চট্টগ্রাম শুক্রবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২১

৮ মার্চ, ২০২১ | ২:০০ পূর্বাহ্ণ

মরিয়ম জাহান মুন্নী

আজ বিশ্ব নারী দিবস: করোনা হেরেছে ওদের মমতায়

কল পেয়ে ১০ মিনিটের মধ্যে ছুটে যাই বহদ্দারহাট এলাকার একটি ভবনে। সেই ভবনের একটি ফ্ল্যাটে প্রায় ৭০ ঊর্ধ্ব বয়সের এক দম্পতি। খুবই মুমূর্ষু অবস্থায় ঘরের মধ্যে আছেন। দুইজনই প্রচণ্ড শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন। পাশের বাসার লোকজন তাদের এমন অবস্থা দেখে আমাদের কল করে বললেই আমরা ছুটে যাই। প্রতিবেশী থেকেই জানতে পারি- এ দম্পতির ছেলে ও ছেলের বউ বৃদ্ধ বাবা-মাকে রেখে কিছু বাজার ও ওষুধ কিনে দিয়ে পাশের বাসার লোকদের কাছে আরো কিছু টাকা দিয়ে তাদের সন্তানদের নিয়ে গ্রামে চলে যায়। পাঁচদিন পার হলেও তারা আসেনি। এদিকে তাদের অবস্থা খুবই খারাপ হতে থাকে। এমনই করুণ অবস্থায় আমরা তাদের নিয়ে মা ও শিশু হাসপাতালে ভর্তি করাই। তারপর ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠেন তারা। করোনাকালের এ করুণ কাহিনী বর্ণনা করেন ফাহমিনা আক্তার নিঝুম।

 

বৈশ্বিক মহামারী করোনাভাইরাস বাংলাদেশেও তাণ্ডব চালিয়েছিল। এমন সময় মানবতার হাত বাড়িয়েছিল অনেকগুলো সামাজিক সংগঠন। ঠিক সেই সময় সামাজিক সংগঠন বিজয়কেতনের পাঁচজন নারী জীবনের মায়া ত্যাগ করে সম্মুখযুদ্ধে নেমে পড়েন অসহায় ও করোনা আক্রান্ত মানুষের পাশে। এ পাঁচ নারী এপ্রিল মাস থেকে টানা পাঁচমাস ঘরে ঘরে গিয়ে করোনা রোগীদের সেবা দিয়েছেন। তাদের ১০ জনের টিমের বাকি পাঁচজন পুরুষ সদস্য। এ সময় যারা শ্বাস নিতে পারছেন না তাদের কাছে অক্সিজেন ও ওষুধ নিয়ে ছুটে যান তারা। সহায়তা করেছেন দিনমজুর, শ্রমিক, তৃতীয় লিঙ্গ, পথশিশু ও গরিব মানুষদের। তারা দেখিয়ে দিয়েছেন নারীরা এখন আর দুর্বল নয়, ঘরে বন্দী হয়ে জীবন কাটায় না। করোনাকালে চট্টগ্রামের এ পাঁচ নারী পুরুষদের মত সমানভাবে ঘরে-বাইরে সহযোগিতা করেছেন মানুষকে।

 

আজ বিশ্ব নারী দিবস। এবারে নারী দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘করোনাকালে নারী নেতৃত্ব গড়বে নতুন সমতার বিশ্ব’।

 

সাক্ষাতে কথা হয় বিজয়কেতনের চার নারীর সাথে। এসময় তারা জানান করোনাকালে তাদের অভিজ্ঞতার কথা। ব্যক্তিগত জীবনে তারা কেউ চাকুরিজীবী ও কেউ শিক্ষার্থী।

 

পূর্বকোণকে বিজয়কেতনের সদস্য শাহীন আকতার বলেন, আমরা সশরীরে উপস্থিত থাকলেও সহযোগিতা করেছেন শুলকবহর ওয়ার্ডেও কাউন্সিলর মোরশেদ আলম। তিনি অক্সিজেন, এম্বুলেন্স, খাবার, ওষুধসহ সকল কিছুর ব্যবস্থা করেছেন। এছাড়া বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা করোনাকালে তাদের রেশন আমাদের দিয়েছেন অসহায় মানুষদের মুখে তুলে দিতে। এসময় আড়াই হাজার মানুষকে সহায়তা করেছি। ১ শ’ জন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষকে শুকনো খাবার দিয়েছি। প্রতিদিন দুই হাজার মানুষের ঘরে ইফতার পৌঁছে দিয়েছি।

 

বিজয়কেতনের আরেক সদস্য আনিকা তাসনিম বলেন, গরিবদের কম-বেশি সবাই সহযোগিতা করেছে। কিন্তু মধ্যবিত্তদের কেউ কিছু দেয়নি। তারা লজ্জায় কারো কাছে মুখ ফুটে চাইতেও পারেননি। আমরা ফেসবুকের মাধ্যমে একটা পেজ খুলেছিলাম। সেখানে পরিচয় গোপন রেখে ৮৭০টা মধ্যবিত্ত পরিবারকে শুকনো খাবার দিয়েছি। প্রতিদিন ৮শ’ পথশিশু, ৩শ’ রিক্সাচালক, ১শ’ নির্মাণ শ্রমিক ও ৩৩০ জন ভিক্ষুককে রান্না করা খাবার দিয়েছি। ঈদের সময় কিছু পরিবারে মিষ্টি জাতীয় খাবারও পৌঁছে দিয়েছি। তবে খুশির বিষয় হচ্ছে আমাদের তত্ত্বাবধানে থাকা কোনো নারী মারা যাননি।

 

অপর সদস্য শারাবান তাহুরা কুমকুম বলেন, আমরা এমন কিছু পরিবার দেখেছি যা দেখে নিজেরাই কেঁদেছি। আবার কিছু পরিবার দেখে কষ্টের মধ্যে আনন্দও পেয়েছি। এ কাজে এসেছি মানবতার টানে। প্রথম দিকে পরিবার বাধা দিয়েছিল। তখন তাদের বুঝিয়ে কাজে আসি জীবনের মায়া ছেড়ে। এমন পরিস্থিতিতে ঘরে বসে থাকতে পারিনি। শুধু মনে হয়েছে এ অসময়ে মানুষের পাশে দাঁড়াতে চাই।

 

পূর্বকোণ/মামুন/পারভেজ

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 328 People

সম্পর্কিত পোস্ট