চট্টগ্রাম সোমবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২২

সর্বশেষ:

৯ আগস্ট, ২০২২ | ৩:৫৩ পূর্বাহ্ণ

শত্রুর সাথে আগামীর বসবাস

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর কোভিডকেই মানব সভ্যতার প্রতি সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে গণ্য করা যায়। এ পর্যন্ত কোভিড সংক্রমণ রেকর্ড করা হয়েছে প্রায় ৫৯ কোটি মানুষের, আর মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে ৬৪ লক্ষের উপর। এই সংখ্যা শুধু সরকারিভাবে রেকর্ডকৃত। অধিকাংশ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞই মনে করেন প্রকৃত সংক্রমণ ও মৃত্যু সংখ্যা তার চেয়েও অনেক বেশি। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে টেস্টের সংখ্যা অপ্রতুল হওয়াতে সংক্রমণের সঠিক সংখ্যা রেকর্ড করা সম্ভব হচ্ছে না। মৃত্যুর সংখ্যা রেকর্ডেও ক্ষেত্রবিশেষে শৈথিল্য দৃশ্যমান। সেই সাথে লং-কোভিড বা কোভিডের দীর্ঘমেয়াদী উপসর্গ ও স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন এমন মানুষ আছেন কোটি কোটি। সুতরাং, কোভিড বিশ্বসভ্যতার একটি চলমান বিপর্যয় এবং সমকালীন মানব জাতির সবচেয়ে বড় শত্রু।
বাস্তবতা হচ্ছে এই শত্রুটির সাথেই আমাদের আগামী বেশ কিছুদিন বসবাস করতে হবে। তাই এই সহাবস্থানের জন্য আমাদের এ পর্যন্ত প্রয়োগকৃত কৌশলগুলোর কার্যকারিতা পর্যালোচনা করে আমাদের আগামীর প্রস্তুতি নিতে হবে। কোভিড মোকাবেলায় এ পর্যন্ত মোটা দাগে আমরা তিনটি অস্ত্র ব্যবহার করেছি। সেগুলো হচ্ছে- শারীরিক দূরত্ব, ভ্যাক্সিন এবং ভাইরাসবিনাশী বা ভাইরাসরোধী ওষুধ। যখন ভ্যাক্সিন এবং ওষুধ কোনোটিই আমাদের নাগালের মধ্যে ছিল না তখন আমরা শারীরিক দূরত্ব দিয়ে লড়াই করেছি। তা নিশ্চিত করতে কঠোর লকডাউন দিয়েছি। এই অস্ত্রটি এখন আর নানা কারণে বাস্তবসম্মত নয়, এমনকি পশ্চিমা বিশ্বেও তা পরিত্যাগ করা হয়েছে। অন্যদিকে কোভিডের ভ্যাক্সিন কিন্তু সনাতন ভ্যাক্সিনের মতো সর্বাংশে কার্যকর নয়। সংক্রমণের হার, তীব্রতা এবং মৃত্যুসংখ্যা কমাতে ভ্যাক্সিনের কার্যকারিতা অনস্বীকার্য হলেও সংক্রমণ পুরোপুরি রোধ করা কিংবা মৃত্যু সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা প্রচলিত কোভিড ভ্যাক্সিনগুলোর পক্ষে সম্ভব হয়নি। সুতরাং, শারীরিক দূরত্বের মতো ভ্যাক্সিনও একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা, যতদিন কোভিড পৃথিবী থেকে বিদায় না নিচ্ছে কিংবা আমরা সর্বাংশে কার্যকর কোন ভ্যাক্সিন পাচ্ছি। আবার সর্বাংশে কার্যকর কোনো ভ্যাক্সিন ছাড়া কোভিড নির্মূলও প্রায় অসম্ভব। কোভিডরোধী বা বিনাশী ওষুধগুলোর ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হচ্ছে অপ্রতুল সরবরাহ এবং উচ্চমূল্য যা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তাই অপেক্ষাকৃত সুলভ ও সহজপ্রাপ্য ওষুধ বাজারে আসার আগে এবং ব্যাপকভিত্তিক সর্বাংশে কার্যকর ভ্যাক্সিন হাতে পাওয়ার আগে পর্যন্ত আমাদের আগামী দিনগুলোতে সভ্যতার এই শত্রুর সাথেই বসবাস করতে হবে।
গত কয়েক মাসে বিভিন্ন দেশে কোভিডের উপসর্গতীব্রতা এবং সংক্রমণের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছিল। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই উপরে উল্লিখিত অনুঘটকগুলো এ ব্যাপারে ভূমিকা রেখেছিল। বাংলাদেশেও এপ্রিলের শেষ থেকে জুন মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত রিপোর্টকৃত সংক্রমণ এবং মৃত্যুহার একেবারেই নগণ্য ছিল। কিন্তু ঠিক তখনই পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো আমরা একই ভুল পথে হেঁটেছি। আমরা বুস্টার ডোজ ভ্যাক্সিন নিতে ঔদাসীন্য দেখিয়েছি, শারীরিক দূরত্বের ধারণাকে একেবারেই বিসর্জন দিয়েছি। ফলে কোভিড সংক্রমণের হার আবার ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। সেই সাথে টেস্ট করানোর ঝামেলা ও অন্যান্য সামাজিক কারণে টেস্টের সংখ্যাও কমে এসেছে। এর মধ্যে ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে জ্বর, সর্দি, কাশি, গলাব্যথা। বাংলাদেশে শীতের সময় ছাড়া ঘরে ঘরে এমন উপসর্গ গণহারে সচরাচর দেখা যায় না। এই রোগীদের একটি বিরাট সংখ্যা যে কোভিডে আক্রান্ত তা বলাই বাহুল্য। শারীরিক দূরত্বে অনীহা এবং টেস্ট না করানোর কারণে অলীক নিরাপত্তাবোধে (false sense of security) তারা তাদের নিকটজনের মধ্যে এবং সেই পথ ধরে সমাজের মধ্যে কোভিড ছড়িয়ে দিচ্ছেন জ্যামিতিক হারে। অনেক ভ্যাক্সিনপ্রাপ্তদের মধ্যে উপসর্গবিহীন সংক্রমণের কারণে নিজেদের অজান্তেও তাদের মাধ্যমে এই রোগ বিস্তার লাভ করছে।
একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে জনজীবন ও অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে হলে এখন আর লকডাউন দেয়া বাস্তবসম্মত নয়। বিকল্প পথেই আমাদের কোভিড নিয়ন্ত্রণের কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। প্রথমতঃ যে মাস্ককে আমরা পরিত্যাগ করেছি তাকে নতুনভাবে আলিঙ্গন করতে হবে। মাস্কের মাধ্যমে সামাজিক নৈকট্য বজায় রেখেও সংস্পর্শের দূরত্ব বজায় রাখা অনেকাংশেই সম্ভব। প্রয়োজনে সরকারকে উদ্যোগী হয়ে ১২ বছরের ঊর্ধ্বদের জন্য বিনামূল্যে পুনঃব্যবহারযোগ্য মাস্ক সরবরাহ করতে হবে এবং তা ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করতে হবে। সেই সাথে গণমাধ্যমে মাস্ক ব্যবহারের স্বপক্ষে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে। এই প্রচারণায় পোস্টার ও বিলবোর্ড কাজে লাগাতে হবে। উল্লেখ্য, সংক্রমণ বাড়ার সাথে সাথে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে কর্মক্ষেত্র, গণপরিবহন ও জনসমাগমের স্থানগুলোতে মাস্কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার ফিরে আসছে।
দ্বিতীয়তঃ ব্যাপক জনগোষ্ঠীকে বুস্টার ডোজ ভ্যাক্সিনের আওতায় নিয়ে আসার জন্য সরকারের সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। আমাদের দেশে বুস্টার ডোজ প্রাপ্তির হার এখনো খুবই কম। অথচ এ পর্যন্ত লব্ধ তথ্য-উপাত্তে জানা যায় যে বুস্টার ডোজ ভ্যাক্সিন রোগের সংক্রমণ কমাতে প্রথম দুই ডোজের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর। তাই সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীকে যেকোনো মূল্যে বুস্টার ডোজের আওতায় নিয়ে আসতে হবে।
তৃতীয়তঃ নানা ধরণের র‌্যাপিড এন্টিজেন টেস্ট (র‌্যাট) অনুমোদন ও বাজারজাতকরণের প্রতিবন্ধকতা দূর করে তা সহজলভ্য করার ব্যবস্থা করতে হবে এবং জনসাধারণকে তা ব্যবহারে উৎসাহিত করতে হবে। র‌্যাট সহজলভ্য হলে সবাই বাসায় বসে টেস্ট করতে পারবে বলে নিজেকে এবং নিজের পরিবার পরিজনের স্বাস্থ্যনিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে হলেও আরও অধিক সংখ্যায় টেস্ট করাবেন এবং পজিটিভ হলে অধিকাংশই স্বেচ্ছা-অন্তরণে (self isolation) থাকবেন। তাকে টেস্ট সেন্টারে গিয়ে পিসিআর টেস্ট করানোর ঝামেলার মধ্য দিয়ে যেতে হবে না। সংক্রমণ রোধে তা কার্যকর ভূমিকা রাখবে। সেই সাথে কর্মক্ষেত্রে কোভিড উপসর্গে আক্রান্ত সবাইকে র‌্যাট নেগেটিভের ছাড়পত্র নিয়ে কাজে আসা নিশ্চিত করতে হবে। র‌্যাট পিসিআরের মতো এত বেশি নির্ভরযোগ্য না হলেও পশ্চিমের দেশগুলোতে এখন র‌্যাটই বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। এর মাধ্যমে টেস্টের সংখ্যা ব্যাপকহারে বেড়ে যাওয়াতে রোগ নির্ণয় বেশি হচ্ছে, মানুষ স্বেচ্ছা-অন্তরণে তাড়াতাড়ি যেতে পারছে এবং সংক্রমণের গতি কমানো সম্ভব হচ্ছে। সেই অভিজ্ঞতা আমাদের কাজে লাগাতে হবে।
আশার কথা এই যে কোভিড সংক্রমণের উচ্চহার অব্যাহত থাকলেও রোগের তীব্রতা ও মৃত্যুহার অনেকাংশেই কমে এসেছে। মাস্ক ব্যবহারের মাধ্যমে সামাজিক নৈকট্যেও শারীরিক দূরত্ব বজায়ে সচেষ্ট হওয়া, ভ্যাক্সিনের বহুলাংশে কার্যকারিতা এবং ক্ষেত্রবিশেষে ওষুধের সফল ব্যবহার- এসবই এক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। ডেল্টার পর ওমিক্রনসহ কোভিডের যে সব নতুন ভ্যারিয়েন্ট ও সাব-ভ্যারিয়েন্টের উদ্ভব হয়েছে সেগুলো উচ্চ সংক্রমণশীল হলেও রোগের তীব্রতায় অপেক্ষাকৃত কম ভয়াবহ। আশা করা যাচ্ছে যে ভাইরাসের চরিত্র পরিবর্তনের এই ধারা অব্যাহত থাকলে, ভ্যাক্সিন গ্রহণের হার বৃদ্ধি পেলে ও তার গুণগত উৎকর্ষ হলে সেই সাথে কার্যকর ওষুধ সহজপ্রাপ্য হলে এবং র‌্যাপিড এন্টিজেন টেস্টের মাধ্যমে ঘরে ঘরে ব্যাপক সংখ্যায় টেস্ট করিয়ে রোগীদের বেশি সংখ্যায় অন্তরণে (isolation) উৎসাহিত করতে পারলে কোভিড বৈশ্বিক মহামারী থেকে ব্যাপক বিরাজমান একটি সহনীয় পর্যায়ের রোগে রূপান্তরিত হবে। তবে এটি স্থানীয় পর্যায়ের রোগে রূপান্তরিত হতে (এণ্ডেমিক) কিংবা নির্মূল হতে আরো অনেক দিনের যুদ্ধ বাকি। নির্মূলের বিষয়টি সুদূর পরাহত হলেও মাস্ক, বুস্টার ডোজ ভ্যাক্সিন এবং র‌্যাটের বহুল ব্যবহারের মাধ্যমে এণ্ডেমিকের দিকে কোভিডের গতিপথ পরিবর্তনই এই সময়ের সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ। আমাদের আপাততঃ সেই লক্ষ্যেই এগুতে হবে।

লেখক : মেলবোর্ন প্রবাসী ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান, কবি, গল্পকার, প্রাবন্ধিক ও সমাজকর্মী।
এডজাঙ্কট ফ্যাকাল্টি, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্সেস, ঢাকা।
দৈনিক পূর্বকোণের নিয়মিত লেখক।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট