চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

সর্বশেষ:

২৫ আগস্ট, ২০১৯ | ২:২৫ এএম

মোর্শেদ নয়ন , কর্ণফুলী

রোধ হয়েছে বন্দরের জলসীমায় বিদেশি জাহাজে চুরি ও দস্যুতা

কোস্টগার্ডের সফল কর্মকৌশল

বাংলাদেশের জলসীমায় পণ্যবাহী বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজে চুরি ও দস্যুতার ঘটনা শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে। গত এক বছরে বাংলাদেশের জলসীমায় অবস্থান করা বিদেশি জাহাজগুলোতে কোন ধরণের চুরি ও দস্যুতার ঘটনা ঘটেনি। বাণিজ্যিক জাহাজে সংঘটিত সশস্ত্র ডাকাতি, দস্যুতা ও চুরি প্রতিরোধে বিভিন্ন সংঘটিত অপরাধ সংক্রান্ত ঘটনাসমূহ সংগ্রহ, সংকলন ও প্রচার করার আন্তর্জাতিক সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম ব্যুরো, পাইরেসি রিপোর্র্টিং সেন্টার এবং রিক্যাপের ২০১৯ সালের প্রতিবেদনসমূহে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। রিক্যাপের তথ্য অনুসারে, সর্বশেষ ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত এগারটি চুরির ঘটনা ঘটেছিলো। এরপর আর কোন চুরি ও দস্যুতার ঘটনা ঘটেনি। চট্টগ্রাম বন্দর সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এক সময় বিদেশ থেকে পণ্যবাহী বাণিজ্যিক জাহাজগুলো বাংলাদেশের জলসীমায় পৌঁছার পর চুরি বা দস্যুতার কবলে পড়ত। এ কারণে চট্টগ্রাম বন্দরকে ‘পাইরেসি বন্দর’ হিসেবে চিহ্নিত করে আসছিল বিদেশি জাহাজ মালিকরা। বন্দরের বহির্নোঙর ও জলসীমায় আসা জাহাজে চুরি-ডাকাতির ঘটনা বাড়লে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। পণ্য পরিবহনে বাড়তি ভাড়া আরোপ করে বিদেশি জাহাজ মালিক ও শিপিং লাইনগুলো। এতে বিপাকে পড়তে হয় দেশীয় আমদানি-রপ্তানিকারকদের। উপরন্তু তারা বাংলাদেশমুখী রুটে জাহাজ ভাড়া দিতে চায় না। বিগত বছরগুলোতে এসব ঘটনা কম বেশি

ঘটলেও ২০১৮ সালে আগস্ট হতে চুরি ও দস্যুতার ঘটনা শূন্যের কোটায় নেমে আসায় বিষয়টি নিয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষ, বন্দর ব্যবহারকারী ও জাহাজ মালিকদের উদ্বেগ কিছুটা কমেছে। কোস্ট গার্ড ও বন্দর সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির স্বর্ণদ্বার। মূলত সারাদেশের পণ্য আমদানি/রপ্তানি বাণিজ্যিক জাহাজের মাধ্যমে এ বন্দর দিয়ে সম্পন্ন হয়ে থাকে। এর ধারানুযায়ী বহির্নোঙ্গরে আগমন ও অবস্থানকারী সকল বাণিজ্যিক জাহাজের সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্ব বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের উপর ন্যস্ত। বন্দরের জেটি সুবিধা সীমিত বিধায় বাণিজ্যিক জাহাজসমূহকে পরিকল্পিত সময়সূচি অনুযায়ী অপেক্ষমাণ হিসেবে বর্হিনোঙ্গরে অবস্থান করতে হয়। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় শতাধিক বাণিজ্যিক জাহাজ এ বর্হিনোঙ্গরে অবস্থান করে। সম্প্রতি ক্রমবর্ধমান উন্নয়ন ও চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে বর্হিনোঙ্গরের বন্দরসীমা উত্তরে মীরসরাই ও দক্ষিণে মহেশখালী পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়েছে। এরপরও বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের সর্বাত্মক প্রচেষ্টায় চুরি/দস্যুতার ঘটনা রোধ করা সম্ভব হয়েছে বলে জানা গেছে। রিক্যাপ ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, রিক্যাপ যে কোন বাণিজ্যিক জাহাজে দস্যুতা/চুরির ঘটনাকে চারটি ক্যাটাগরিতে বিবেচনা করে। তন্মধ্যে ক্যাটাগরি ১ হচ্ছে সশস্ত্র দস্যুতা/অপহরণ এবং মুক্তিপণ দাবির মতো ঘটনা। রিক্যাপের অর্ধবার্ষিক রিপোর্টে বলা হয়েছে, চলতি ২০১৯ সালের জানুয়ারি-জুন ছয় মাসে এশিয়া জুড়ে দস্যুতার ঘটনা রেকর্ড হয়েছে মোট ২৮টি। এর মধ্যে ঘটনা ঘটেছে ২৫টি আর চেষ্টা হয়েছে ৩টি। ২০১৮ সালের প্রথম ছয় মাসে ঘটনা রেকর্ড হয়েছিল ৪১টি। এর মধ্যে ঘটনা ঘটে ২৯টি আর চেষ্টা হয় ১২টি। ২০১৮ সালের তুলনায় ২০১৯ সালের প্রথম ছয় মাসে দস্যুতার ঘটনা কমেছে ৩২ শতাংশ। রিক্যাপ রিপোর্টে ২০১৯ সালে বাংলাদেশের জলসীমায় কোন চুরি ও দস্যুতার চেষ্টা এবং রেকর্ডেড ঘটনা না থাকায় কোন প্রকার মন্তব্য করা হয়নি। অন্যদিকে পাশের দেশ ভারতে ২ টি ও চীনে ৩টি ঘটনা রেকর্ড হয়েছে। আর এ সময় স্ট্রেইট অব মালাক্কা এন্ড সিংগাপুর-এ রেকর্ড ৮টি ও ইন্দোনেশিয়ায় ৭টি দস্যুতার ঘটনা ঘটেছে।

২০১৯ সালে মেরিটাইম ওয়ার্ল্ডে অত্যন্ত জনপ্রিয় গণমাধ্যম ‘লয়েডস লিস্ট’ প্রতি বছর তাদের ওয়েবসাইটে বিশ্বের সেরা বন্দরের তালিকা প্রকাশ করে থাকে । সম্প্রীতি ‘ওয়ান হানড্রেড পোর্টস ২০১৯’ শীর্ষক ’লয়েডস লিস্ট’ প্রকাশিত তালিকায় বিশ্বের সেরা ১০০ কনটেইনার হ্যান্ডলিংকারী বন্দরের মধ্যে চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরের অবস্থান ৬৪ তম। যা গত বছর ছিল ৭০ তম। ২০০৮ সালে ৯৫ তম অবস্থানে থাকা চট্টগ্রাম বন্দর নিজের অবস্থান দ্রুত উন্নত করছে।

ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম চিটাগং এর সভাপতি ও বিজিএমইএর সাবেক জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি এসএম আবু তৈয়ব বলেন, কোস্ট গার্ডের তৎপরতায় বন্দরের জলসীমায় চুরি ও দস্যুতার ঘটনা নেই। এতে বিশ্বে চট্টগ্রাম বন্দরের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হচ্ছে। বিশ্বে চট্টগ্রাম বন্দরের সুনাম যত বৃদ্ধি পাবে তত এ দেশে বৈদেশিক ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে। বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে। ব্যবসায়ীরা উপকৃত হবেন। যা দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক (নিরাপত্তা) মেজর মুহাম্মদ রেজাউল হক বলেন, বন্দরের জলসীমায় বাণিজ্যিক জাহাজের সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্ব বাংলাদেশ কোস্টগার্ড বাহিনী পালন করে থাকে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সহায়তায় কোস্টগার্ড বন্দরের জলসীমায় চুরি ও দস্যুতার ঘটনা শূন্যে নামিয়ে এনেছে। এতে বর্হিবিশ্বে চট্টগ্রাম বন্দরের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হচ্ছে।
কোস্টগার্ডের সফলতা : বন্দরের জলসীমায় চুরি ও দস্যুতার ঘটনা শূন্যে কিভাবে নেমে আসল জানতে চাইলে কোস্ট গার্ড পূর্ব জোনের স্টাফ অফিসার (অপারেশান্স) লে. কমান্ডার এম সাইফুল ইসলাম দৈনিক পূর্বকোণকে জানান, আইএসপিএস কোডের ধারা অনুযায়ী বহির্নোঙ্গরে আগমন ও অবস্থানকারী সকল বাণিজ্যিক জাহাজের সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্ব বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের উপর ন্যাস্ত। দেশের ভাবমূর্তি রক্ষায় চুরি/দস্যুতার ঘটনা রোধে আমরা কিছু কর্মকৌশল হাতে নেই। এতে সফলতাও আসে। লে. কমান্ডার এম সাইফুল ইসলাম আরো বলেন, বাণিজ্যিক জাহাজগুলোতে বিভিন্ন কাজে শিপিং এজেন্ট/শিপ শ্যান্ডল্যারদের যাওয়া-আসা এবং রাতে কর্ণফুলী নদী অথবা উপকূলীয় খালগুলো হতে যারা বহির্নোঙ্গরে যায় তাদের ওপর নজরদারী বাড়ানো হয়েছে। অসাধু ব্যবসায়ীদের অপতৎপরতা রোধে কোস্ট গার্ড বন্দর কর্তৃপক্ষের সাথে অত্যন্ত নিবিড় সম্পর্ক বজায় রেখে বাণিজ্যিক জাহাজ হতে অসৎ উদ্দেশ্যে পণ্য বিনিময় বন্ধ করা হয়েছে। জাহাজ নোঙ্গরে থাকাবস্থায় বন্দরের রেজিস্টার্ড ওয়াচম্যান নিয়োগ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে ও শিপিং এজেন্ট/শ্যান্ডলারদের বিভিন্ন সেবা প্রদানে কড়া নিয়ম নীতির ভিতরে নিয়ে আসা হয়েছে। এছাড়াও কোস্ট গার্ডের উদ্যোগে কর্ণফুলী থানার অন্তর্গত বদলপুরা ও শাহ মিরপুর এলাকার চিহ্নিত রশি চোরাকারবারীদের অনেককেই আইনের আওতায় আনা হয়েছে এবং স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণকারীদের পুনর্বাসন করা হয়েছে। আনোয়ারা থানাধীন গহিরা এলাকার যারা কাঠের বোটে করে সবজি,ফলমূল,গবাদিপশু ইত্যাদি ফেরি করে পণ্য বিনিময় করা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সর্বোপরি, কোস্ট গার্ডের টহল টিমের সংখ্যা বৃদ্ধি করে রাত্রি বেলায় কর্ণফুলী নদীর অভ্যন্তরে, মোহনায় এবং বহির্নোঙ্গরে সকল প্রকার চলাচলের উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ফলে এ সাফল্য অর্জন সম্ভব হয়েছে। আর এসব কারণে গত একবছরে বন্দরের জলসীমায় কোন চুরি বা দস্যুতার ঘটনা ঘটেনি। এটি কোস্ট গার্ড বাহিনীর একটি অসামান্য সাফল্য, যা অতীতে আর কখনো হয়নি এবং কোস্ট গার্ড বাহিনী পূর্ব জোন এ সাফল্যের ধারা অব্যাহত রাখতে বদ্ধপরিকর বলে জানান লে. কমান্ডার এম সাইফুল ইসলাম।

The Post Viewed By: 154 People

সম্পর্কিত পোস্ট