চট্টগ্রাম রবিবার, ১৭ নভেম্বর, ২০১৯

সর্বশেষ:

১ নভেম্বর, ২০১৯ | ১:৪২ পূর্বাহ্ণ

শাহিদ হাসান

সহজ ভাষায় রচিত কবি শামীম হাসান-এর কাব্যগ্রন্থ ঋতুমঙ্গল

প্রকৃতিবাদী ও পক্ষীপ্রেমী কবি শামীম হাসান কৈশোর বেলায় কবিতার জগতে প্রবেশ করেন। শৈশব থেকে নদী ও পাহাড় ঘেরা সবুজ চট্টগ্রামের প্রকৃতি তাকে বারবার টেনেছে। প্রকৃতি কেন টানছে ও-বেলায় হয়তো কোন ব্যাখ্যা খুঁজে পাননি, পাবার কথাও নয়। তবে কবি হবার জন্য এটি অন্যতম লক্ষণ বলে কাব্যবোদ্ধারা মনে করেন।

শামীম হাসান মূলত রোমান্টিক ঘরোনার কবি। তার কাব্য প্রকল্পে প্রকৃতির আবহ সরব মহিমায় উজ্জ্বল। রোমান্টিক কবিকুল কল্পনার ডানায় ভর করে কাব্যাকাশে পাখির মতো ডানা মেলে এবং অন্বেষণ করেন আধুনিক কবিতার নেতিবাচকতার বিপরীতে ইতিবাচক প্রক্রিয়ায় প্রকৃতির অপার রহস্যে নিজের ও অদৃশ্য শক্তির অস্তিত্ব। শামীম হাসান ইতিবাচক ধারার কবি। তার সংগঠিত কাব্য মানস মাঙ্গলিক চোখে দেখতে অভ্যস্ত। এ-কারণে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থের নাম ‘ঋতুমঙ্গল’। প্রকৃতি বিনাশ করে অপরিকল্পিতভাবে অ্যাপার্টমেন্ট সম্প্রসারণের যুগে আলোচ্য কাব্যগ্রন্থে কবির কাব্যিক দৃষ্টিভঙ্গি জানার জন্য তার কটি কবিতা উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করছি-

১. মেঘের আশ্চর্য নকশা থেকে সে নেমে আসে/অনেকটা হকচকিয়ে তাকে বললাম,/এসো এসো/একটু জিরিয়ে নাও, তারপর ঢের কথা হবে।/ স্বপ্নের ঘেরাটোপে কথপোকথন/ স্মৃতি থেকে স্বচ্ছন্দে নেমে আসছে কথামালা,/দুলে দুলে নেমে আসছে, আসমান হতে/রৌদ্রের সোনালী বর্ণ হয়ে, চাঁদের আলোয় গলে,/ হৃদয়ে তোলপাড় তোলে,/ হৃদয়ের গভীরে আছে সকল সম্পর্ক গাঁথা।

(সম্পর্ক : পৃষ্ঠা : ৬০)
সুপ্রাচীন কালে সাধু-সন্ন্যাসীরা স্মৃতি থেকে যে-সব কথা বলে তা অদৃশ্য শক্তির দৈববাণী হিসেবে শ্রোতাদের মনে গেঁথে যায়। পরবর্তীতে শ্রোতারা উন্মুক্ত প্রান্তরে জনসাধারণের উদ্দেশ্যে প্রচার করে। রোমান্টিক কবিরা অদৃশ্য শক্তি তথা জীবনদেবতা নাকি তাদেরকে দিয়ে কবিতা রচনা করান। কবি শামীম হাসান- এর স্মৃতি থেকে স্বাচ্ছন্দ্যে নেমে আসে তার কথামালা, যা হৃদয়ের গভীরে চিরকাল বসবাস করে সম্পর্কের সূত্রে।
২. স্বপ্নের পাখি স্বপ্নে আসে উড়ে/ নদী, সাগর অরণ্যদেশ ঘরে,/ তারা মাখা রাতের আকাশ হতে, নীলশির,/ মহাকাশের ওপারে মহাদেশে তার নীড়।

(পাখি চাঁদ : পৃষ্ঠা : ৫২)
এখানে মূলত শামীম হাসান- এর ‘স্বপ্নের পাখি’ নীড় বুনেছে বাস্তবিক মহাকাশের ওপারে তার মন-মননের মহাদেশে। যেভাবে বাউল কবিদের অন্তরে চিরকাল বসত করে ‘বৈরাগীর লাউয়া’।
৩. নদীকে ঘিরে আমি, তার পাড়েই আমার ছোট্ট ঘর,/ আমায় ঘিরে নদী, অদূরে শান বাঁধানো পিতার কবর।
(নদী : পৃষ্ঠা : ৪৮)
নদীকেন্দ্রিক যাদের জীবন-যাপন, নদীই তাদের বেঁচে থাকার প্রধান উৎস। নদীকে ঘিরে তাদের আনন্দ-বেদনার সংসার। তাই কবি তার পিতাকে কবরস্থ করেছেন নদী থেকে সামান্য দূরে, যেন নদীর শীতল পরশ পায় পৃথিবী শেষের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত।
৪. তোমার জগতের পাশে/ আমার পৃথক জগৎ/ তবু দেখা হয়েছিলো কতবার।/কখনো হয়নি কথা/ বুঝি হয়নি তখনও ভাষার আবিষ্কার।

হাঁটা পত পার হলে : পৃষ্ঠা : ৪৬)
কবির ভুবন সাধারণের ভুবন থেকে অবশ্যই পৃথক। তারা এ-গ্রহের বাসিন্দা হলেও সর্বদা বিচরণ করে কাব্য-ভুবনে। দয়িতার পাশে কবি ভিন্ন এক জগৎ সৃষ্টির প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সেটি হচ্ছে কাব্যিক জগৎ, যা আলোচ্য কাব্যগ্রন্থের কবির তখনও সৃষ্টি করতে পারেনি। তাই তিনি দ্বিধাহীন চিত্তে তার দয়িতার সামনে সাহসের সঙ্গে উচ্চরণ করেছেন, ‘বুঝি হয়নি তখনও ভাষার আবিষ্কার’।

৫. জন্মেছিলো যে মুখ, আছি তারই সন্ধানে,/দেখা হলে বলো তাকে আমার কথা/ আমার পাঁজর থেকে জন্ম নেয়া হে শাশ^ত প্রেম!/ কবিতায় আমি বলে যাই আজ তোমারই কথা।
(টুনটুনি : পৃষ্ঠা :৬৪)
৬. আকাশের নক্ষত্র গুনে গুনে/ পাখিদের গান শুনে শুনে,/ শব্দের মালায় গেঁথেছে যে জীবন,/ তার বাড়ি বানানোর ফুসরত কোথায়?

(আমার বাড়ি তোমার বাড়ি : পৃষ্ঠা : ৬২)
৬. উপত্যকার বৃষ্টি জানে সকল কথন/ সেথায় যে ছড়িয়ে আছে ছেলেবেলা/ ফুটে আছে থোকায় থোকায় ফুলের মতন।
(উপত্যকার বৃষ্টি জানে : পৃষ্ঠা : ৫৭)

৭. হৃদয় জুড়ে নামে অন্তহীন ঢেউ,/ আলোছায়ার অমন লুকোচুরি দেখেনি কেউ।/ স্মৃতির পাতা বেয়ে স্মৃতিরা আসে নেমে/ আগে কিছু নেই, পিছেও নেই কিছু/ শুধু এক পল সময় আছে থেমে।
প্রতিদিন মানুষের মুখে উচ্চারিত শব্দ নিয়ে সহজ ও সাবলীল ভাষায় কবিতা রচনা করেন কবি শামীম হাসান। তার কবিতার অর্থ খুঁজতে অভিধানের সাহায্য নিতে হয় না। রোমান্টিক মনের গভীর প্রদেশে জমাট বাঁধা ভাবনাগুলো কবিতার পঙ্ক্তিতে পঙ্ক্তিতে বিস্তার করেন নিজস্ব ভঙ্গিতে। শাশ^ত প্রেম ও ছেলেবেলা নানা রকমের স্মৃতি ব্যস্ত জীবনের এ-বেলায়ও ফুলের মতন থোকা থোকা ফুটে থাকে সতেজ বিন্যাসে।

কবি শামীম হাসান- এর রোমান্টিক ভাবনায় রচিত ‘ঋতমঙ্গল’ কাব্যগ্রন্থে মনে রাখার মতো অনেক পঙ্ক্তি আছে, যা আজকে পাঠকের ভালো লাগবে আশা করি এবং আবৃত্তিশিল্পীদের আবৃত্তি উপযোগী অনেক কবিতা এ-গ্রন্থে স্থান পেয়েছে।
গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছে ২০১৬ সালে ভাষার মাসে। প্রচ্ছদ এঁকেছেন কবি ও শিল্পী খালিদ আহসান, প্রকাশক টিনটিন, মুদ্রণ ও পরিবেশক খড়িমাটি।

The Post Viewed By: 74 People

সম্পর্কিত পোস্ট