুদ আছে। তিনি আরও বলেন, বাজারে লবণের দাম নেই। লবণের চাহিদা কম। এ কারণে অনেক চাষী এখনো নতুন মৌসুমের লবণ চাষ শুরু করেননি। আবদুল মান্নানের কথায়, ‘আমরা দাম বাড়াইনি। সরবরাহ ঠিক আছে। মিল আগামী দুই মাস চালানোর মতো লবণ আমাদের হাতে আছে।’ কনফিডেন্স সল্টের মহাব্যবস্থাপক মো. সামসুদ্দিন বলেন, ঘাটতি তো নেই-ই, উল্টো বিক্রি কম। এর কারণ শুল্কমুক্ত বন্ডের লবণ বাজারে চলে আসছে। দেশি কৃষক ও মিলমালিকেরা বিপাকে আছেন। তিনি আরও বলেন, মিলগুলোও খুব খারাপ অবস্থায় আছে।

পূবালী সল্টের মালিক পরিতোষ কান্তি সাহা বলেন, ‘আমার কাছে যারাই লবণের কথা জানতে চাইছে, তাদের বলছি, কত লাগবে নেন। কোনো অভাব নেই।’ তিনি আরও বলেন, নারায়ণগঞ্জে অপরিশোধিত লবণের বস্তা (৭৫ কেজি) ৫৮০ থেকে ৬০০ টাকা। এ দামে কৃষকের খরচই ওঠে না। বাজারে এখন বিক্রি কোম্পানির সবচেয়ে ভালো মানের লবণের প্যাকেটের গায়ে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (এমআরপি) লেখা ৩৫ টাকা। আর সাধারণ লবণের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ২৫ টাকা। পরিতোষ কান্তি সাহা এর বেশি দামে লবণ না কিনতে পরামর্শ দেন ক্রেতাদের।

এদিকে গতকাল শিল্প মন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, দেশে বর্তমানে সাড়ে ছয় লাখ মেট্রিক টনের বেশি ভোজ্যলবণ মজুদ রয়েছে। এর মধ্যে কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের লবণচাষিদের কাছে ৪ লাখ ৫ হাজার মেট্রিক টন এবং বিভিন্ন লবণ মিলের গুদামে ২ লাখ ৪৫ হাজার মেট্রিক টন লবণ মজুদ রয়েছে। মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, দেশে প্রতি মাসে ভোজ্যলবণের চাহিদা কমবেশি এক লাখ মেট্রিক টন। অন্যদিকে, লবণের মজুদ আছে সাড়ে ৬ লাখ মেট্রিক টন। তারপরও একটি স্বার্থান্বেষী মহল লবণের সংকট রয়েছে মর্মে গুজব রটনা করে অধিক মুনাফা লাভের আশায় লবণের দাম অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। এ ধরনের গুজবে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয়। গতকাল মঙ্গলবার শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সারাদেশে বিভিন্ন লবণ কোম্পানির ডিলার, পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতাদের কাছে পর্যাপ্ত পরিমাণে লবণ মজুদ রয়েছে। পাশাপাশি চলতি নভেম্বর মাস থেকে লবণের উৎপাদন মৌসুম শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে কক্সবাজার জেলার কুতুবদিয়া ও মহেশখালী উপজেলায় উৎপাদিত নতুন লবণও বাজারে আসতে শুরু করেছে।

প্রসঙ্গত, লবণ-সংক্রান্ত বিষয়ে তদারকির জন্য শিল্প মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশনের (বিসিক) প্রধান কার্যালয়ে ইতোমধ্যে একটি কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। এর নম্বর হচ্ছে: ০২-৯৫৭৩৫০৫ (ল্যান্ড ফোন), ০১৭১৫-২২৩৯৪৯ (সেল ফোন)। লবণ-সংক্রান্ত যেকোনো তথ্যের প্রয়োজনে কন্ট্রোল রুমের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য বলা হয়েছে।

ঢাকায় পুলিশের তল্লাশি : দেশে লবণের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে যাতে কেউ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে তাই পুলিশ সদস্যদের দোকানে দোকানে গিয়ে তল্লাশি চালানোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। গতকাল ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (অপারেশন) মনিরুল ইসলাম ওয়ারলেসে পুলিশ সদস্যদের এই নির্দেশ দেন। নির্দেশনা পেয়ে থানা এলাকার পুলিশ সদস্যরা বিভিন্ন দোকানে গিয়ে লবণের মজুতের খোঁজখবর নিচ্ছেন। মুগদা এলাকার একজন স্থায়ী বাসিন্দা জানান, বিকেলে দোকানে দোকানে পুলিশ অভিযান চালিয়ে বেশি দামে লবণ বিক্রি করায় কয়েকজনকে আটক করে। এ বিষয়ে মুগদা থানার ওসি প্রলয় কুমার সাহা বলেন, লবণ নিয়ে যাতে কোনো বিশৃঙ্খলা না হয় সেজন্য পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে প্রচারণা চালাচ্ছি। এছাড়াও কেউ অতিরিক্ত দামে লবণ বিক্রি করছে কি না- সে বিষয়ে নজর রাখছি। সূত্র জানায়, ধানমন্ডি ও হাজারীবাগে অভিযান চালিয়ে পাঁচজনকে আটক করলেও বিষয়টি এখনও স্বীকার করেনি পুলিশ। ধানমন্ডি থানা পুলিশ জানায়, ঊর্ধ্বতনের নির্দেশ পেয়ে ধানমন্ডি ও হাজারীবাগ এলাকার সুপারশপ এবং দোকানগুলোতে লবণের খোঁজে পুলিশ যায়। গিয়ে দেখে অনেক দোকানে লবণ শেষ। কী কারণে তাদের লবণ নেই, চালানের সঙ্গে মজুতের পরিমাণ দেখা হচ্ছে। তবে বেশিরভাগ দোকানে গিয়ে লবণ পাওয়া যায়নি।

এ দিকে গতকাল সন্ধ্যায় শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত পুরান ঢাকার নয়াবাজারে অভিযান চালাচ্ছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল্লাহ আল মামুন। অভিযানের শুরুতে তিনি বাজারের পাইকারি দোকানগুলোতে লবণের মজুদ নজরদারি করছেন। ব্যবসায়ীদের কাছে লবণের দাম বৃদ্ধি ও সংকটের কারণ জানতে চাইছেন। অভিযানের ফলাফলের বিষয়ে পরবর্তীতে সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত জানিয়ে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে ডিএমপি।

লবণ গুজবে কান দেয়ার আহবান সিটি মেয়রের : দেশে লবণের প্রাপ্যতা নিয়ে গুজবে কান না দেয়ার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহবান জানিয়েছেন সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন। তিনি গতকাল মঙ্গলবার রাতে এক বিবৃতিতে এই আহবান জানান। তিনি বলেন, একটি মহল সুপরিকল্পিতভাবে দেশে গুজব ছড়ানোতে লিপ্ত রয়েছে। এই ধরনের গুজব সরকারের ভাবমূর্তি বিনষ্ট, অস্থিতিশীল করা এবং জনগণকে জিম্মি করার অপকৌশল বলে তিনি উল্লেখ করেন মেয়র। প্রকৃতপক্ষে দেশে লবনের পর্যাপ্ত মওজুদ রয়েছে। আগামী ডিসেম্বর মাসে নতুন লবণ উৎপাদিত হয়ে বাজারে আসবে। যা বতর্মান মওজুদের সাথে যোগ হবে। ফলে দেশে লবণের কোন সংকট নেই এবং সংকটের কোন সম্ভাবনাও নেই। তিনি লবণ নিয়ে কিংবা অন্য কোন বিষয়ে কোন মহল বা ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ছড়ানোর তীব্র নিন্দা জানিয়ে সংশ্লিষ্টদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পুলিশ প্রশাসনের প্রতি আহবান জানান।

The Post Viewed By: 69 People

সম্পর্কিত পোস্ট