চট্টগ্রাম সোমবার, ২১ অক্টোবর, ২০১৯

৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ | ৯:২৪ অপরাহ্ণ

অনলাইন ডেস্ক

পাসপোর্টগুলো ঠিক, বাকি সবই জাল

চট্টগ্রামে গ্রেপ্তার তিন রোহিঙ্গা তরুণকে নোয়াখালী আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস থেকে বাংলাদেশি পাসপোর্ট দেওয়া হয়েছে জাল জন্ম নিবন্ধন সনদ ও নাগরিকত্ব সনদ জমা রেখে। পাসপোর্টে জাতীয় পরিচয়পত্র ও মোবাইল ফোনের যে নম্বর দেওয়া হয়েছে তা তাদের নাম-ঠিকানার মতই ভুয়া।

অভিযোগ উঠেছে, পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তা এবং তথ্য যাচাইয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত এসবি (পুলিশের বিশেষ শাখা) সদস্যরা ছাড়াও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কেউ কেউ পাসপোর্ট জালিয়াত চক্রের সঙ্গে জড়িত। এ বিষয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে জানিয়ে নোয়াখালীর পুলিশ সুপার মো. আলমগীর হোসেন বলেন, “তথ্য যাচাইয়ের দায়িত্বে যে পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন, যারা সার্টিফিকেট সৃজন করেছে, যারা সত্যায়ন করেছে- প্রত্যেকটা বিষয়ে তদন্ত হচ্ছে। এর পেছনে জড়িত প্রত্যেককে চিহ্নিত করা হবে এবং ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

ওই তিন রোহিঙ্গা তরুণকে গত ৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের আকবরশাহ এলাকা থেকে বাংলাদেশি পাসপোর্টসহ গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা পুলিশকে বলেন, তারা দালাল ধরে নোয়াখালী আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস থেকে পাসপোর্ট করিয়েছেন, তুরস্ক যাওয়ার আশায় তারা ঢাকা যাচ্ছিলেন ভিসার আবেদন করতে।

গ্রেপ্তার তিনজনের মধ্যে মোহাম্মদ ইউসুফ (২৩),তার ছোট ভাই মোহাম্মদ মুসার (২০) বাড়ি মিয়ানমারের মংডুর দুমবাইয়ে। আর মোহাম্মদ আজিজ ওরফে আইয়াজের (২১) বাড়ি মংডুর টালিপাড়ায়।

২০১৭ সালে আরাকানে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর অভিযান শুরুর পর তারা পালিয়ে বাংলাদেশে আসেন। কক্সবাজারের উখিয়ায় খাইয়াংখালী হাকিমপাড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে থাকছিলেন তারা। পুলিশকে তারা বলেছেন, টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নুরুল আলম ওরফে এরশাদ নামে এক ‘দালালের’ মাধ্যমে চকোরিয়ার পারভেজ নামের আরেক ‘দালালের’ সঙ্গে তাদের যোগাযোগ হয়। গত নভেম্বর মাসে ওই তিনজনকে নোয়াখালী আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে নিয়ে যান পাসপোর্ট। তারা সেখানে কোনো প্রশ্ন ছাড়াই সরাসরি আঙুলের ছাপ দিয়ে আসেন। পরে পারভেজের কাছ থেকে পাসপোর্ট বুঝে পান। আর সেজন্য তিনজন মিলে এরশাদকে দুই লাখ ৫৫ হাজার টাকা দেওয়ার কথা পুলিশকে বলেছেন ওই তিন তরুণ।

নোয়াখালী আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের উপ পরিচালক মোহাম্মদ নুরুল হুদা জানান, ইউসুফ ও মুসার পাসপোর্ট ইস্যু করা হয়েছে ২০১৮ সালের ২৪ ডিসেম্বর। স্থায়ী ঠিকানা লেখা হয়েছে নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার কাদরা ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের নজরপুর গ্রাম। কাদরা ইউনিয়নের নজরপুর গ্রাম ৬ নম্বর ওয়ার্ডের অর্ন্তগত, কিন্তু ইউসুফ ও ‍মুসার পাসপোর্টের ঠিকানায় ৭ নম্বর ওয়ার্ডের কথা লেখা হয়েছে।

এ ব্যাপারে খোঁজ নিতে গেলে নজরপুর গ্রাম পুলিশের দফাদার মহরম আলী বলেন, “এ গ্রামে মোহাম্মদ ইউসুফ ও মোহাম্মদ মুসা নামে দুই ভাই নাই। পুলিশের কোনো অফিসার ওই নামের কারও পাসপোর্ট ভেরিফিকেশন করতে আমার সাথে কথা বলেনি।”

আজিজের নামে পাসপোর্ট ইস্যু করা হয়েছে ২০১৯ সালের ২২ জানুয়ারি। তাতে স্থায়ী ঠিকানা লেখা হয়েছে সেনবাগ উপজেলার কাদরা ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের নিজসেনবাগ গ্রাম।

কিন্তু বাবা ও ছেলের নাম মেলে, এরকম কেউ ওই গ্রামে নেই বলে জানান কাদরা ইউনিয়ন পরিষদের প্রাক্তন সদস্য মো. ইলিয়াস।

সেনবাগ থানার ওসি মিজানুর রহমান বলেন, “আমরা ওই তিন রোহিঙ্গার পাসপোর্ট পাওয়ার বিষয়টি তদন্ত করে দেখছি। যে ঠিকানা তারা দিয়েছে, সেখানে ওই নামের কারও অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। পুরোটাই ভুয়া।”

জেলা পুলিশের বিশেষ শাখার (ডিএসবি) পরিদর্শক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান জানান, নোয়াখালী আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের নথিপত্র যাচাই করে তারা দেখেছেন, ওই তিন তরুণের ফাইলে কাদরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ কামরুজ্জামানের স্বাক্ষরে নাগরিকত্ব সনদ এবং প্রাক্তন চেয়ারম্যান মো. ওবায়দুল হক স্বাক্ষরিত জন্ম নিবন্ধন সনদের কপি রয়েছে। “কিন্তু তাদের পাসপোর্টে উল্লেখিত জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর ও মোবাইল ফোন নম্বরগুলোর কোনো অস্তিত্ব আমরা পাইনি। আমরা জেলা সার্ভার স্টেশনে যাচাই করে দেখেছি, জালিয়াত চক্র যেসব তথ্য পাসপোর্টে দিয়েছে তার সবই ভুয়া।”

মোহাম্মদ ইউসুফ, মোহাম্মদ মুসা ও মোহাম্মদ আজিজের নামে জন্ম নিবন্ধন সনদ ও নাগরিকত্ব সনদের যে কপি পাসপোর্ট অফিসে জমা আছে, সেরকম কোনো সনদ কাদরা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে দেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন চেয়ারম্যান মোহাম্মদ কামরুজ্জামান। তিনি বলেন, জন্ম নিবন্ধন সনদে ইস্যুর তারিখ দেখানো হয়েছে ২০১৫ সালের ২৮ জানুয়ারি। কিন্তু ইউনিয়ন পরিষদের নিবন্ধন রেজিস্ট্রার বা অনলাইন সার্ভারে এর কোনো অস্তিত্ব নেই। “আমি ২০১৬ সালের ২১ ডিসেম্বর চেয়ারম্যান হিসাবে শপথ নিই। ২০১৮ সালের নভেম্বরে নাগরিকত্ব সনদ দিতে হলে আমারই তা দেওয়ার কথা। কিন্তু ওই সনদ আমাদের অফিস ইস্যু করা নয়।”

মুসা ও আজিজের নামে দুটি নাগরিকত্ব সনদেই সিরিয়াল নম্বর দেওয়া হয়েছে ১৪৮৭। অথচ একটি নম্বরে একাধিক সনদ দেওয়ার সুযোগ নেই। সনদ দেওয়ার সময় একটি কপি ইউনিয়ন পরিষদে সংরক্ষিত থাকার কথা। আর সনদের বইয়ের মুড়িতেও নাম লিখে রাখা হয়। কিন্তু কাদরা ইউনিয়ন পরিষদে সংরক্ষিত নাগরিকত্ব সনদের মুড়িতে ১৪৮৭ নম্বর সিরিয়ালের সদনটি কার নামে ইস্যু করা হয়েছে তা লেখা নেই।

এ ব্যাপারে প্রশ্ন করলে চেয়ারম্যান মোহাম্মদ কামরুজ্জামান বলেন, ওই সনদটি ইউনিয়ন পরিষদের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য জসিম উদ্দিনকে অলিখিত অবস্থায় দেওয়া হয়েছিল। আর জসিম উদ্দিন বলেছে, ওই সনদ কাকে দেওয়া হয়েছিল, তা এখন আর তার মনে নেই।

নোয়াখালী পুলিশের বিশেষ শাখার এক কর্মকর্তা বলেন,  “স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং পাসপোর্ট ভেরিফিকেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত এসবি কর্মকর্তারাও এই জালিয়াতিতে জড়িত। না হলে এভাবে ভুয়া পাসপোর্ট তৈরি করা যায় যায় না।” ওই কর্মকর্তা জানান, ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে বানানো পাসপোর্ট নিয়ে ৫৪ জন রোহিঙ্গা গত ফেব্রুয়ারি মাসে দেশত্যাগ করার সময় বিমানবন্দরে গ্রেপ্তার হয়। ওই ৫৪ জনের মধ্যে দুজন সেনবাগ উপজেলার ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে পাসপোর্ট তৈরি করিয়েছিলেন।

“মোটা টাকার বিনিময়ে তদন্ত না করেই রিপোর্ট দেওয়ার অভিযোগে সে সময় জেলা এসবির এএসআই আবুল কালাম আজাদকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। একই ঘটনায় এএসআই নুরুল হুদার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।” তবে এ বিষয়ে এএসআই আবুল কালাম আজাদ বা এএসআই নুরুল হুদার বক্তব্য জানা যায়নি।

নোয়াখালী আঞ্চলিক পাসপোর্ট অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ নুরুল হুদা বলেন, “জেলা বিশেষ শাখা আবেদনপত্র যাচাই বাচাই করে রিপোর্ট দেওয়ার পরই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নামে পাসপোর্ট ইস্যু করা হয়। ৩ রোহিঙ্গার পাসপোর্ট করার বিষয়ে আমাদের অফিসের কারও জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

সূত্র: বিডিনিউজ২৪

পূর্বকোণ/আল-আমিন

The Post Viewed By: 198 People

সম্পর্কিত পোস্ট