চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ১২ নভেম্বর, ২০১৯

সর্বশেষ:

১৯ অক্টোবর, ২০১৯ | ১:৩৭ পূর্বাহ্ণ

অর্জুন ইউসুফ

আরপেজিও মিউজিক স্কুল ও ভায়োনার তুখোড় যন্ত্রশিল্পী

মো. নাজিম উদ্দিন জাহেদের স্বপ্ন-বাস্তবতা

‘শেকড়ের খোঁজে’ ওরা। “ওদের সবার একই রকম স্বপ্ন ছিল। শুধু এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন। তারা খুঁজতে বেরিয়েছিল তাদের শেকড়। তারা ক’জন এই পৃথিবীর বাকি ৯৫ শতাংশ মানুষের মত হয়ে থাকতে চায় নি। কারণ, তারা বন্দী মগজের কারাগারে নিজেদের আটকে রাখে নি। তারা স্বপ্ন বানায় নিজেদের মত। গন্তব্যের দেখা হোক না হোক, এই যাত্রা যেন এভাবেই চলে….” একথাগুলো ‘দ্য ট্রি’ অ্যালবামের একটি গানের উপর লেখা। সেই অ্যালবামের স্বপ্নদ্রষ্টা এবং আরপেজিও মিউজিক স্কুল এন্ড ওয়ার্কশপের (অৎঢ়বমমরড় গঁংরপ ঝপযড়ড়ষ) কর্ণধার এক স্বপ্নবাজ তরুণ মো. নাজিম উদ্দিন জাহেদ। যিনি একাধারে ভোকালিস্ট, গিটারিস্ট, পিয়ানিস্ট, ভায়োলিনিস্ট।

শিল্পের চারা তার আর্কিটাইপে রোপিত ছিল। বাবা ছিলেন অন্যরকম শিল্পী। তার বাবা মো. কামাল উদ্দিন গার্মেন্টস-এ প্যাটার্ন ডিজাইনার হিসেবে কাজ করেছে দীর্ঘদিন। দুই ভাই এক বোনের মধ্যে সবার ছোট জাহেদ ২০০৯ সালে ইউআইটিএস থেকে এমবিএ ডিগ্রী নেন। এরপর মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংকে কাজ করেছেন প্রায় দশ বছর। কিন্তু সুর যার রক্তে, সঙ্গীত যার নেশা- তাকে পেশা কী করে বেঁধে রাখবে! তাই চাকুরি জীবনের ইতি টেনে পরিপূর্ণভাবে মিউজিকে মন-প্রাণ ঢেলে দিয়েছেন।

এসএসসি পড়ার সময় থেকে মিউজিকের পোকা মাথায় বাসা বাঁধে। একটু-আধটু চর্চা ছিল তখন থেকে। পরবর্তীকালে সঙ্গীতজ্ঞ চঞ্চল মাহমুদের কাছে তালিম নেন যন্ত্রীসঙ্গীতে। সেই স্কুলের নাম ছিল, ডোরেমিফা। এখানে হাতেখড়ি হলেও তাকে আর কারও কাছে যেতে হয় নি। অন-লাইন থেকে বাকি শিক্ষা গ্রহণ করেছেন।

জাহেদ ২০০৬ সালে ‘হেমরিজ’ (ঐবসড়ৎৎযমব) ব্যান্ড দল গঠন করেন। ‘হেমরিজ’ শব্দের অর্থ রক্তক্ষরণ। হৃদয়ে সুরের রক্তক্ষরণের কারণে এই দলটি গঠন করা। এর অনেকগুলো গান তখন শ্রোতাদের কণ্ঠে ঘুরতো। যেমন, শব্দের আবেগ, মন-মূর্তির শরীর এবং পৃথিবীর মৃত্যু ইত্যাদি। এটি বেশিদিন টিকে থাকে নি। এরপর ‘ঞযব ঞৎবব’ ব্যান্ড নিয়ে হাজির হন ২০১২ সালে। দ্য ট্রি পূর্ণাঙ্গ ব্যান্ড দল। মোট এগারটি গান নিয়ে দ্য ট্রি’র অ্যালবাম ‘এই শহর থেকে’ বের হয় ২০১৬ সালে। গানগুলো হচ্ছে, নীলে আবার আমি, নতুন সময়, শেকড়ের খোঁজে, ইচ্ছের আকাশে, শেষ চিরকুট আর অনুপ্রেরণা, দূরত্বের সংকেত, অপেক্ষা নয় উপহাস, বৃষ্টির গান, চৎড়ঢ়ড়ংব ঝড়হম, ভোরের গল্প এবং অসমতা ও বৈচিত্র্য। এর অনেকগুলো গানে সময়-চেতনা ধরা পড়েছে। পরিবেশ, গার্মেন্টস কন্যাদের দুঃখী জীবন, পরিবেশ সংরক্ষণ, মহান মুক্তিযুদ্ধের কথাসহ সমাজের নানা অনুষঙ্গ তুলে আনার চেষ্টা হয়েছে। বেশ ক’টি গান শ্রোতা-প্রিয়তা পেয়েছে। তাদের ভাষায়- “ঞযব ঞৎবব” ঃবষষং ধ ংঃড়ৎু রিঃয বাবৎু ংড়হম. চড়ঁৎরহম রহ ধষষ ঃযবরৎ যড়ঢ়বং, ফৎবধসং, ফবংঢ়ধরৎ, ধহমবৎ, ঋৎঁংঃৎধঃরড়হং ধহফ যধঢ়ঢ়রহবংং ঃযধঃ ঃযবু ঃযবসংবষাবং যধাব রিঃহবংংবফ, ংববহ ধহফ ভবষঃ.”

শিল্পী নাজিম উদ্দিন জাহেদ মিউজিক নিয়ে এতোসব কাজের পরেও ভেবেছেন পরবর্তী প্রজন্ম নিয়ে। নিজে হাতড়ে শিখেছেন। তরুণদের প্রশিক্ষণের কোনো পরিবেশ নেই চট্টগ্রামে। সেই অপূর্ণতা দূর করতে তিনি নিজেই অৎঢ়বমমরড় গঁংরপ ঝপযড়ড়ষ (আরপেজিও মিউজিক স্কুল) খুলে বসেন। সেখানে গিটার, পিয়ানো, বেজ, ড্রাম, ভায়োলিন, ফ্লুইট এবং ইউকুলেলে শেখানোর ব্যবস্থা করেন। স্টুডেন্টস্ ডেভেলোপ করতে ব্যাংকারে মতো আকর্ষণীয় জব ছেড়ে দেন। প্রায় তিন হাজার তিন শয়ের মতো শিক্ষার্থী নিয়ে বিভিন্ন গ্রুপে ব্যান্ড ফর্ম করেন। এদের মধ্যে যারা খুবই উৎকর্ষতা দেখাতে পেরেছে তাদের গান ও ইনস্ট্রুমেন্টাল মিউজিক রেকর্ড করেন নিজের স্টুডিওতে। পরে বাছাই করা কিছু ইউটিউবে দিয়েছেন। জাহেদ জানান, সার্বিক মিউজিকের পরিবেশ সৃষ্টি করে এই স্কুলটি পরিচালিত হচ্ছে। ইন্টারন্যাশনাল মিউজিক স্কুলগুলোর সিলেবাস পর্যালোচনা করে নিজের মতো একটি সিলেবাস প্রণয়ন করে কোর্স প্রোগ্রাম চালানো হচ্ছে।

যেমন, ১. জমিং সেসন, ২. পারফর্মিং সেসন, ৩. রেকর্ডিং সেসন, ৪. মিউজিক ওয়ার্কশপ, এভাবে কোর্স তৈরী করা হয়েছে। মোট দু’বছরের কোর্স করতে হয় শিক্ষার্থীদের। বিভিন্ন সময়ে ওয়ার্কশপ করিয়েছেন- বেস্বাবা সুমন, আরবো ভাইরাস এর আসিফ আসগর, দেওয়ান এনামুল হাসান এবং জাহেদ নিজে। এদের মধ্যে থেকে সেরাদের নিয়ে ২০১৭ সালে টিআইসিতে ‘দ্য ড্রিম শো’ করেন।

সাধারণত কোনো কর্পোরেট প্রোগ্রামে সঙ্গীত শিল্পীদেরই ডাক পড়ে। যন্ত্রসঙ্গীতও যে শ্রোতাদের মনোরঞ্জন করতে পারে তার প্রমাণ রেখেছেন জাহেদ “ভায়োনো” প্রতিষ্ঠা করে। ভায়োলিনের ‘ভা’ এবং পিয়ানোর ‘য়ানো’ যুক্ত করে নামকরণ করেছেন ভায়োনা। ইতিমধ্যে উচ্চ মহলে তাদের পরিবেশনা দর্শক-শ্রোতাদের মন কাড়তে সক্ষম হয়েছে। মূলত ভায়োলিন ও পিয়ানোর যুগলবন্দি করে থাকেন।
নাজিম উদ্দিন জাহেদ বাংলাদেশের ব্যান্ড সঙ্গীতের ঐতিহ্যকে ধারণ করে তাকে এগিয়ে নেয়ার কাজটি করেছে যাচ্ছেন নিভৃতে।

ব্যান্ড সঙ্গীত মূলত চট্টগ্রাম থেকেই উঠে এসেছে জাতীয় পর্যায়ে। সোলস’র মাধ্যমে শুরু। পরবর্তীতে জেমস’র ফিলিংস দেশ জয় করে। আইয়ুব বাচ্চুর এলআরবি, নগর বাউল, মাইলস, রেনেসাঁ, অবসইকউর, ফিডব্যাক, ডিফারেন্ট টাচ, আর্ক, সফট টাচ ইত্যাদি ব্যান্ড দলগুলো দেশের গ-ি ছাড়িয়ে বিশ^দরবারেও স্থান করে নেয়। অন্যদিকে, পপ-স¤্রাট আজম খানের ব্যান্ড উচ্চারণও আলোড়ন তুলেছিল। আজকে আমরা গর্ব করে বলতে পারি যে, বাংলাদেশের হার্ডরক ব্যান্ড এর মধ্যে ওয়ারফেজ (ডধৎভধুব) বিশে^র সেরা দশ ব্যান্ড দলের পঞ্চম স্থানে রয়েছে। অন্যদিকে, এশিয়ার সেরা দশের মধ্যে আর্টসেল (অৎঃপবষষ) এক নম্বরে। মো. নাজিম উদ্দিন জাহেদ রক্তের এই উত্তরাধিকার বহন করে এগিয়ে যাবেন এই প্রত্যাশা করছি।

The Post Viewed By: 254 People

সম্পর্কিত পোস্ট