চট্টগ্রাম সোমবার, ০১ মার্চ, ২০২১

সর্বশেষ:

২২ জুলাই, ২০১৯ | ১:৫২ পূর্বাহ্ণ

পূর্বকোণ ডেস্ক

আরও দুজন নিহত, আহত ১৯

কী কারণে ঘটছে গণপিটুনির ঘটনা?

বাংলাদেশের ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে শনিবার তিনজন নিহত আর অন্তত পাঁচজন আহত হয়েছেন। হতাহতদের মধ্যে চারজনই নারী। গতকালও নিহত হয়েছেন আরও দু’জন। গতকাল রবিবার ঢাকার সাভার ও কেরানীগঞ্জে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন দুজন। লালমনিরহাটে তিনজন মানসিক প্রতিবন্ধী হয়েছেন গণপিটুনির শিকার। পাবনায় আহত হয়েছেন তিনজন। কুমিল্লায় এক নারীসহ চারজন হয়েছেন গণপিটুনির শিকার। নওগাঁর মান্দায় ছেলেধরা সন্দেহে ছয় জেলেকে পিটিয়েছে স্থানীয়রা। রাজশাহী নগরীতে একটি স্কুলের সামনে গণপিটুনির শিকার হয়েছেন একটি চিপস কোম্পানির তিন কর্মী। নওগাঁয় ছেলেধরা সন্দেহে ছয়জনকে গণপিটুনি দেয় উত্তেজিত জনতা। তাদেরকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়য়েছে। গত কয়য়েকদিনে দেশটিতে ছেলেধরা সন্দেহে এমন বেশ কয়য়েকটি গণপিটুনির খবর সংবাদের শিরোনামে উঠে আসে। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, যারা নিহত হয়য়েছেন, তাদের কেউ কেউ ওই এলাকায় অনেক দিন ধরে বসবাস করতেন। কয়েকজন মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেন। কিন্তু অভিভাবকদের সন্দেহ হওয়ায়, তাদেরও বেধড়ক পেটানো হয় বলে জানিয়েছে স্থানীয় পুলিশ। গত শনিবার এক নারী তার বাচ্চার ভর্তির তথ্য জানতে স্কুলে এসে ছেলেধরা সন্দেহে জনতার পিটুনিতে নিহত হন।
কিন্তু হঠাৎ করে দেশব্যাপী এই গণপিটুনির ঘটনা কেন ঘটছে। মানুষের এতো অসন্তোষের কারণ কি?
মনোরোগবিদ মেহতাব খানম এই গণপিটুনির মানসিক প্রবণতাকে মব সাইকোলজি হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, যখন একটি সমাজে নির্দিষ্ট কোন বিষয় নিয়ে আতঙ্ক বা নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয় তখন তারা এক ধরণের মানসিক অবসাদে ভোগে। সেই থেকেই মানুষের মধ্যে এ ধরণের সহিংসতা দেখা দেয়। তিনি বলেন, “মানুষ ইদানীং ছেলেধরার অনেক খবর পড়ছে, দেখছে। তো এই বিষয়টা তার মধ্যে একধরণের নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করছে। এ ব্যাপারে যখন সে কোন সহায়তা পাচ্ছে না তখন তার মধ্যে মানসিক অবসাদ তৈরি হয়। তখন মানুষ পেটাতে দেখলে সে তার ওই বেসিক ধারণা থেকে ক্রোধ বা রাগ ঝাড়তে নিজেও সহিংস হয়ে ওঠে।” মব সাইকোলজির বৈশিষ্ট্য হল, যারা গণপিটুনি দেয়, তাদের উচিত অনুচিত বোঝার মতো বিবেক কাজ করেনা। কেউ সত্যতা যাচাই-এর চেষ্টা করে না। তারা জানতেও চায় না কি কারণে মারামারি হচ্ছে। তারা তাৎক্ষণিক সেখানে অংশ নিয়ে তাদের ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়।
বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে পরিস্থিতি সহিংস হয়ে উঠছে বলে মনে করেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা। অপরাধ বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে এই গণপিটুনির পরিস্থিতিকে তিনটি উপাদানে ব্যাখ্যা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়য়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের শিক্ষক খন্দকার ফারহানা রহমান। সেগুলো হল পুলিশ, আদালত এবং কারাগার। ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেমের এই তিনটি উপাদান সমাজে অনুপস্থিতিকে এমন সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি রহমান বলেন, “বাংলাদেশে কয়য়েক বছর আগেও ডাকাত সন্দেহে অনেক মানুষকে পিটিয়য়ে মেরে ফেলার ঘটনা ঘটেছে। কারণ দেশের বিচার ব্যবস্থার ওপরে মানুষের আস্থা নেই। তারা মনে করে এই লোকটাকে ছেড়ে দিলে পরে তাকে আর আইনের আওতায় এসে সাজা দেয়া সম্ভব হবে না। এজন্য তারা আইন হাতে তুলে নিচ্ছে। দেখা গেছে যে পুলিশ অপরাধীদের আটক করলেও আদালত তাদের খালাস দিয়য়ে দিচ্ছে বা জামিন মঞ্জুর করছে। আবার আদালত তাদের দোষী সাব্যস্ত করতে পারলেও পুলিশ তাদের আদালতের সামনে আনতে পারছে না।”
এর পেছনে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য, মানসিক অস্থিরতা এবং মাদকাসক্তিসহ নানা কারণ জড়িত বলে তিনি উল্লেখ করেন। “যখন কোন দেশ ট্রান্সফর্মেশনের দিকে যায়, অর্থাৎ বিশ্বায়ন, নগরায়ন, শিল্পায়ন, প্রযুক্তিগত উন্নয়নের দিকে ধাবিত হয়, তখন এই পরিবর্তনের সাথে নৈতিক মূল্যবোধগুলোর দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য এবং বিচ্ছিন্নতা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়। এখন আর পারিবারিক বন্ধন আগের মতো নেই। এজন্য তার যে মোটিভেশন দরকার সেটা কোথাও সে পাচ্ছেনা। বিকল্প না থাকায় পরিস্থিতি সমাজের প্রতিটি শ্রেণীর মানুষ হতাশায় ভুগছে, অস্থিতিশীল হয়য়ে উঠেছে। যার কারণে ঘটছে একের পর এক সহিংসতার ঘটনা।”
আরও দুজন নিহত, আহত ১৯ :
ছেলেধরা গুজবে গণপিটুনির ঘটনায় ঢাকার সাভার ও কেরানীগঞ্জে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন দুজন। লালমনিরহাটে মানসিক প্রতিবন্ধী তিনজন হয়েছেন গণপিটুনির শিকার। পাবনায় আহত হয়েছেন তিনজন। কুমিল্লায় এক নারীসহ চারজন হয়েছেন গণপিটুনির শিকার। নওগাঁর মান্দায় ছেলেধরা সন্দেহে ছয় জেলেকে পিটিয়েছে স্থানীয়রা। রাজশাহী নগরীতে একটি স্কুলের সামনে গণপিটুনির শিকার হয়েছেন একটি চিপস কোম্পানির তিন কর্মী।
পদ্মা সেতু নির্মাণ কাজে ‘মানুষের মাথা লাগবে’ বলে সম্প্রতি ফেসবুকে গুজব ছড়ানো হয়, যাতে বিভ্রান্ত না হতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছিল সরকার। গুজব ছড়ানোর অভিযোগে বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়। এরমধ্যে গত বৃহস্পতিবার নেত্রকোণা শহরে এক যুবকের ব্যাগ তল্লাশি করে ‘শিশুর মাথা’ পাওয়ার পর তাকে পিটিয়ে হত্যা করে এলাকাবাসী। তারপর দেশের বিভিন্ন স্থানে ছেলেধরা সন্দেহে দলবেঁধে আক্রমণের ঘটনা ঘটতে থাকে। শনিবার ঢাকার বাড্ডাসহ বিভিন্ন জেলায় অন্তত তিনজনকে পিটিয়ে হত্যার পর গতকাল রবিবার দুজনের মৃত্যু এবং আরও ১৯ জন আহত হয়েছেন। সূত্র : বিবিসি বাংলা

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 698 People

সম্পর্কিত পোস্ট