চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ০২ মার্চ, ২০২১

১২ অক্টোবর, ২০১৯ | ১:৩৬ পূর্বাহ্ণ

অর্জুন ইউসুফ

ওয়েডিং ফটোজার্নালিস্ট আতা মোহাম্মদ আদনানের স্বপ্ন-বুনন

দু’জন মানুষ বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার অঙ্গীকার যখন করে তখন তারা সেই স্মৃতিটুকু পরবর্তী সময়ের জন্য ধরে রাখতে চায়। আলোকচিত্রই সেই স্মৃতি সংরক্ষণের উত্তম উপায়। বিবাহ উৎসবের সত্যিকার চিত্র একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিকের দৃষ্টিতে ধরে রাখার জন্য ২০০২ সালে ডবফফরহম চযড়ঃড় ঔড়ঁৎহধষরংঃ অংংড়পরধঃরড়হ (ডচঔঅ) গঠিত হয়। তারই অনুপ্রেরণায় ডা. আতা মোহাম্মদ আদনান ২০১৩ সাল থেকে ওয়েডিং ফটোজার্নালিজম শুরু করেন। ছোটবেলায় শখের বশে বাবার ক্যামেরা দিয়ে ছবি তোলা শুরু। আজ এই ক্ষেত্রটিতে তার একটি শক্ত অবস্থান তৈরী হয়েছে। জুটেছে অনেক আন্তর্জাতিক পুরস্কার।

আতা মোহাম্মদ আদনানের জন্ম ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৭ সালে। তাদের গ্রামের বাড়ি বাঁশখালী উপজেলায়, বাবা প্রখ্যাত ডাক্তার আতা মোহাম্মদ মোজাস্সেল। মা নীলুফার বেগম একজন সু-গৃহিণী। এক ভাই ও বোনের মধ্যে আদনান বড়। সানসাইন গ্রামার স্কুল এন্ড কলেজ থেকে ‘ও’ ও ‘এ’ লেভেল শেষ করার পর চীনের গোয়াংজুর সান ইয়েৎসান বিশ^বিদ্যালয় থেকে এমবিবিএস ডিগ্রী সম্পন্ন করেন। এরপর ইংল্যান্ডের লিচেস্টার ইউনিভার্সিটি থেকে ডায়াবেটোলজির উপর মাস্টার্স কোর্স করেছেন।
বাবার ইয়াশিকা ক্যামেরা দিয়ে শৈশবে ফটো তোলা শুরু হলেও মূলত বিশ^বিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালীন সময়ে ফটোগ্রাফির প্রতি বেশি করে ঝুঁকে পড়েন। ২০১০ সালে ক্রিয়েটিভ ফটোগ্রাফি শুরু। এরপর ২০১৩ সাল থেকে পূর্ণোদ্যমে ওয়েডিং ফটোজার্নালিজম শুরু করেন। শুরুতে বলেছি, এ ধরনের ফটোগ্রাফি চর্চা পশ্চিমে থাকলেও তা বাংলাদেশে খুব একটা প্রচলন ছিল না। আদনানের হাত ধরেই মূলত বাংলাদেশে তার যাত্রা শুরু হয়েছে বলা যায়। বিয়ের সাদামাঠা ছবিকে তিনি সাংবাদিকতার অনুসন্ধিৎসু ও গভীর নিরীক্ষণের মধ্য দিয়ে ধরতে চেয়েছেন। তার কাজ কেবল দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়- সিঙ্গাপুর, ভারত, নেপাল, শ্রীলংকা এবং ইউকে-তেও তার বিস্তৃতি ঘটেছে। ১০জন ফটোগ্রাফার নিয়ে তিনি পেশাদারী ভিত্তিতে কাজ করছেন। তার প্রতিষ্ঠানের নাম ‘রেমিনিসেন্স ফটোগ্রাফি’।

তিনি জানান, ডাক্তারি ও ফটোগ্রাফি দুটোকেই সমান গুরুত্ব দিয়ে জীবন চলার পথ তৈরী করতে চান। এ কাজে তার অনুপ্রেরণা হচ্ছেন, আলোকচিত্রী নাঈম কামাল, আবীর আবদুল্লাহ, স্টিভ ম্যাককারি। তার দুঃখ চট্টগ্রামে অনেক আন্তর্জাতিক পর্যায়ের এবং পুরস্কারপ্রাপ্ত আলোকচিত্রী থাকার পরও এখানকার আলোকচিত্র প্রসারের পরিবেশ তরুণদের জন্য মোটেই উপযোগী নয়। ঢাকায় অনেকগুলো ফটো গ্যালারি থাকলেও চট্টগ্রামে সেরকম একটিও নেই। অথচ, আমরা চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী বলে থাকি। কিন্তু এখানে ফটোগ্রাফি প্রশিক্ষণের জন্য সরকারী বা বেসরকারী উদ্যোগে কোনো ইনস্টিটিউট নেই। অথচ লেখাপড়ার পাশাপাশি শিশু-কিশোরদের সৃজনশীলতা বিকাশের জন্য ফটোগ্রাফির চর্চা করা যেতে পারে। তিনি জানান, আন্তর্জাতিক খ্যাতিমান আলোকচিত্রী শহিদুল আলমের ফটোগ্রাফি প্রতিষ্ঠান ‘পাঠশালা’-কে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে অধিভুক্ত করা হয়েছে। এটি ভালো উদ্যোগ। এখান থেকে ফটোগ্রাফি, এডিটিংসহ অন্যান্য মাধ্যমে ব্যাচেলর ডিগ্রীর পাশাপাশি ডিপ্লোমা ও শর্ট কোর্সের ব্যবস্থা রয়েছে। চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয় ইচ্ছে করলে এটি চালু করতে পারে।

উল্লেখ্য, ফটোগ্রাফি একটি বহু প্রাচীন শিল্প মাধ্যম। “১৮৩৪ সালে ব্রাজিলের ক্যাম্পিনাসে হারকিউলিস ফ্লোরেন্স নামে এক ফরাসি চিত্রকর ও আবিষ্কারক ডায়েরিতে নিজের একটি পরীক্ষার বিবরণীতে ‘ঢ়যড়ঃড়মৎধঢ়যরব’ শব্দটি ব্যবহার করেন। যতদূর জানা যায়, ১৮৩৯ সালের ১৪ মার্চ লন্ডনের রয়্যাল সোসাইটির একটি লেকচারে স্যার জন হারসেল ‘ঢ়যড়ঃড়মৎধঢ়যু’ শব্দটি প্রথম জনসমক্ষে আনেন। যদিও ওই বছরই ২৫ ফেব্রুয়ারি ঠড়ংংরংপযব তবরঃঁহম নামে একটি জার্মান সংবাদপত্রে বার্লিনের জ্যোতির্বিদ জোয়ান ফন মেডলার ফটোগ্রাফি শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন।”

ইংরেজি “ঢ়যড়ঃড়মৎধঢ়যু”এসেছে গ্রিক φωτός (ঢ়যōঃড়ং) φῶς (ঢ়যōং) শব্দ থেকে আগত) বা “আলো” এবং γραφή (মৎধঢ়যল্ক) বা “লাইনের দ্বারা প্রকাশ” বা “অঙ্কন” শব্দ থেকে। দুটি শব্দের একত্রে অর্থ দাঁড়ায় “আলো দিয়ে আঁকা”।
আদনান ফটোগ্রাফির সেই সুদীর্ঘকালের ঐতিহ্যকে ধারণ করে গণ-মানুষের আলোকচিত্রী হয়ে উঠতে চান তার ধারণকৃত চিত্রের মধ্য দিয়ে। ফটোগ্রাফি তাকে মানুষের কাছে যেতে সাহায্য করে। কারণ, এটি আর্থ-সামাজিক সীমানা মানে না। এর ভাষা আন্তর্জাতিক। তাই তার আলোকচিত্র বিবিসি, সিএনএন, হাফিংটন পোস্ট, গার্ডিয়ান এবং দেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। ১০টিরও বেশি দেশে তার আলোকচিত্র প্রদর্শিত হয়েছে।

পুরস্কার :
১. প্রথম পুরস্কার, ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড – সনি ওয়ার্ল্ড ফটো অ্যাওয়ার্ড ২০১৫, ইউকে।
২. প্রথম পুরস্কার, ওয়েডিং ক্যাটাগরি, ইন্টারন্যাশনাল ফটো অ্যাওয়ার্ড (আইপিএ’ ২০১৭)
৩. প্রথম পুরস্কার, অডিটাম ফটো কনটেস্ট ২০১৫, বার্সেলোনা, স্পেন।
৪. প্রথম পুরস্কার, আর্ট অব বিল্ডিং অ্যাওয়ার্ড ২০১৬, ইউকে।
৫. প্রথম পুরস্কার, টেন ফটোস্ দ্যাট সুক দা ওয়ার্ল্ড ২০১৪, ইন্ডিয়া।
৬. প্রথম পুরস্কার, পোর্ট্রেট ক্যাটাগরি, আইআইইউপিই’ ২০১৩, বাংলাদেশ।
৭. দ্বিতীয় পুরস্কার, লাইফ ক্যাটাগরি, ব্রেক দা সার্কেল’ ২০১৪, বাংলাদেশ।
৮. তৃতীয় পুরস্কার, বি এ- ডাব্লু, লাইফ অ্যারাউন্ড ইউ’ ২০১৪, বাংলাদেশ।
৯. প্রথম পুরস্কার, লাইফ ইন কলার- টিপিএ, ইউকে।

প্রদর্শনী: পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গ্রুপ প্রদর্শনীর সঙ্গে আদনান এর দুটি একক প্রদর্শনী চট্টগ্রাম ও ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়।

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 632 People

সম্পর্কিত পোস্ট