চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০১৯

সর্বশেষ:

১০ অক্টোবর, ২০১৯ | ৬:৪৪ পিএম

নিজস্ব প্রতিবেদক

জুনিয়রদের ‘আতঙ্ক’ ছিলেন অমিত সাহা

বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার সন্দেহে গ্রেপ্তার হয়েছেন আলোচিত ছাত্রলীগ নেতা অমিত সাহা। তাকে গ্রেপ্তারের পর নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসছে বুয়েট শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে। অমিত সাহা বুয়েটের জুনিয়রদের ওপর বেশি আগ্রাসী ছিলেন বলে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ। বেশ কয়েকজন তার মারধরেরও স্বীকার হয়েছেন। এ কারণে জুনিয়র ব্যাচের শিক্ষার্থীরা অমিত সাহাকে আতঙ্ক হিসেবেই জানত।

বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ১৬তম ব্যাচের ছাত্র অমিত মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে বুয়েটে ভর্তি হন। পরে জড়িয়ে পড়েন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতিতে। বিশ্ববিদ্যালয় কমিটিতে পদ পেতে নিজেকে আগ্রাসী হিসেবে পরিচিত করেন ক্যাম্পাসে। ফলে স্বল্প সময়ে বনে যান বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের উপ-আইন বিষয়ক সম্পাদক।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ১৭ ব্যাচের শিক্ষার্থীরা জানান, অধিকাংশ শিক্ষার্থী তাদের ব্যাচের সিনিয়রদের মধ্যে একজনকে পেছন থেকে সবচেয়ে বেশি গালমন্দ করতেন। তিনি হচ্ছেন অমিত সাহা। তাকে সবসময় দেখা যেত আগ্রাসী ও মারমুখী।  কেউ তাকে দেখতে না পারলেও সামনাসামনি কেউ কিছু বলার সাহস পাননি।

আবরার হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে অমিতের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অমিত সাহার নির্যাতনের বিভিন্ন ঘটনা প্রকাশ পায়। বুয়েট ছাত্রলীগের ফেসবুক গ্রুপে কাকে কবে র্যাগ দেয়া হবে আলোচনা হতো সে বিষয়ে।

দুদিন ধরেই করে আসছিলেন বুয়েটের শিক্ষার্থীরা অভিযোগ জানিয়েছেন, আবরার হত্যাকাণ্ডে অমিত সাহা যে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। জানা যায়, বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের উপ-আইনবিষয়ক সম্পাদক অমিত সাহাই আবরার ফাহাদ হলে আছেন কিনা সে বিষয়ে প্রথম খোঁজ নিয়েছিলেন। অমিত সাহা ঘটনার দিন সন্ধ্যায় আবরারের এক বন্ধুকে ইংরেজি অক্ষরে ‘আবরার ফাহাদ হলে আছে কিনা’ মেসেজ দেন।

মেসেজ দেয়ার একঘণ্টার মধ্যেই শেরেবাংলা হলের ছাত্রলীগ নেতারা আবরারকে ১০১১ নম্বর কক্ষ থেকে ডেকে নিয়ে যায়। ২০১১ নম্বর কক্ষে এনে তাকে লাঠি, চাপাতি ও স্টাম্প দিয়ে পেটায়।

সূত্র বলছে, ৬ আগস্ট রাতে অমিত সাহার রুমে প্রথম দফায় মারধরের নেতৃত্ব দেন ছাত্রলীগ বুয়েট শাখার সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেল। বুয়েট ছাত্রলীগের বহিষ্কৃত সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান রবিন ও উপ-সমাজসেবা সম্পাদক ইফতি মোশাররফ সকাল তার সঙ্গে মারধর শুরু করেন।

পরে অনিক, জিয়ন, মনির ও মোজাহিদুলসহ অন্যরা যোগ দেন। রাত ১১টা পর্যন্ত প্রথম দফায় মারধর চলে। এরপর রাতের খাবার ও ব্যথানাশক ট্যাবলেট খাওয়ানো হয় আবরারকে। দেয়া হয় মলমও। দ্বিতীয় দফা মারধর শুরুর সময়  সবচেয়ে মারমুখী ছিলেন অনিক।

এ সময় আবরার বারবার বমি করছিলেন। একপর্যায়ে তাকে টেনে নিয়ে যাওয়া হয় মুন্নার কক্ষে। সেখানে অনিক ক্রিকেট স্টাম্প ভাঙেন আবরারের শরীরের ওপর। পরে আরেকটি স্টাম্প দিয়ে তাকে বেধড়ক পেটানো হয়। মুন্নার কক্ষেই তৃতীয় দফার মারধর শুরু হয়।

তখন মধ্যরাত। নির্মম পিটুনিতে লুটিয়ে পড়েন আবরার। এরপর ঘাতকরা নিথর দেহ টেনে হিঁচড়ে নিচে নামানোর চেষ্টা করেন। মাঝ সিঁড়িতে যেতেই তারা বুঝতে পারেন আবরার মারা গেছেন। তারা তখন সিঁড়িতেই মরদেহটি রেখে ওই স্থান ত্যাগ করেন।

প্রকাশিত ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, যারা নির্বিঘ্নে আবরারকে পিটিয়ে হত্যা করেছে, তারাই রাতে দীর্ঘ একটি সময় কাটিয়েছেন হল প্রভোস্ট জাফর ইকবাল খান ও বুয়েট ছাত্রকল্যাণ পরিচালক মিজানুর রহমানের সঙ্গে। ঘটনার পর  বেরিয়ে হলের গেটেই অবস্থান করেন তারা।

সকালের দিকে হল সরগরম হয়ে উঠলে শুরু হয় ঘাতকদের ছোটাছুটি। সবচেয়ে বেশি মারধর করা অনিক ওরফে মাতাল অনিক দৌড়ে চলে যান তার রুমের দিকে। পরে ডাক্তার ডাকা হয়। সাদা পাঞ্জাবি-পায়জামা পরা ওই ডাক্তার আবরারকে দেখে মৃত ঘোষণা করেন।

এর ২ মিনিট পর খুনিরা ব্যবস্থা করেন একটি স্ট্রেচারের। স্ট্রেচারটি রাখা হয় সিঁড়ির মুখে বারান্দায়। এর ২০ মিনিট পর লাশের কাছে আসেন প্রভোস্ট জাফর ইকবাল খান এবং ছাত্রকল্যাণ পরিচালক মিজানুর রহমান। পরে প্রভোস্ট ও ছাত্রকল্যাণ পরিচালককে খুনিরা ঘটনার বর্ণনা দিতে থাকেন নিজেদের মতো করে। চশমা পরা রাসেল ও সবচেয়ে বেশি মারধর করা অনিককে প্রভোস্টের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কথা বলতে দেখা যায়।

প্রসঙ্গত, ভারতের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়ায় হত্যা করা হয় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে। ভারতের সঙ্গে চুক্তির বিরোধিতা করে ফাহাদ শনিবার বিকালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন। এর জের ধরে রবিবার রাতে শেরে বাংলা হলের নিজের ১০১১ নম্বর কক্ষ থেকে তাকে ডেকে নিয়ে ২০১১ নম্বর কক্ষে বেধড়ক পেটানো হয়। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। পিটুনির সময় নিহত আবরারকে খুনিরা ‘শিবিরকর্মী’ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা চালায়। তবে তার পরিবারের সদস্যসহ সংশ্লিষ্টরা আবরার কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না বলে নিশ্চিত করেছেন।

হত্যাকাণ্ডের প্রমাণ না রাখতে সিসিটিভি ফুটেজ খুনিরা মুছে (ডিলেট) দেয়ার পরও তবে পুলিশের আইসিটি বিশেষজ্ঞরা তা উদ্ধারে সক্ষম হন। পুলিশ ও চিকিৎসকরা আবরারকে পিটিয়ে হত্যার প্রমাণ পেয়েছেন। এ ঘটনায় পুলিশ বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি মুহতাসিম ফুয়াদ ও সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেলসহ ১৪ জনকে গ্রেপ্তার করে।

এ ঘটনায় ১৯ জনকে আসামি করে তার বাবা চকবাজার থানায় ঘটনার পরদিন সোমবার রাতে একটি হত্যা মামলা করেন। বুয়েট কর্তৃপক্ষ একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছে। পাশাপাশি একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করেছে।

এদিকে, ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ মেলায় বুয়েট শাখার সহ-সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ ১১ জনকে  স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগ থেকে।

পূর্বকোণ/রাশেদ

The Post Viewed By: 3054 People

সম্পর্কিত পোস্ট