চট্টগ্রাম শুক্রবার, ০৫ জুন, ২০২০

৯ মাস ধরে বন্ধ কৃষিযন্ত্রে ভর্তুকি

২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ | ১০:১৮ অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক

৯ মাস ধরে বন্ধ কৃষিযন্ত্রে ভর্তুকি

কৃষিতে এখন তীব্র হচ্ছে শ্রমিক সংকট তেমনি কমছে কৃষিজমি। বাড়তি মানুষের খাদ্য চাহিদা পূরণের পাশাপাশি শ্রম ও সময় সাশ্রয়ের জন্য গুরুত্ব বাড়ছে কৃষি যন্ত্রপাতির। তবে সেটি করতে হলে প্রয়োজন কৃষি যন্ত্রগুলোকে ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নিয়ে আসা। সেজন্য প্রয়োজন ভর্তুকি সহায়তা। সেই সহায়তা দিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে ৪০০ কোটি টাকা চেয়েছিল কৃষি মন্ত্রণালয়। কিন্তু অনুমোদন হয়েছে মাত্র ১০০ কোটি টাকার কিছু বেশি। গত নয় মাস ধরে বন্ধ থাকা ভর্তুকি কার্যক্রমে পরিমাণ অর্থ নিয়ে হতাশা তৈরি হয়েছে খাত সংশ্লিষ্টদের মধ্যে। সূত্র : দেশ রূপান্তর

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ৪০০ কোটি টাকা চেয়ে একটি চিঠি অর্থ সচিব বরাবর পাঠান কৃষি সচিব। পরবর্তীতে অর্থ মন্ত্রণালয় একটি নীতিমালা চেয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করে। নীতিমালা না থাকায় পরে কৃষি মন্ত্রণালয় খসড়া নীতিমালা সংযুক্ত করে অর্থ ও মন্ত্রিসভা কমিটিতে পাঠান কৃষি সচিব। সেটি মন্ত্রিসভা কমিটি অনুমোদন করলে পরবর্তীতে অর্থ মন্ত্রণালয় ১০০ কোটি টাকার কিছু অর্থ ছাড় করে।

এ বিষয়ে কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আবদুর রাজ্জাক বলেন, কৃষি ব্যবস্থাকে যান্ত্রিকীকরণ করতে চায় সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে আলাদা ৪০০ কোটি টাকার থোক বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। অর্থ বরাদ্দের আগ থেকেই মাঠপর্যায়ে চাহিদা নিরূপণ শুরু করেছি। চূড়ান্ত হিসেবে স্বল্প সময়ের মধ্যেই পেয়ে যাব। কিন্তু মন্ত্রণালয় থেকে মাত্র ১০০ কোটি টাকার কিছু বেশি বরাদ্দ পেয়েছি। তবে বরাদ্দ যা পেয়েছি তার চেয়ে হয়তো আরও বেশি অর্থের প্রয়োজন হবে। মাঠপর্যায়ে যে চাহিদা তৈরি হয়েছে সেগুলো মেটানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। কেননা বরাদ্দকৃত অর্থ আমরা খরচ করতে পারলে আরও বেশি বরাদ্দ পাব। ফলে ভর্তুকি সহায়তা নিয়ে কৃষকদের দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই।

এ বিষয়ে দি মেটাল প্রাইভেট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সাদিদ জামিল বলেন, আমরা চেষ্টা করছি বিভিন্নভাবে কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণের ব্যবস্থাটি সচল রাখার। বিভিন্ন মেয়াদে প্রকল্পের মাধ্যমে যে সহায়তা দেওয়া হতো সেটি গত জুনে শেষ হয়েছে। কার্যত তখন থেকেই বন্ধ রয়েছে যান্ত্রিকীকরণে ভর্তুকি কার্যক্রম। এরপর গত কয়েক মাস ধরেই সরকারের বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থা কৃষির যান্ত্রিকীকরণের বিশাল সহায়তা দেওয়া হবে বলে ঘোষণা দিচ্ছে। এতে কৃষক আবারও আগ্রহী হচ্ছেন যন্ত্র কেনায়। তারা অপেক্ষা করছেন কবে থেকে এ সহায়তা দেওয়া হবে। ভর্তুকি সহায়তার আশায় কৃষিযন্ত্র কেনা শুরু করছেন না। মাঠপর্যায়ে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে কৃষিযন্ত্রের। কিন্তু আমরা বিক্রি বাড়াতে পারছি না।

জানা গেছে, ট্রাক্টর ব্যবহার হচ্ছে প্রায় ৫০ হাজার এবং পাওয়ার টিলারের ব্যবহার হচ্ছে প্রায় ৭ লাখ। এসব যন্ত্রের মাধ্যমে মাটি কর্তনের প্রায় ৯০ শতাংশ চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে। ধান কাটা ও মাড়াইয়ে ব্যবহার হয় কম্বাইন্ড হার্ভেস্টার। এই যন্ত্রের চাহিদা রয়েছে ১ লাখের বেশি। কিন্তু দেশে ব্যবহার হচ্ছে ১ হাজারের কম। আর ধান বীজ বোনার জন্য রাইস ট্রান্সপ্লান্টারের প্রয়োজন ২ লাখ। অথচ দেশে এ যন্ত্রটির ব্যবহার হচ্ছে ১ হাজারেরও কম। শুধু ধান কাটার যন্ত্র রিপারের চাহিদা ১ লাখ। অথচ দেশে এ যন্ত্র রয়েছে ৫ হাজার। আর ধান বোনার জন্য পিটিও সিডার আছে মাত্র আড়াই হাজার। দেশে এই যন্ত্রের চাহিদা রয়েছে ১ লাখ। একটি কম্বাইন্ড হার্ভেস্টারের দাম ২৫-৩০ লাখ টাকার মধ্যে। বপন ও কর্তন যন্ত্রের দাম বেশি হওয়ায় কৃষকদের জন্য ক্রয় কষ্টসাধ্য। সরকার ৫০ শতাংশ ভর্তুকি দিলে কৃষকদের মধ্যে কিছুটা আগ্রহ তৈরি হচ্ছে। কিন্তু সেটি গত নয় মাস ধরে বন্ধ থাকায় বিক্রিতে এক ধরনের ভাটা পড়েছে। কিছু মাঝারি ও হালকা কৃষিযন্ত্রের বিক্রি হলেও বড় কৃষিযন্ত্র বিক্রি প্রায় শূন্যের কোঠায় পৌঁছেছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য প্রফেসর ইমেরিটাস ড. আবদুস সাত্তার ম-ল বলেন, আধুনিক চাষাবাদে উন্নত প্রযুক্তির ট্রাক্টর ও কম্বাইন্ড হার্ভেস্টারের ব্যবহার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ক্রয়ক্ষমতা না থাকা ও অর্থ সহায়তার অভাবে বেশি দামের এসব যন্ত্রপাতি কিনতে পারছেন না কৃষক। সেখানে সরকারের ভর্তুকি সহায়তা কার্যকর করার পাশাপাশি অর্থায়ন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে। কেননা এখনো ব্যাংকগুলো সরাসরি কৃষককে ঋণ না দিয়ে কোম্পানিগুলোকে ঋণ প্রদান করছে। সেই ঋণ দিয়েই কৃষক মেশিন ক্রয় করছে। এছাড়া যন্ত্র আমদানি শুল্ক ব্যবস্থা কৃষকের সামর্থ্যরে মধ্যে আনার জন্য ভর্তুকি সহায়তা বাড়াতে হবে।

এ বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য (জ্যেষ্ঠ সচিব) ড. শামসুল আলম বলেন, ফসলের উৎপাদিকা শক্তি বাড়াতে যান্ত্রিকীকরণের কোনো বিকল্প নেই। এজন্য সরকারের দ্বিতীয় প্রেক্ষিত পরিকল্পনায় কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হয়েছে। কৃষিতে যতটা যন্ত্রপাতির প্রয়োজন রয়েছে সেগুলোকে যৌক্তিকভাবে মেটাতে হবে। কৃষককে সর্বোচ্চ সহায়তা দিলে দেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা আরও জোরালো হবে।

তিনি বলেন, ২০৪১ সালে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হবে বাংলাদেশ। এজন্য নেওয়া হয়েছে ২০ বছর মেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা। সেখানে প্রায় ১০ কোটি ২০ লাখ টন খাদ্যশস্যের প্রয়োজন হবে। বিপুল এ খাদ্যশস্যের চাহিদা মেটাতে স্বল্প জমিতে অধিক ফলন জরুরি। বাড়তি খাদ্যশস্য উৎপাদনে সহায়ক হিসেবে কাজ করবে কৃষিকাজ যান্ত্রিকীকরণ।

 

 

 

পূর্বকোণ/আরপি

The Post Viewed By: 97 People

সম্পর্কিত পোস্ট