চট্টগ্রাম বুধবার, ০৬ জুলাই, ২০২২

সর্বশেষ:

২০ মে, ২০২২ | ৫:৪৭ পূর্বাহ্ণ

আনন্দ বেদনার সহভাগ

আনন্দ আর বেদনা দু’টি বিমূর্ত উপলব্ধি। একে অপরের পরিপূরক। একের উপস্থিতির কারণেই অন্যটিকে উপলব্ধি করা সহজ হয়। নিরবচ্ছিন্ন আনন্দ কিংবা বেদনা খুব কম মানুষের জীবনেই ঘটে। তাকে পালাক্রমে এই দুই অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়ে যেতে হয়। আনন্দের সময়ে বেদনার কথা ভাবার তেমন অবকাশ না থাকলে বেদনার দিনগুলোতে মানুষ সহজেই আনন্দের দিনগুলোর কথা ভেবে স্মৃতিকাতর হয় কিংবা আসন্ন আনন্দের সম্ভাবনায় কিংবা স্বপ্নে বেদনার কষ্ট লাঘব করে। আনন্দ বেদনার এই পর্যায়ক্রমিক চক্রটি সৃষ্টির আদি থেকে মানব জীবনের অমোঘ অনুষঙ্গ হিসেবে চলে এসেছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, মানুষ কি তার আনন্দ বেদনার অনুভূতিগুলো নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে বেশি তৃপ্ত হয় বা স্বস্তি পায়, নাকি তা অন্যদের সাথে সহভাগ (শেয়ার) করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে? মনে করুন, আপনার সন্তান পরীক্ষায় ভালো ফল করেছে কিংবা আপনি খুব উঁচু পদে একটি চাকরি পেয়েছেন। আপনি নিশ্চয়ই এই খুশির খবরটি যত দ্রুত সম্ভব ফোন করে আপনার বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয় স্বজনকে জানাবেন কেন? প্রধান কারণ, আপনার আনন্দের সংবাদটি তাদের সাথে সহভাগ করলে আপনার আনন্দের মাত্রা আরো বেড়ে যাবে। তারা যে আপনার সুসংবাদে খুশি হবেন তার জন্যও আপনার আনন্দে নতুন মাত্রা যোগ হবে। তবে কারো কারো ক্ষেত্রে একটি নেতিবাচক কারণও কাজ করে, তা হচ্ছে প্রদর্শনকামিতা। অনেকে নিজের সুসংবাদটি দ্রুত অন্যদের কাছে পৌঁছে দেয়ার চেষ্টা করেন তাদের কাছে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শনের জন্য। তাতেও কিন্তু একই উদ্দেশ্যই সাধিত হয়। অর্থাৎ, নিজের আনন্দ বহুগুণে বড়ে যায়।
বেদনা কারো সাথে সহভাগ করে নেয়ার ফলাফল তার উল্টো। তা হচ্ছে, প্রভাব কমে যাওয়া। মানুষ তার বেদনার ভার একা সইতে পারে না বলেই তা প্রিয়জন এবং কাছের মানুষদের সাথে ভাগ করে নেয়। যখন কারো নিকটজন কেউ মারা যান কিংবা অন্য কোন দুঃসংবাদের মুখোমুখি হন তখন তিনি প্রিয়জনদের সহানুভূতি কিংবা সহমর্মিতা পাওয়ার জন্য তা তাদের সাথে শেয়ার করেন। এই শেয়ার করার মাধ্যমে তার কষ্ট কিছুটা লাঘব হয়। এই প্রক্রিয়াকে ইংরেজিতে ‘ভ্যান্টিলেশন’ বলে। এতে নিজেকে উন্মোচন করে অন্তর্গত কষ্ট বোধকে বাইরে বের করে দেয়া হয়। বিষণœতা (ডিপ্রেশন) ও অন্যান্য মানসিক রোগে কাউন্সেলিং এই বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করেই করা হয়। এখানে সহানুভূতি (সিম্প্যাথি) এবং সহমর্মিতা (এম্প্যাথি)’র পার্থক্য একটু ভালোভাবে খেয়াল করতে হবে। যিনি মানসিক বেদনার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন তিনি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রত্যাশা করেন সহমর্মিতা, সহানুভূতি নয়। সহমর্মিতা হচ্ছে তার সমস্যা কিংবা বেদনার বিষয়টি অন্য কেউ উপলব্ধি করুক, বেদনাক্রান্ত ব্যক্তির অবস্থানে দাঁড়িয়ে পারিপার্শ্বিকতাকে অনুভব করুক। আর সহানুভূতি হচ্ছে কেউ তার বেদনায় কষ্টের অনুভূতি প্রকাশ করা এবং সমবেদনা জানানো। তাতে কোন ক্ষতি নেই। কিন্তু বেদনার কষ্ট লাঘবের জন্য সবচেয়ে বড় প্রয়োজন সহমর্মিতা এবং নৈর্ব্যক্তিকভাবে অন্যের বেদনা নিজে উপলব্ধি করা। সাধারণের জন্য এর ব্যবহারিক প্রয়োগ অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে এবং অনেক সময়েই তা সহমর্মিতার সীমানা অতিক্রম করে সহানুভূতিতে রূপ নেয়। তাতেও কিন্তু বেদনায় ভারাক্রান্ত ব্যক্তির বেদনার ভার অনেকটাই লাঘব হয়। এই যে তিনি তার কষ্টের বিষয়টি অন্যকে জানাতে পেরেছেন বা বোঝাতে পেরেছেন তাই তার বেদনা লাঘবের ধন্বন্তরি হিসেবে কাজ করে। যারা পেশাজীবী ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট তারা অবশ্য এই শোনার কাজটি করেন নৈর্ব্যক্তিকভাবে, নিজেদের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে। তিনি বেদনাক্রান্ত ব্যক্তির কষ্ট উপলব্ধি করেন বটে, কিন্তু নিজের আবেগ তাতে সম্পৃক্ত করেন না। সেটি ভিন্ন আলোচনার বিষয়।
সাধারণ মানুষ অন্যের আনন্দ বেদনাকে তেমন নৈর্ব্যক্তিকভাবে নিতে পারে না। তারা প্রতিক্রিয়ায় অনেক সময় নিজেদের আবেগ বা অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ করে ফেলেন। সেটাই স্বাভাবিক। তাতে দোষের কিছু নেই। তাতে বরং আনন্দ-বেদনার সহভাগ করার যে সুফল তার সাথে সামাজিক সম্প্রীতিরও ব্যপ্তি ঘটে। আনন্দ শেয়ার করলে বাড়ে আর বেদনা শেয়ার করলে কমে – এই বাস্তব পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতেই সহভাগের দর্শনটি গড়ে উঠেছে। কিছু কিছু অতি নিভৃতচারী মানুষ ছাড়া নিজের আনন্দ বাড়াতে চায় না কিংবা কষ্ট কমাতে চায় না এমন দৃষ্টান্ত বিরল। কিন্তু যাদের সাথে আপনি এই অনুভূতিগুলো শেয়ার করতে চান তাদের নির্বাচনের ব্যাপারে আপনাকে যতœশীল হতে হবে। এমন অনেকে থাকতে পারে যে আপনার আনন্দে হিংসা করবে বা অমঙ্গল কামনা করবে। তার সাথে আনন্দের বিষয়টি শেয়ার করলে খুব বেশি ক্ষতি না হলেও তা হবে সময় ও অনুভূতির অপচয়। পক্ষান্তরে আপনার কষ্টের কথা যদি এমন কারো সাথে শেয়ার করেন যে আপনার কষ্টে প্রচ্ছন্নে হলেও আনন্দিত হবে কিংবা আপনার কষ্টের সুযোগ নিতে চাইবে কিংবা সহমর্মী না হয়ে নির্বিকার থাকবে তার সাথে শেয়ার করাও আপনার মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, সময়ের অপচয় তো বটেই।
সঠিক ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের সাথে আপনার আনন্দ-বেদনার অনুভূতিগুলো সহভাগ করতে পারলে আনন্দ যেমন বাড়াতে পারেন, কষ্টের ভারও অনেকটাই লাঘব করতে পারেন। তবে সে ধরনের মানুষ কিংবা মানুষগুলোকে নির্বাচন করতে হবে সাবধানে। যে কারো কাছে নিজেকে উন্মোচন করে কেউ তার বা তাদের করুণা কিংবা উপহাসের পাত্র হতে চাইবেন না। প্রত্যেকের চারপাশেই কিছু সঠিক মানুষ আছেন যারা তার আনন্দ বেদনা ভাগ করে নেয়াকে যথাযথভাবে ধারণ করতে পারবেন। তেমন মানুষের বা মানুষদের কাছে নিজেকে উন্মোচন করুন। তার সাথে হুল্লোড়ে মেতে উঠুন, তার বুকে কিংবা কাঁধে দু’ এক ফোঁটা অশ্রুও ঝরাতে পারেন প্রয়োজনে। শেয়ার করতে পারা একটি আশীর্বাদ। সেই অঞ্জলী দু’ হাতে গ্রহণ করুন। যারা তা করতে পারেন না তারা যেমন আনন্দে ততোটা উদ্বেলিত হতে পারেন না, তেমনি বেদনায়ও একাকী গুমরে মরেন।

লেখকঃ আহমেদ শরীফ শুভ, অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন প্রবাসী ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান, কবি, গল্পকার, প্রাবন্ধিক ও সমাজকর্মী।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট