চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

তাপদাহে রেণু পোনা উৎপাদন ব্যাহত: মৎসচাষীদের কোটি টাকার ক্ষতি

নিজস্ব প্রতিবেদক

২৮ মে, ২০১৯ | ১:৪৭ অপরাহ্ণ

প্রচন্ড তাপদাহে মৎস্যপল্লী খ্যাত যশোরের চাঁচড়ায় মাছের রেণু পোনা উৎপাদনে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। গরমের কারণে রেণু পোনা উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে।
উৎপাদনকারীরা বলছেন, এই গরমে প্রতিকূল অবস্থায় যেটুকু উৎপাদন হচ্ছে তারও ক্রেতা মিলছে না। বরং গরমে উৎপাদিত রেণু পোনা মারা যাচ্ছে। গত দুই সপ্তাহের এই পরিস্থিতিতে মৎস্যচাষিদের কোটি টাকার ক্ষতি হয়ে গেছে।
যশোর জেলা হ্যাচারি মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুর রহমান গোলদার জানান, গত কদিন ধরে যশোরাঞ্চলে তাপমাত্রা অসহনীয় পর্যায়ে চলছে। তাপমাত্রা ৩৬-৩৮ ডিগ্রি পর্যন্ত রেকর্ড করা হচ্ছে। যশোরাঞ্চলে এ তাপদাহ জনজীবনের পাশাপাশি এ অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ মৎস্য সেক্টরেও প্রতিকূল প্রভাব ফেলেছে।
এলাকার মাছচাষি অহিদুল্লাহ লুলু বলেন, ‘তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় রেণু পোনা উৎপাদনে ঝুঁকি নিতে চাচ্ছেন না হ্যাচারি মালিকরা। কেননা হাপা মালিকরা রেণু বা পোনা কেনা কমিয়ে দিয়েছেন গরমের কারণে। হাপায় প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহ না থাকায় পানির তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকছে না। ডিম থেকে রেণু উৎপাদনেই গরম প্রভাব ফেলছে।তিনি জানান, দ্রুত বৃষ্টি না হলে হ্যাচারি ব্যবসায় চরম ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।

যশোর জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, রেণু পোনা উৎপাদনে যশোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। এই জেলায় ৩৮টি হ্যাচারিতে পোনা উৎপাদন হচ্ছে। এর মধ্যে কার্প জাতীয় রেণু পোনা উৎপাদন ৬৪ দশমিক ৮৬ মেট্রিক টন। এই জেলায় রেণু পোনার চাহিদা ১৫ দশমিক ২৩ মেট্রিক টন। উদ্ধৃত থাকে ৪৯ দশমিক ৬৩ মেট্রিক টন। যা দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়।এখানে তেলাপিয়া পোনা উৎপাদিত হচ্ছে ১০১ দশমিক ৪০ মিলিয়ন। জেলায় চাহিদা রয়েছে ৯৮ দশমিক ৮৫ মিলিয়ন। তেলাপিয়ার উদ্ধৃত ৬ দশমিক ৫৫ মিলিয়ন। পাঙ্গাশ রেণু উৎপাদন ৩ দশমিক ৬২ মেট্রিক টন এবং শিং মাগুর, পাবদা, গুলশা রেণু উৎপাদন শূন্য দশমিক ৮৫ মেট্রিক টন।দেশের মোট চাহিদার ৬০ শতাংশ রেণু পোনা যশোর থেকে সরবরাহ করা হয়। চাঁচড়া মৎস্য পল্লীর ৩৮টি হ্যাচারিতে গত বছর প্রায় দু’লাখ ৬০ হাজার কেজি রেণু উৎপন্ন হয়েছে। চৈত্র থেকে মধ্য আষাঢ় রেণু পোনা উৎপাদনের ভরা মৌসুম। কিন্তু গত দু’সপ্তাহ ধরে অব্যাহত তাপদাহে বিপর্যয় নেমে এসেছে হ্যাচারি ও নার্সারিগুলোতে। এখানে রেণু পোনা ও চারা মাছ উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে।

যশোর জেলা মৎস্য হ্যাচারি মালিক সমিতির সভাপতি ও ফাতিমা হ্যাচারির স্বত্বাধিকারী ফিরোজ খান জানান, বিগত এপ্রিল ও চলতি মে মাসের পুরোটা জুড়েই চলছে প্রচন্ড তাপদাহ। এতে তাদের হ্যাচারিতে উৎপাদিত রেণু পোনা মারা যাচ্ছে। এছাড়া খাদ্য ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সব হ্যাচারিতে রেণু পোনা উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
রেণু পোনা উৎপাদনকারী ব্যবসায়ীরা বলছেন, এ বছর অতি খরা, পোনার দাম কমে যাওয়া এবং বিদ্যুতের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে রেণু পোনা উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এতে করে লোকসানে পড়বেন ব্যবসায়ীরা।

মাছ চাষিরা আরও জানান, চলমান গ্রীষ্ম মৌসুমে মাছের সহনীয় তাপমাত্রার চেয়ে যশোরাঞ্চলে তাপমাত্রা বেশি হওয়ায় হাপাগুলোতে ( রেণু, পোনা সংরক্ষণের অল্প পানির অস্থায়ী পুকুর) প্রতিদিন প্রচুর মাছ মারা যাচ্ছে। এজন্য মাছ সংগ্রহ অনেকাংশে কমিয়ে দিয়েছেন হাপা মালিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। যে কারণে রেণু পোনা উৎপাদনকারী হ্যাচারিগুলোতেও উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে ৫০ শতাংশের মতো। সব মিলিয়ে জেলার মৎস্য সেক্টর তথা হ্যাচারি ও হাপা ব্যবসায় সংশ্লিষ্টরা প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা লোকসান গুনছেন। গরমের এই কদিনে তাদের ক্ষতি কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
এ বিষয়ে যশোর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আনিছুর রহমান বলেন, ‘যশোরাঞ্চলের ওপর দিয়ে কয়েকদিন ধরে যে তাপমাত্রা বয়ে যাচ্ছে তা মাছ চাষের জন্য খুবই প্রতিকূল। এমন তাপমাত্রায় রেণু উৎপাদন সম্ভব না। প্রতিবছর এই সময়টা মাছ চাষিদের জন্য খুবই খারাপ সময় যায়। এ সময়ে আমরা রেণু উৎপাদনকারীদের সতর্কতার সঙ্গে কাজ করার পরামর্শ দিই। কয়েকদিনের মধ্যে বৃষ্টিপাত হলে বা তাপমাত্রা কমে গেলে রেণু উৎপাদন স্বাভাবিক পর্যায়ে চলে আসবে বলে আশা করা যাচ্ছে।’

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট