চট্টগ্রাম রবিবার, ২৭ নভেম্বর, ২০২২

২০ অক্টোবর, ২০২২ | ৮:০৬ অপরাহ্ণ

অনলাইন ডেস্ক

অনন্য এক শিক্ষাব্যবস্থার বাংলাদেশে তিন দশক

প্রাচীনকালের মুনি-ঋষিরা মানুষের জীবনকালকে তিন ভাগে ভাগ করেছিলেন। জীবনের প্রথম ভাগ পড়াশোনা; মধ্যভাগ সংসার করা আর শেষভাগ সন্ন্যাসব্রত পালন তথা ধর্ম আরাধনার।

এখনও সমাজে সুবিধাপ্রাপ্ত মানুষের জীবন সাধারণত এই তিন পর্বেই অতিবাহিত হয়। কিন্তু জগতে এমন সুবিধাবঞ্চিত মানুষও আছেন, যাঁদের সারাজীবন যায় ক্ষুধা আর দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে। শিশুকালেই নামতে হয় আয়-রোজগারে। আর এ ঘানি টানতে হয় জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। তাঁরা বঞ্চিত হন পড়ালেখা বা কোনো দক্ষতা অর্জন করে উন্নত জীবনযাপন থেকে।

আনুষ্ঠানিক পড়ালেখা করার অনেক কঠিন শর্ত থাকে। নির্দিষ্ট বয়সে, নির্দিষ্ট সময়ে একটি নির্দিষ্ট স্থানে উপস্থিত হতে হয় সে শিক্ষা লাভ করতে হলে। জীবনযুদ্ধে নেমে পড়া মানুষের পক্ষে সেটা সম্ভব হয় না। তা ছাড়া এ ব্যবস্থা বেশ ব্যয়বহুল। বিগত শতাব্দীতেই এ নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু হয়েছিল ইউরোপে। কী করে জীবনে বিপাকে পড়া ভাগ্যতাড়িত মানুষকে শিক্ষার অধিকার প্রদান করা যায়। চালু করা হয়েছিল ডাকযোগে বা পত্রিকার মাধ্যমে পড়ালেখা, নৈশ বিদ্যালয়।

রেডিও-টিভি আবিস্কার হলে ব্যবহার করা হয়েছিল সে মাধ্যম। পরে ইন্টারনেট ব্যবস্থা চালু হলে এ ব্যবস্থা আরও বিস্তৃত হয়। এ শিক্ষাব্যবস্থার মূল দর্শনটিকে বলা হয় উন্মুক্ত শিক্ষাদর্শন আর পড়ানোর পদ্ধতিকে বলা হয় দূরশিক্ষণ। মানে পড়ার জন্য যে কোনো বয়সের, যে কোনো মানুষকে, যে কোনো সময় উন্মুক্ত আর পড়তে পারবেন দূরে বসেই যোগাযোগের যে কোনো মাধ্যম ব্যবহার করে। সব বয়সের, সব শ্রেণির, বিশেষত সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণির মানুষের জন্য এ এক অনন্য মহৎ শিক্ষা পরিকল্পনা।

এ দর্শন ও ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয় লন্ডনে ১৯৫৯ সালে ‘দ্য ওপেন ইউনিভার্সিটি’ নামে। তারপর গড়ে উঠতে থাকে সারা দুনিয়াতেই। ভারতে ‘ইন্দিরা গান্ধী ন্যাশনাল ওপেন ইউনিভার্সিটি’; পাকিস্তানে ‘আল্লামা ইকবাল ওপেন ইউনিভার্সিটি’; ‘শ্রীলঙ্কা ওপেন ইউনিভার্সিটি’। এ ব্যবস্থার সুবিধা ও যৌক্তিকতা লক্ষ্য করে পৃথিবীর নামকরা সনাতন অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ও মুখোমুখির ব্যবস্থার সঙ্গে অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থা চালু করছিল। করোনা মহামারির সময়ে এ ব্যবস্থা হয়ে উঠেছিল একমাত্র শিক্ষাব্যবস্থা। করোনা-উত্তরকালেও এ পদ্ধতির সুবিধা হাতছাড়া করা হচ্ছে না। চালু রাখা হচ্ছে মিশ্র পদ্ধতির শিক্ষা।

স্বাধীনতা-উত্তরকালে বাংলাদেশে এ ব্যবস্থার শিক্ষা প্রথম চালু হয় ১৯৮৫ সালে বাইড নামে। সে ব্যবস্থাকেই আরও সংহত করে পরে ১৯৯২ সালের ২১ অক্টোবর প্রতিষ্ঠা করা হয় ‘বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়’। এ বছর বিশ্ববিদ্যালয়টি তার প্রতিষ্ঠার ৩০ বছর অতিক্রম করছে। এটি বর্তমানে একটি মেগা বিশ্ববিদ্যালয়। এর বর্তমান শিক্ষার্থী সংখ্যা পাঁচ লক্ষাধিক। এ শিক্ষাব্যবস্থায় ইতোমধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন ৩১ লক্ষাধিক মানুষ। তাঁদের মধ্যে যেমন রয়েছেন ক্ষদ্র পেশাজীবী, কারখানার শ্রমিক, দিনমজুর; তেমনি রয়েছেন সিনিয়র সচিব, সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। রয়েছেন শিল্পী, সাংবাদিক, কবি-সাহিত্যিক থেকে বারাক ওবামার স্টাফ ফটোগ্রাফার। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের মিডিয়া কেন্দ্রে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেই এ দেশে চালু হয়েছিল বেসরকারি টেলিভিশন। সাম্প্রতিক সাফ নারী ফুটবলের অধিনায়ক সাবিনা এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই পাস করেছেন এসএসসি, এইচএসসি। বর্তমানে ক্রীড়াচর্চার পাশাপাশি এ বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়াশোনা করছেন ডিগ্রি পর্যায়ে। বিশ্ববিদ্যালয়টি পরিবর্তন করে চলেছে বহু মানুষের জীবনমান।

উন্নত পৃথিবীর উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষাব্যবস্থাকে গ্রহণ করা নিয়ে তেমন কোনো সমস্যা না হলেও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে প্রথাগত শিক্ষাব্যবস্থায় অভ্যস্ত মানুষ এ ব্যবস্থাকে এখনও খানিকটা দ্বিধা ও সন্দেহের চোখে দেখেন। শিক্ষার মান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। বাউবিরও রয়েছে নিজস্ব কিছু সীমাবদ্ধতা। প্রতিষ্ঠানটি এখনও মূলত অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্থান ও লোকবল ভাড়া করে তাদের পরীক্ষা কার্যক্রম ও সম্পূরক টিউটোরিয়াল শিক্ষা পরিচালনা করে। এ ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ মান নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়।

বিশ্ববিদ্যালটি ইতোমধ্যে গাজীপুরের নিজস্ব ক্যাম্পাসে এ ব্যবস্থাকেও ধীরে ধীরে নিয়ে আসছে। মহাপরিকল্পনা নিয়েছে দেশের প্রতিটি প্রান্তে নিজস্ব শিক্ষা ব্যবস্থাপনার। গ্রহণ করছে প্রযুক্তির আধুনিকতম সুবিধাগুলো। শিগগিরই তারা কাটিয়ে উঠবে হয়তো তাদের চ্যালেঞ্জ। অনন্য ও মহৎ চিন্তা থেকে জন্ম নেওয়া সব বয়স, শ্রেণি ও মানুষের, বাংলাদেশের এ বিশ্ববিদ্যালয়টিকে ৩০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর শুভেচ্ছা।

শোয়াইব জিবরান: কবি, লেখক, শিক্ষাবিদ

 

পূর্বকোণ/সাফা/পারভেজ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট