চট্টগ্রাম রবিবার, ০৮ ডিসেম্বর, ২০১৯

সর্বশেষ:

১৪ নভেম্বর, ২০১৯ | ৬:৪৫ অপরাহ্ন

অনলাইন ডেস্ক

রেলওয়ের বার্ষিক প্রতিবেদন

অতিরিক্ত কর্মঘণ্টাই রেল দুর্ঘটনার জন্য দায়ী

রেলপথে ৭২ ভাগ দুর্ঘটনা ঘটছে চালক, স্টেশন মাস্টার ও গার্ডের ভুলের কারণে। অথচ চাহিদার অর্ধেকেরও কম লোকবল দিয়ে এই তিন পদে ট্রেন চালানোয় সংশ্লিষ্টদের ওপর চাপ বাড়ছে। লোকবলের অভাবে অতিরিক্ত শ্রমে সচল রাখা হয়েছে রেলপথ। পরিশ্রমের ধকল সামলে উঠতে না পারায় তিন পদে কর্মরতরা প্রায়ই ঘটাচ্ছে ভয়াবহ সব দুর্ঘটনা।

এছাড়া দুর্ঘটনার নেপথ্যে কারিগরি ত্রুটির জন্য প্রায় ২৩ শতাংশ এবং অন্যান্য কারণে বাকি দুর্ঘটনা ঘটছে ৫ ভাগ। জনবলের অভাবে এদের জন্য করা সম্ভব হয় না দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও। ফলে কাজের ফাঁকে সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ নিয়ে মাঠে নামছেন তারা। এসব কারণে ক্রমশই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে নিরাপদ রেলভ্রমণ। এসব তথ্য উঠে এসেছে রেলের বার্ষিক দুর্ঘটনা পর্যালোচনা প্রতিবেদনে।  বেশিরভাগ দুর্ঘটনার জন্য ট্রেনচালক, গার্ড ও স্টেশন মাস্টারকে দায়ী করা হয়েছে রেলের ওই প্রতিবেদনে।

সোমবার গভীররাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া মন্দবাগ স্টেশনে দুর্ঘটনার জন্য প্রাথমিকভাবে দায়ী করা হয়েছে ট্রেনের চালক, সহকারী চালক ও গার্ডকে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, অধিকাংশ স্থানের মতো এখানেও চালক ও সহকারী চালক ঘুমিয়ে পড়ার কারণে এ দুর্ঘটনা হয়েছে।

রেলওয়ে মহাপরিচালক মো. শামছুজ্জামান জানান, আখাউড়া মন্দবাগে দুই ট্রেনের সংঘর্ষের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা এসেছে। সব ত্রুটিমুক্ত করে যথাযথ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আরও দক্ষ করা হবে সংশ্লিষ্টদের। মানব ভুলের কারণে হচ্ছে প্রায় ৭২ শতাংশ দুর্ঘটনা। ‘হিউম্যান এরর’ বলতে মূলত চালকের অসতর্কতা, সিগন্যাল অমান্য করা, স্টেশন মাস্টারের দেয়া ভুল সিগন্যাল ও গার্ডের ভুলকেই বোঝায়। রয়েছে রেল লাইনে সমস্যা, ইঞ্জিন বিকল, সিগন্যাল কাজ না করা ইত্যাদি রয়েছে কারিগরি ত্রুটির মধ্যে।

রেলপথ মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রেন পরিচালনার সঙ্গে জড়িত গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ট্রেনচালক, গার্ড ও স্টেশন মাস্টার। এ তিন পর্যায়ে অনুমোদিত পদের সংখ্যা ৩ হাজার ৪৯৩ হলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন ২ হাজার ২৭৪ জন। অর্থাৎ লোকবল ঘাটতি আছে এক হাজার ২১৯ জন। এর মধ্যে ৬৩৯ জন কম চালক পদে। ও শূন্য রয়েছে ১৩১ জন গার্ড এবং ৪৪৯ জন স্টেশন মাস্টারের পদ। অতিরিক্ত শ্রম দিয়ে শূন্যপদের বর্তমানে কর্মরতরা কাজগুলো চালিয়ে নিচ্ছেন। অতিরিক্ত শ্রম দিতে গিয়ে তারা আট ঘণ্টা নির্ধারিত সময়ের বিপরীতে কাজ করছেন গড়ে টানা ১৪-২২ ঘণ্টা। আগামী দু’মাসের মধ্যে তিন পদ থেকে শতাধিক লোকবল অবসরে গেলে সে ক্ষেত্রে আরও চাপ বাড়বে কর্মরতদের ওপর।

এদের মধ্যে ট্রেনচালক পর্যায়ে শূন্য পদ সবচেয়ে বেশি যার পরিমাণ ৬৩৯টি। অথচ চালক পদে কাজ করছেন ১ হাজার ১১৮ জন। এদের মধ্যে ট্রেন সান্টিংসহ কারিগরি কাজের সঙ্গে জড়িত প্রায় সাতশ’ জন। নিয়মিত ট্রেন চালাচ্ছেন বাকি ৪২২ জন চালক ও সহকারী চালক। সারা দেশে তারা ৩ হাজার ১৫৫ কিমি. রেলপথে ৩৮০টি ট্রেন চালাচ্ছেন। এ পরিমাণ ট্রেন চালানোর জন্য প্রয়োজন প্রায় চার হাজার দক্ষ চালকের। সেখানে নিয়মিত কাজ করছেন ৪২২ জন। ফলে প্রত্যেক চালককে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে (৮ ঘণ্টা) কয়েকগুণ বেশি শ্রম দিয়ে সচল রাখতে হচ্ছে ট্রেনের চাকা। অনেক ক্ষেত্রে একজন চালককে যাওয়া-আসায় ট্রেন চালাতে হয় গড়ে ২৪-৩৬ ঘণ্টা। এরপর এক দিনের জন্য বিশ্রাম পান তারা।

১৮৯০ সালের রেলওয়ে আইন  অনুযায়ী, কোনো চালক ৮ ঘণ্টা ট্রেন চালালে তাকে, যাত্রা শুরুর আগে ১২ ঘণ্টা বিশ্রাম দিতে হবে। কিন্তু স্বল্পতার কারণে ২৪ ঘণ্টা কাজ করার পরও বিশ্রাম দেয়া সম্ভব হয় না। অতিরিক্ত সময় কাজ করার কারণে ট্রেন চালাতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ছেন চালক। একই সাথে ভুল করছেন সিগন্যাল দেখতে। ফলে দুর্ঘটনা ঘটছে।

নির্ধারিত স্টেশনে চালকদের বিশ্রামের জন্য ‘রানিং রুম’ থাকার কথা। আইনানুযায়ী রানিং রুমগুলো আধুনিক হওয়ার কথা। যেখানে তাদেরকে পুষ্টিকর খাবার দেয়া হবে। রান্নার লোক থাকবে। বিনোদন ও খেলাধুলার সু-ব্যবস্থা থাকবে। বাস্তবে এসবের কিছুই নেই। যেসব স্টেশনে রানিং রুম আছে, তা স্বাধীনতার আগে। মেয়াদোত্তীর্ণ এসব ভবনে থাকতে হয় ভয় আর আতঙ্ক নিয়ে।

রেলওয়ে ট্রেনচালক ও গার্ড এসোসিয়েশনের একজন কর্মকর্তা জানান, অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠেছে রানিং রুমগুলো ঘিরে। এসবের কোনো রক্ষণাবেক্ষণ নেই। বিশ্রাম নেয়া যায় না, উইপোকা থেকে শুরু করে ইঁদুর, পোকা-মাড়কের বসবাস রুমগুলোতে।

বর্তমানে রেলে ৩৫৬টি যাত্রীবাহী ট্রেন রয়েছে। এর মধ্যে আন্তঃনগর রয়েছে ৯৮টি। মালবাহী ট্রেন রয়েছে ৩০টি। অর্থাৎ যাত্রী ও মালবাহী ট্রেন মিলে ট্রেন আছে মোট ৩৮০টির মতো। ট্রেনের গার্ড (পরিচালক) স্বল্পতাও তীব্র। ১ হাজার ৩৫৬টি পদের বিপরীতে কাজ করছেন ৪শ’ জন। চালকের মতো অতিরিক্ত শ্রম দিতে হচ্ছে গার্ডকেও। অথচ চালককে সতর্ক করাসহ বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে থাকেন একজন গার্ড।

গার্ডের দায়িত্ব আরও গুরুত্বপূর্ণ। একটি ট্রেনে ১ জন করে গার্ড থাকেন। ট্রেনের একেবারে পেছনে ছোট্ট একটি বগিতে (৮ ফুট বাই ১০ ফুট) গার্ড বসেন। ট্রেনচালক-সহকারী চালক সিগন্যাল ভুল করলেও গার্ড ইচ্ছে করলেই ট্রেন দাঁড় করাতে পারেন। কিন্তু বাস্তবে অনেক গার্ডই তা করেন না। চালককের মতো গার্ডও ক্লান্ত থাকায় অনেক সময় চলন্ত ট্রেনের নিজ কামরায় ঘুমিয়ে পড়েন তিনি। ফলে রাতের পালায় ঘুমন্ত চালক ও গার্ডের নিয়ন্ত্রণে চলতে থাকে গতিদানব ট্রেন। এ ধরনের ক্ষেত্রেই দুর্ঘটনা ঘটে থাকে অধিকাংশ সময়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সিনিয়র গার্ড জানান, চালকদের মতো অতিরিক্ত সময় কাজ করতে হয় তাদেরও। এতে ঘুম, খাওয়া-দাওয়া, গোসল ঠিক থাকে না। কাজেই ভুল হতেই পারে। এমন অবস্থায় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ আগামী কয়েক মাসের মধ্যে ৪৪ জন অবসরপ্রাপ্ত গার্ডকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেবেন বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে অবসরপ্রাপ্ত এক গার্ড বলেন, ৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করানো হলে তারাও চুক্তি ভঙ্গ করে কাজ বন্ধ করে দেবেন। কারণ, তাদের বয়স হয়েছে। এ বয়সে শুধু ঊর্ধ্বতনের অনুরোধের ভিত্তিতেই তারা কাজটুকু করতে চাচ্ছেন।

রেলে স্টেশন রয়েছে মোট ৪৪৬টি যার মধ্যে চালু আছে ৩৫৪টি। বন্ধ রয়েছে বাকি ১১২টি স্টেশন। স্টেশন মাস্টার স্বল্পতা দিন দিন চরমে উঠছে। যেখানে ১ হাজার ২০৫ জন স্টেশন মাস্টার থাকার কথা। বর্তমানে আছে ৭৫৬ জন আর শূন্যপদ রয়েছে ৪৪৯টি।

রেলপথ বিভাগের অপারেশন বিভাগ থেকে জানা যায়, স্টেশন মাস্টারের জন্য এখনও ১১২টি স্টেশন চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। বন্ধ স্টেশনের কারণেও ঘটছে দুর্ঘটনা। বন্ধ স্টেশনগুলোর প্রতিটির দু’পাশেই রয়েছে সিগন্যাল পয়েন্ট। এসব স্টেশনে লোকবল না থাকায় খুব ধীরগতিতে ট্রেন চালাতে হয়। তাছাড়া পয়েন্টে পাথর কিংবা কোনো শক্ত কিছুর টুকরো ভেতরে থাকলে চরম ঝুঁকি নিয়ে ওই সব স্থান পার হতে হয়।

প্রতিটিতে স্টেশন মাস্টার ও সহকারী স্টেশন মাস্টার বাধ্যতামূলক থাকতে হয়। কিন্তু, চলমান স্টেশনগুলোতে লোকস্বল্পতার কারণে প্রায়ই একজন করে দায়িত্ব পালন করেন। বিশেষ করে রাতের বেলায় দায়িত্বরত স্টেশন মাস্টার প্রায় ঘুমিয়ে পড়েন কিংবা ক্লান্ত হয়ে ঝিমুতে থাকেন।

এ বিষয়ে রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) মিয়াজাহান জানান, চালক-গার্ডের সঙ্গে স্টেশন মাস্টার স্বল্পতা চরমে উঠেছে। আমরা বাধ্য হয়েই তাদের দিয়ে অতিরিক্ত কাজ করাচ্ছি। নতুবা ট্রেন পরিচালনা করা সম্ভব হবে না। এখনও ১১২টি স্টেশন বন্ধ রয়েছে। আমরা অচিরেই চুক্তিভিত্তিক অবসরপ্রাপ্ত স্টেশন মাস্টারদের নিয়োগ দেব। একই অবস্থা ট্রেনচালক ও গার্ডদের বেলায়ও।

পরিবহন বিভাগ থেকে জানা যায়, পূর্বাঞ্চলে ৩৬টি এবং পশ্চিমাঞ্চলে ৭৬টি স্টেশন বন্ধ রয়েছে। ট্রেনচালক, গার্ড ও স্টেশন মাস্টার স্বল্পতার সঙ্গে রেলে চলমান ট্রেনের অবস্থাও নড়বড়ে। মোট ২৬৮টি লোকোমোটিভের মধ্যে ১৯৭টি লোকোমোটিভ আয়ুষ্কাল উত্তীর্ণ। একই সঙ্গে ৩ হাজার ৪৮৬টি ওয়াগনের মধ্যে ১ হাজার ২৩৩টি ওয়াগন আয়ুষ্কাল উত্তীর্ণ।

রেলপথ সচিব মো. মোফাজ্জেল হোসেন বলেন,  দিন দিন যখন রেলে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে তখন এমন দুর্ঘটনা খুবই দুঃখজনক। আমরা প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা পেয়েছি। ইতিমধ্যে সে অনুযায়ী কাজ শুরু হয়েছে। ভারত ও চীনের চালক, গার্ড, স্টেশন মাস্টারদের উন্নয়নে প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউটের সঙ্গে আমরা চুক্তি করব। আমাদের চালক-গার্ড ও স্টেশন মাস্টারসহ সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হবে। একই সঙ্গে দেশেও তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। ইতিমধ্যে এ কাজটি শুরু হয়েছে। তাছাড়া খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে এ তিন পর্যায়ে শূন্যপদগুলোর বিপরীতে নিয়োগ। আমরা এসব নিয়োগ দেয়ার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। আধুনিক করা হবে গার্ড ও চালকদের জন্য রানিং রুম। করা হবে তাদের জন্য বিনোদনসহ খেলাধুলার ব্যবস্থা।

পূর্বকোণ/রাশেদ

The Post Viewed By: 72 People

সম্পর্কিত পোস্ট