চট্টগ্রাম শনিবার, ২৩ জানুয়ারি, ২০২১

৩১ ডিসেম্বর, ২০২০ | ১:৩০ অপরাহ্ণ

মোস্তফা মোহাম্মদ এমরান 

ফিরে দেখা ২০২০: করোনার ছোবলে ভার্চুয়াল কোর্টে বিচার কাজ

তথ্যপ্রযুক্তির বদৌলতে ভার্চুয়ালি গ্লোবাল ভিলেজ হয়ে ওঠা বিশ্বকে বাস্তবিক দুনিয়ায় এক দেশ থেকে অন্যদেশকে ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে দেয় কোভিড-১৯। ‘করোনা’ নামক এ ভাইরাস তৈরি করে মানুষের সাথে মানুষের মানুষের বিশাল দূরত্ব। ২০২০ সর্বত্র করোনায় জর্জরিত এক দুঃসহ বছর। ২০২০ সালে বৈশ্বিক অর্থনীতির চাকাকে স্থবির করে দেয় এ মহামারী।

রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, শিক্ষাসহ সর্বত্র ছোবল হানে করোনা। আদালতের কার্যক্রমও করোনার ছোবলে থমকে পড়ে। কিন্তু  সংবিধানমতে ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার থেকে কাউকে বঞ্চিত করা যায় না। কেন না বিচার স্থবির হয়ে পড়লে সমাজে শুরু হয় অরাজকতা তাই যে কোনমূল্যে আদালতকে সচল রাখার পদক্ষেপ হিসেবে দেশে প্রথম ভার্চুয়াল কার্যক্রমের সূচনা ঘটে বছরটিতে।

বিজ্ঞাপন

সংসদ অধিবেশন না থাকায় এ লক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি এডভোকেট আবদুল হামিদ “আদালত কর্তৃক তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার অধ্যাদেশ -২০২০” জারি করেন। এরপর প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন সকল আদালতে ভার্চুয়াল কোর্ট পরিচালনার নির্দেশ দেন। প্রধান বিচারপতি সুপ্রিমকোর্টে ২৩ মে ৩ টি বেঞ্চ গঠন করেন। ক্রমান্বয়ে ১৩ টি ভার্চুয়াল বেঞ্চ গঠন করা হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আইনজীবী, বিচারপ্রার্থী উপস্থিত না হয়ে অনলাইনে শুনানি শুরু হয়। ৬ নভেম্বর পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্ট আপিল বিভাগ ভার্চুয়াল আদালতে ৫ হাজারের বেশি আপিল নিষ্পত্তি হয়। ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে আপিল বিভাগ দুটি বেঞ্চ, হাইকোর্ট বিভাগে ১৬ টি দ্বৈত বেঞ্চ ও ১৬ টি একক বেঞ্চ গঠন করেন। বর্তমানে সনাতন পদ্ধতির পাশাপাশি উচ্চ আদালতে ভার্চুয়াল কোর্টেও বিচার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। ১১ মে থেকে ৯ জুলাই পর্যন্ত ভার্চুয়াল কোর্টে সারাদেশের জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেসি ও দায়রা আদালতে ১ লাখ ৭ হাজার ৩৭ টি জামিন শুনানি হয়। আর জামিন লাভ করে ৫৪ হাজার ৬ শ ৭৭ জন। 

সারাদেশে লক ডাউনের সময় আদালতে সরাসরি অংশগ্রহণ না থাকায় এবং জামিন শুনানি ছাড়া অন্যান্য কার্যক্রম বন্ধ থাকায় এ বছর মামলার রায় প্রচার তুলনামূলকভাবে নিতান্তই হাতে গোনা। এরমধ্যেও ৮ নভেম্বর হাইকোর্ট একক বেঞ্চের বিচারপতি জাফর আহমেদ দেশের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী রায় দেন। শরীয়তপুরের মতি মাতবরকে এক মাদক মামলায় নিম্ন আদালতের ৫ বছরের কারাদণ্ড বহাল রাখেন। তবে, তার সাজা কার্যকর হবে নিজগৃহে বসে। কারাগারে না পাঠিয়ে বাড়িতে অন্তরীন থেকে প্রবেশন আইনে সংশোধনের সুযোগে রায় প্রচার করা এটি হাইকোর্টের প্রথম ও যুগান্তকারী ঘটনা। বাড়িতে প্রবেশনের সুযোগের কতিপয় শর্ত বেঁধে দেন হাইকোর্ট । তম্মধ্যে ৭৫ বছর বয়সী বৃদ্ধ মায়ের যত্ন, দশম শ্রেণি পড়ুয়া মেয়ে ও দ্বিতীয় শ্রেণি পড়ুয়া ছেলের লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া। আইনে নির্ধারিত বিয়ের বয়স হওয়ার আগে মেয়েকে বিয়ে না দেয়ার শর্ত অন্যতম।

রিফাত শরীফ হত্যার রায়:

এবছর দেশের জেলা ও দায়রা জজ আদালতে দেয়া রায়ের মধ্যে বরগুনার আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলার রায়ে স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিসহ ৬ আসামির ফাঁসির আদেশ ও ৪ অভিযুক্তকে বেকসুর খালাস দেয়ার ঘটনা বহুল আলোচিত। ২০১৯ সালের ২৬ জুন বরগুনা শহরের কলেজ রোডে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করে রিফাতকে। এসময় সাথে থাকা স্ত্রী মিন্নি স্বামীকে বাঁচানোর চেষ্টা করে। যা ইন্টারনেটে ভাইরাল হলে দেশজুড়ে এ হত্যা- চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। মিন্নির সাহসিকতা প্রশংসিত হয় সামাজিক মাধ্যমে। এ মামলায় প্রধান সাক্ষী ছিলেন মিন্নি। কিন্তু পরবর্তীতে পুলিশের তদন্তে মিন্নি এ হত্যাকা-ের অন্যতম পরিকল্পনাকারী বলে প্রমাণিত হয়।

করোনা আক্রান্ত এ বছর অন্যান্য বছরের মতো ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের ঘটনা লাগামহীনভাবে বেড়ে যায়। হাজারো ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের এখলাশপুরে ঘরে ঢুকে এক মহিলাকে বিবস্ত্র করে মোবাইলে ভিডিও ধারণ ও ধর্ষণের ঘটনা। এ ঘটনাটিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়লে দেশের সর্বস্তরের মানুষ শিউরে ওঠে।

চট্টগ্রামের আদালতে রায় :

কোভিড আক্রান্ত বছরে চট্টগ্রামের আদালতের আলোচিত রায়গুলোর মধ্যে ১৩ ডিসেম্বর সাতকানিয়ার সোনাকানিয়া ইউপি চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা আমজাদ হোসেন হত্যা মামলার রায়ে সাতকানিয়া সদর ইউপি চেয়ারম্যান নেজামউদ্দিন চৌধুরী, সাতকানিয়া আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি বশির আহমেদ ও আপন তিনভাইসহ ১০ জনের ফাঁসির আদেশ দেন আদালত। ঘটনার ২১ বছর পর বহুল আলোচিত মামলাটির রায় হয়।

আকবরশাহর বিশ্বকলোনির একটি বাড়িতে ২য় শ্রেণির ছাত্রী মিমকে পালাক্রমে ধর্ষণ করে হত্যার ঘটনায় ১৪ ডিসেম্বর ৮ আসামির ফাঁসি ও এক লাখ টাকা করে অর্থদ-ের রায় দেন ট্রাইবুনাল।

নগরীর আকাশ হোটেলে জোড়াখুন করে আলামত গায়েব করার মামলায় আদালত ১৫ ডিসেম্বর হোটেল মালিক বাহার উদ্দিনসহ ৬ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের  আদেশ দেন।

পাকিস্তানি নাগরিকের দণ্ড :

প্রায় ৩০ লাখ ভারতীয় জালরুপীসহ পতেঙ্গায় গ্রেপ্তার হওয়া পাকিস্তানি নাগরিক আসলাম খানের বিরুদ্ধে  আদালত ৯ বছরের কারাদণ্ড দেন। সাজাশেষে তাকে তার দেশে ফেরত পাঠানোরও নির্দেশ দেন একই রায়ে।

আবদুর রহমান বদি :

এবছর স্পেশাল জজ আদালতে একযুগ পর আবারো শুরু হয় মাদক স¤্রাট নামে পরিচিত কক্সবাজার ৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদির দুর্নীতি মামলা। ১৩ সেপ্টেম্বর তাঁর বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পত্তি অর্জনের দুর্নীতি মামলায় চার্জ গঠন করা হয়। দুদক মামলাটি দায়ের করে ২০০৭ সালের ১৭ ডিসেম্বর।

ওসি প্রদীপ :

জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের দায়ে দুদকের মামলায় সিনহা হত্যা মামলার অভিযুক্ত টেকনাফ থানার বরখাস্ত হওয়া ওসি প্রদীপ দাশকে ১৩ সেপ্টেম্বর গ্রেপ্তার দেখানো হয় চট্টগ্রামের  মামলায়। জ্ঞাত আয় বহির্ভূত ৪ কোটি টাকার সম্পদ ও ১৩ লাখ টাকার সম্পদের তথ্য গোপন করার মামলায় স্ত্রী চুমকি কারণসহ দুজনের বিরুদ্ধে ২৩ আগস্ট দুদক মামলা দায়ের করে। চন্দনাইশের দুই ভাইকে টেকনাফ নিয়ে ক্রসফায়ারের নামে হত্যার অভিযোগে ওসি প্রদীপ ও চন্দনাইশ থানার কয়েক পুলিশের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম সিজেএম কোর্টে মামলা দায়ের করেন ভুক্তভোগীর বোন। তাঁর বিরুদ্ধে ৩১ আগস্ট কক্সবাজার জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেসিতেও ২ ভাই এবং এক ভাগ্নেকে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগে মামলা দায়ের করেন ভুক্তভোগীর পরিবার। ৩১ আগস্ট ৩৫ পুলিশ সদস্যসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে এ মামলা দায়ের হয়।

৩১ জুলাই রাতে কক্সবাজারের একটি পুলিশ চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে নিহত হন অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ।  এ ঘটনায় পুলিশ দুটি মামলা দায়ের করেন। ৫ আগস্ট সিনহার বোন শারমীন শাহরিয়ার ওসি প্রদীপসহ ৯ পুলিশের বিরুদ্ধে কক্সবাজারে মামলা দায়ের করেন। ৬ আগস্ট প্রদীপ কক্সবাজার আদালতে আত্মসমর্পণ করেন।  সিনহা হত্যা মামলায় র‌্যাব ১৩ ডিসেম্বর আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। এতে সিনহা হত্যার প্রধান পরিকল্পনাকারী প্রদীপ দাশ উল্লেখ করে ১৫ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয় র‌্যাব। ১৫ জনের মধ্যে ১৪ জন কারাগারে রয়েছেন। তম্মধ্যে ১২ জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

আল্লামা শফির মৃত্যু ও হেফাজত নেতার বিরুদ্ধে মামলা :

হেফাজতের আল্লামা শফির মৃত্যু ও ২৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা চট্টগ্রামসহ দেশে বছরের আলোচিত মামলা। ১৭ ডিসেম্বর আল্লামা শফিকে হত্যার অভিযোগে ৩৬ জনের বিরুদ্ধে চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নালিশি হত্যা মামলা দায়ের করেন আল্লামা শফির শ্যালক মো. মঈনুদ্দিন। হেফাজতের আমির জুনায়েদ বাবুনগরীরসহ মামলায় ৩৬ জনের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ আনা হয়। ১৮ নভেম্বর আল্লামা শফি হাটহাজারী মাদ্রাসায় অবরুদ্ধ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

পূর্বকোণ/এএ

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 200 People

সম্পর্কিত পোস্ট