চট্টগ্রাম রবিবার, ০৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৩

সর্বশেষ:

১৫ আগস্ট, ২০২২ | ১২:২১ অপরাহ্ণ

বিশ্বের ইতিহাসে একটি নিষ্ঠুরতম দিন

ড. অনুপম সেন

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে গণহত্যা শুরু হয়। ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীনতা পূর্ণতা পেল। বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে এলেন ১০ জানুয়ারি ১৯৭২। দেশে ফিরে তিনি পেলেন একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ। শত শত সমস্যায় জর্জরিত যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠন ও পুনর্বাসনে শূন্য থেকে দেশ গড়ার কাজে হাত দেন বঙ্গবন্ধু। তাঁর সরকারের প্রধান দায়িত্ব ছিল এককথায় যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পুনর্গঠন। হাজার হাজার ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। ভারত থেকে এককোটি লোককে দেশে এনে পুনর্বাসন করেন তিনি। দেশে যারা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছিল তাদেরও পুনর্বাসন করেন। দায়িত্ব নিয়েছিলেন আমাদের জননী, জায়া, কন্যা যাঁরা যুদ্ধে সম্ভ্রম হারিয়েছিলেন তাদেরও। জাতিরজনককে নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, একুশে পদকপ্রাপ্ত শিক্ষাবিদ ও সমাজবিজ্ঞানী ড. অনুপম সেন।

তিনি পূর্বকোণকে বলেন, পাকিস্তানিরা এদেশে পোড়ামাটিনীতি গ্রহণ করেছিল। সব ধ্বংস করে দিয়েছিল। আমরা ৩০ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে যে বাংলাদেশ পেলাম সেটা ছিল সম্পূর্ণভাবে বিধ্বস্ত। পাটশিল্প ছাড়া এদেশে কোন শিল্পই ছিল না। একটা কাপড় পর্যন্ত বিদেশ থেকে আনতে হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর অচল ছিল, কর্ণফলী নদীতে অনেক ডোবা জাহাজ ছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের সাহায্যে ১ বছর পর চট্টগ্রাম বন্দর আবার চালু করতে হয়েছে। সবকিছুই করলেন বঙ্গবন্ধু। শুধু তাই নয়, তিনি বাংলাদেশকে রাজনৈতিক কাঠামো দেয়ার জন্য মাত্র ১০ মাসে একটি অসাধারণ সংবিধান দিলেন। যেখানে সংবিধান তৈরি করতে পাকিস্তানের ৯ বছর লেগেছিল।

সমাজবিজ্ঞানী ড. অনুপম সেন বলেন, বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশকে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে নেয়ার জন্য একটি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা করেছিলেন। সেই পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় তিনি প্রথম থেকে কৃষি এবং শিক্ষাকে জোর দেন। তিনি ভারতের সঙ্গে সীমান্ত চুক্তি করেছেন। তিনি দেশকে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ করে এনেছেন। যেখানে ১৯৭৩-১৯৭৪ সালে শিল্পে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ছিল ৭ শতাংশেরও বেশি। শিল্প, কৃষি, সেবাসহ সবখাতে যখন বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে ঠিক তখনই (১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট) জাতিরজনক, দেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হল। শুধু বঙ্গবন্ধুকে নয়, তাঁর পত্নী, পুত্রবধূসহ পরিবারের ১৭ সদস্যকেও। পরে আত্মীয়-স্বজন মিলে মোট ২৬ জনকে হত্যা করা হল। শিশু রাসেলকেও পর্যন্ত ছাড় দেয়া হয়নি। বিশ্বের ইতিহাসে এটি একটি নিষ্ঠুরতম দিন। পৃথিবীতে এমন হত্যাকাণ্ডের কোনো নিদর্শন নেই।

একুশে পদকপ্রাপ্ত এই শিক্ষাবিদ বলেন, বঙ্গবন্ধুকে যখন হত্যা করা হয় তখন আমি কানাডায় ছিলাম। সেখানে আমি পিএইচডি করছিলাম। আমি কানাডার টিভিতে যখন শুনতে পেলাম বাংলাদেশে খুন হয়েছে এবং বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছে। এটি শুনার পর আমি ইউনির্ভাসিটিতে কোন ক্লাস না করে বাসায় চলে আসি। বাসায় এসে সারাদিন ছটফট করে কাটাই। সবকিছু তো মানুষকে মানিয়ে নিতে হয়। আমিও মানিয়ে নিয়েছিলাম। কিন্তু আমি জানি- সে সময় বাংলাদেশ প্রায় স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। ১৯৭৯ সালে যখন দেশে আসি তখনও কিন্তু বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ঢাকায় তখনও রাত ১২টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত কারফিউ চলত। আমি মনে করি বঙ্গবন্ধু যদি বেঁচে থাকতেন এখন বাংলাদেশ যে পর্যায়ে রয়েছে সেটা আজ থেকে ১৫ বছর আগে অর্জন করতো। কারণ বঙ্গবন্ধু একটা ভিশন, একটা দূরদৃষ্টি নিয়ে এগোচ্ছিলেন। তিনি সংবিধানে লিখেছেন এই দেশের মালিক এবং রাষ্ট্রের ক্ষমতার উৎস হল জনগণ। রাষ্ট্রতো সাধারণ বাঙালির ছিল না। বঙ্গবন্ধুই প্রথম বাঙালিকে রাষ্ট্রের মালিক করলেন। আসলেই তিনি ছিলেন গরিব মানুষের নেতা। সাক্ষাৎকার গ্রহণ: এহছানুল হক।

 

লেখক : একুশে পদকপ্রাপ্ত শিক্ষাবিদ

পূর্বকোণ/আর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট