চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ০৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২৩

১৫ আগস্ট, ২০২২ | ১১:৫৬ পূর্বাহ্ণ

বেদনার্ত হৃদয়ের স্মৃতিকথা

মো. রেজাউল করিম চৌধুরী

আগস্ট। বাঙালি জাতীয় জীবনে অত্যন্ত বেদনা বিদুর, অশ্রু ঝরানো, শোকাবহ মাস। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতি হারিয়েছে তার অমূল্য রতন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের নির্মমভাবে হত্যা করে বাঙালির কপালে কালিমা লেপন করে স্বার্থলোভী ও চাকুরিচ্যুত কতিপয় সেনা কর্মকর্তা।

১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর খন্দকার মোশতাক আহমেদ বঙ্গবন্ধুর খুনিদের রক্ষায় ইনডেমনিটি (দায়মুক্তি) অধ্যাদেশ জারি করে। ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমান এ অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করে। দীর্ঘ ২১ বছর নানাভাবে বঙ্গবন্ধুর খুনি ও স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তিকে পুনর্বাসন করা হয়েছে।

ক্ষমতায় এসে ১৯৯৬ সালের ১২ নভেম্বর সপ্তম জাতীয় সংসদে ইনডেমনিটি আইন বাতিল করে এ নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচারের পথ অবমুক্ত করতে সক্ষম হন। এবং স্বাভাবিক বিচারিক প্রক্রিয়ায় ১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর ১৫ জনকে বঙ্গবন্ধু ও তার সপরিবারের সদস্যদের হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড প্রদানের রায় ঘোষিত হয়। দীর্ঘ ৩৪ বছরের বহু বাধা বিপত্তি পেরিয়ে ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু হত্যার ৫ আসামির ফাঁসির রায় কার্যকর হয়।

১৯৭৫ সালের আগস্ট মাস। ‘বাংলাদেশ জাতীয় সাংস্কৃতিক আন্দোলন’ এর ব্যানারে চট্টগ্রামে সাংস্কৃতিক সম্মেলনের আয়োজন নিয়ে ব্যস্ততার মধ্যে ছিলাম। স্থানীয় মুসলিম হলে ১৭-১৯ আগস্ট তিন দিনব্যাপী এ সম্মেলন হবে ঠিক হল। তপন বৈদ্য ছিলেন এ সম্মেলন আয়োজক কমিটির আহ্বায়ক আর আমি ছিলাম যুগ্ম আহ্বায়ক। ১৪ আগস্ট আওয়ামী লীগ নেতা এম এ মান্নান ভাইয়ের বাসায় যাই, সম্মেলন প্রস্তুতির নানাদিক আলোচনা করি। তিনি সম্মেলনের খরচের জন্য ৫০০০ টাকা দেন। সম্মেলনের উদ্বোধক বঙ্গবন্ধু পুত্র শেখ কামাল যথাসময়ে উপস্থিত থেকে উদ্বোধনের আশ্বাস প্রদান করেন।

১৫ আগস্ট সকালে লেয়াকত নামের জাসদ সমর্থক ছাত্র আমাকে জানাল বঙ্গবন্ধুকে নাকি ভোর বেলায় হত্যা করা হয়েছে। পরে আরেক ছাত্রনেতা গোলাম মোহাম্মদও একই কথা বলল। আমি তাদের কথা কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।
আমরা দ্রুত মতিন বিল্ডিংয়ের ছাত্রলীগের অফিসে গেলাম। সেখানে ছাত্রলীগ নেতা সরফরাজ খান বাবুল, রফিকুল ইসলাম, আনোয়ারুল আজিম, শওকত হোসেন, মান্নান, ইসমাইল, কাশেম চিশ্তী, এম এ জাফর, শামসুজ্জামানসহ বিশ পঁচিশজন ছাত্রনেতাকে তৎক্ষণাৎ বিক্ষোভ মিছিল বের করি। এটি কেসি দে রোড, টিএন্ডটি অফিস, লালদিঘি হয়ে রেয়াজউদ্দিন বাজার আমতল, তিনপুলের মাথা হতে ঘুরে শহীদ মিনার হয়ে পুনারায় পার্টি অফিসে আসি। কোথাও কোন বাধা পাইনি। রাস্তায় তেমন কোন মানুষজন কিংবা পুলিশও ছিলনা। রেডিও স্টেশনে ঢুকে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে বক্তব্য রাখার সুযোগ চাইলাম। রেডিও কর্তৃপক্ষ রাজি হলেন না।

সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে অভয় মিত্র ঘাটের একটি ফিশিং বোটে আনোয়ারুল আজিম, গোলাম রাব্বানী, মো. সেলিম, শওকত হোসেন, রফিক, মনির, কাজী আবু তৈয়ব, মহিউদ্দিন রাশেদ, শামসুজ্জামান, জাফর, দেলোয়ার, মান্নানসহ আমরা ১৪ জন এস এম ইউসুফ ভাইয়ের (মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিব বাহিনীর জেলা প্রধান) সাথে বসলাম। এ বৈঠকের ঠিক পনের দিন পর আমরা নি মার্কেট মোড়, আগ্রাবাদ, কাজীর দেউড়িসহ চট্টগ্রামের বেশ কয়েকটি জায়গায় গ্রেনেড চার্জ করি।

এরপর ইউসুফ ভাইসহ কাজী আবু তৈয়ব ও আমি আমাদের নেতা মান্নান ভাইয়ের বাসায় যাই। শক্তি সংগ্রহে ভারতে যেতে মান্নান ভাইকে বুঝিয়ে বলি। মান্নান ভাই এতে রাজি হলেন না। কিন্তু ইউসুফ ভাই ঠিকই ভারতে চলে গেলেন। এদিকে কঠোর বিধি নিষেধের যাঁতাকলে পড়ে কোথাও জড়ো হওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ল। তখন নিউমার্কেটে নজরুলের শাহ আমান স্টোর হয়ে উঠল আমাদের যোগাযোগের অন্যতম ক্ষেত্র।

তাই শোকের মাসে সকল চক্রান্তকে পদদলিত করে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের ঝান্ডা উড়াই। মনে রাখতে হবে, বঙ্গবন্ধুর রক্তের কাছে আমরা ঋণী। আসুন জাতির জনকের স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণে শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করতে কাজ করে যাই।
সকলকে ধন্যবাদ। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু, জয়তু জননেত্রী শেখ হাসিনা।

লেখক : মেয়র, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন

 

পূর্বকোণ/আর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট