চট্টগ্রাম রবিবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

সর্বশেষ:

৩০ আগস্ট, ২০১৯ | ১:১৮ এএম

ড. মোহীত উল আলম

নজরুলের দারিদ্র-তত্ত্ব

আমাদের যেমন কবি নজরুলের নামে ত্রিশালে অবস্থিত জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় আছে, তেমনি পশ্চিমবঙ্গের আসানসোলে তাঁর নামে আছে কবি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়। সে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক আয়োজিত একটি তিনদিনব্যাপী নজরুল সম্মেলনে আমি আমন্ত্রিত হয়ে উপস্থিত ছিলাম ২০১৬ সালে। সম্মেলনের একটি সেমিনারে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আগত বাংলা বিভাগের জনৈক তরুণ-বয়সী অধ্যাপক একটি খুব চিন্তামূলক প্রবন্ধ পড়লেন। ভদ্রলোকের পাঠ শেষ হওয়া মাত্র দর্শকসারিতে সামনের দিকে বসা একজন প্রবীণ ভদ্রলোক উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “প্রবন্ধকার যে বললেন ‘শৈশবে নজরুল দারিদ্রের তাড়নায় গৃহত্যাগ করেছিলেন’, এই তথ্যটি তিনি কোথায় পেয়েছেন?” ভদ্রলোক হতচকিত হয়ে পড়লেন, এবং সেমিনারের সভাপতির কুশলতায় একটা উপস্থিত বিতর্ক এড়ানো গেল। যিনি প্রশ্নটি করেছিলেন তাঁর সঙ্গে আমার পরে পরিচয় হয়। তিনি নজরুলের ছোট ভাই কাজী আলী হোসেনের বড় ছেলে কাজী মাজহার হোসেন। তিনি এবং তাঁর ছোট ভাই কাজী রেজাউল করিম ঐ সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন। পরে তাঁদের চুরলিয়ার বাসগৃহেও আমরা যাই। শান্ত-স্বস্থ মধ্যবিত্ত পরিবারের ছবি। একটি উঠোন, তার দু’পাশে সাধারণ চেহারার পাকা- বাসভবন। আমরা খুব রুচিশীলভাবে আপ্যায়িত হলাম। নজরুল যে ঘরে জন্মেছিলেন সে খড়ের চালার ঘরটির কিছুটা সংস্কার হলেও বাড়ির পুরোনো আদলটিই রেখে দেওয়া হয়েছে। তাঁদের বাড়ির সামনে একটি শিশুদের স্কুল, নজরুলের ওপর একটি যাদুঘর-ভবন ও একটি পাঠাগার। পাঠাগারটির সংরক্ষণ-পদ্ধতি খুব ভালো। আর বাড়ি থেকে কিছু দূরে বিরাট এলাকা জুড়ে নজরুলের সমাধিস্থান। কবি নজরুল ও প্রমীলা দেবির পাশাপাশি দু’টো পাকা কবর। বলা হলো, ঢাকায় কবি নজরুল যেখানে শায়িত আছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রিয় গোরস্থান, সেখান থেকে এক মুঠো মাটি নিয়ে এখানে নজরুলের কবর পাকা করা হয়।

তবে সারাক্ষণই এই পর্যটনের সময় আমার মনে ঘুরছিলো নজরুলের ছোট ভ্রাতুষ্পুত্র রেজাউল করিম সাহেবের বাসায় দেখা দেয়ালে ঝোলানো একটি আলোকচিত্র। সম্ভবত ১৯৬২ সালের ছবি। কবি নজরুল তাঁর গ্রামের বাড়ি চুরুলিয়ায় এসেছেন, অর্থাৎ তাঁকে আনা হয়েছে, এবং তিনি ফুলের মালা দিয়ে সংবর্ধিত হচ্ছেন। আমরা শুনলাম, নজরুল সে যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যোগদানের জন্য শেষবার বাড়ি ছেড়েছিলেন, তিনি যুদ্ধ থেকে ফেরত এসে একবার মাত্র চুরুলিয়া গেছিলেন, এবং আর কখনো তাঁর চেতন-দশায় বাড়িমুখো হননি। আরেকটি ভার্সন শুনলাম যে নজরুল একবারের জন্যও যুদ্ধ-ফেরত শেষে বাড়ি যাননি। কিন্তু অসুস্থ নজরুলকে মোট দু’বার চুরুলিয়ায় আনা হয়। আরেকবার সম্ভবত ১৯৬৯ সালে।

সে যাই হোক, নজরুলের দারিদ্র-ক্লিষ্ট বাল্যকালের উল্লেখ শুনে নজরুল পরিবারেরই যে একজন নিকট সদস্য আপত্তি করলেন, এটি সঠিক বা বেঠিক সেটা প্রমাণ করার উপায় নেই। তবে নজরুল সম্পর্কে আজহারউদ্দীন খান্ সহ বিভিন্ন জীবনীকারেরা অনেকটা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে নজরুলের বাবা কাজী পরিবারের সন্তান হলেও বৈষয়িকভাবে স্বচ্ছল ছিলেন না, বিশেষ করে তাঁর দু’সংসারের ছেলেমেয়ে নিয়ে তাঁর পাড়ার মসজিদের খাদেমগিরি করে খুব উপার্জন হতো না। তাঁর মৃত্যুর সময় নজরুলের বয়স নয়। নজরুল যে মক্তবে আরো শিশু বয়সে পড়েছিলেন, সে মক্তবে পড়িয়ে, মসজিদের খাদেম হয়ে ঐ বয়সে উপার্জনের কাজে নেমে পড়েছিলেন। আধুনিক সংজ্ঞায় নজরুলকে শিশু-শ্রমিক বলা যায়। পরেতো নজরুল আসানসোলে চায়ের দোকানে রুটি নেচির কাজে ব্যাপৃত ছিলেন, যেখান থেকে তাঁকে পছন্দ করে কাজী রফিজউদ্দিন দারোগা একেবারে ত্রিশাল নিয়ে যান। সেই ত্রিশালেও নজরুল একটি বছর থেকেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী জীবনে পূর্ববঙ্গে ছাব্বিশবার এলেও একবারের জন্যও নজরুল ত্রিশাল যান নি। নজরুলের জীবনযাপনের একটি মোটা স্তর জুড়ে আছে অভিমান, এ অভিমান থেকে তিনি চুরুলিয়া আর ত্রিশাল আর কখনো ঘুরতে আসেননি। “আমি চিরতরে দূরে চলে যাব, তবু আমারে দেব না ভুলিতে” এ গানটিনজরুলের চরিত্রের পরিচায়ক।

আমার বর্তমান লেখাটির খোঁজ হচ্ছে নজরুলের অভিমানের কারণ খোঁজা নয়, যদিও দারিদ্র-স্পৃষ্ট অভিমান মানবচরিত্রের একটি স্বতঃসিদ্ধ দিক। কিংবা দারিদ্রের সঙ্গে তাঁর কেমন পরিচিত ছিল সেটা জানাও নয়, কিন্তু দারিদ্রকে নিয়ে তাঁর চিন্তা-ভাবনাকে বিশ্লেষণমূলক আলোচনা করে বলতে চাইছি যে নজরুল আসলে দারিদ্রের একটি তত্ত্ব দাঁড় করিয়েছিলেন।
নজরুলের দারিদ্র তত্ত্বের আমি দু’টো দিক দেখতে পাই। একটি হলো, তাত্ত্বিকভাবে নজরুল মনে করতেন, যত দারিদ্র তত মাহাত্ম্য। দারিদ্রকে তিনি পরমাত্মীয়স্বরূপ মনে করতেন। “দরিদ্র মোর পরমাত্মীয়” শীর্ষক কবিতার প্রথম স্তবকে বলছেন, “দরিদ্র মোর ব্যথার সঙ্গী, দরিদ্র মোর ভাই; / আমি যেন মোর জীবনে নিত্য কাঙালের প্রেম পাই! / তাহাদের সাথে কাঁদিব, তাদের বাঁধিব বক্ষে মম; / দরিদ্র মোর পরমাত্মীয়, দরিদ্র প্রিয়তম!” দারিদ্রের মধ্যে মাহাত্ম্য খুঁজে পাওয়া, দারিদ্রকে পরমাত্মীয় মনে করা এগুলি হয়তো প্রচলিত সকল ধর্মে ও মানবসভ্যতার আদর্শিক বাতাবরণে কতকগুলি সহজগৃহীত প্রত্যয়। নজরুল “দারিদ্র” শীর্ষক কবিতায় তাই ঘোষণা দিলেন, “হে দারিদ্র তুমি মোরে করেছো মহান।” এর দ্বিতীয় পঙ্ক্তিটি আরো বিস্ময়কর, “তুমি মোরে দানিয়াছো খ্রিস্টের সম্মান।” পবিত্র বাইবেলের বহু পুস্তক-অধ্যায়ে দারিদ্রের গুণগান গাওয়া হয়েছে। মহান যিশু তাঁর প্রথম সারমনে বলছেন, “গরিবেরাই আর্শিবাদিত, কারণ তাদেরটাই হচ্ছে স্বর্গরাজ্য” (ম্যাথু ৫:৩)। খ্রিস্টান ধর্মের অন্যতম প্রবক্তা সন্ত পল বলছেন, “যিশু দারিদ্রকে বরণ করে নিয়েছিলেন, যাতে তাঁর দারিদ্রের বিনিময়ে তোমরা ধনী হতে পারো।” (কোরিন্থিয়ানস) যিশু ক্রিস্টের দারিদ্রকে বরণ করে নেবার মধ্যে কবি নজরুল দর্শন করেছিলেন যেন প্রতিবাদের অঙ্গীকার পাওয়া গেল: “দিয়াছ, তাপস, / অসেঙ্কাচ প্রকাশের দুরন্ত সাহস; / উদ্ধত উলঙ্গ দৃষ্টি ; বাণীক্ষুরধার, / বীণা মোর শাপে তব হ’ল তরবার।” আমার ধারণা, নজরুল দারিদ্রের সঙ্গে শুধু প্রতিবাদের নয়, সত্যেরও নৈকট্য খুঁজে পেয়েছিলেন। অর্থাৎ যত দারিদ্র তত সত্যতা। সে সত্যতাকী? সেটি হলো জগতের বাসস্থান “ধরণী বিলাস-কুঞ্জ নহে”, বরঞ্চ সেটি হচ্ছে “কাঁটা” বিছানো “শয্যাতল” / “তাই এবে র্ক ভোগ।” দারিদ্র কী চায়? দারিদ্র চায় “বিনয়ের ব্যাভিচার” ফেলে “তুমি চাহ নগ্নতার উলঙ্গ প্রকাশ।”

নজরুলের উপরোক্ত “নগ্নতার” দর্শন রবীন্দ্রনাথের ‘সত্য’ দর্শনের সমপর্যায়ের অনুভূতি। নজরুল “দারিদ্র” কবিতাটি লিখেছিলেন ২৪ আশ্বিন ১৩৩৩ বাংলা, অর্থাৎ ১৯৪০-এর মাঝামাঝি সময়ে। রবীন্দ্রনাথ তখন অশীতিপর বৃদ্ধ। এর ঠিক নয় মাস পর রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে বসে “রূপ-নারানের কূলে” শীর্ষক কবিতাটিতে লিখলেন, “সত্য যে কঠিন, / কঠিনেরে ভালোবাসিলাম / সে কখনো করে না বঞ্চনা।” (১৩ মে ১৯৪১)
রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুলের মধ্যে ভাব-চেতনার মিলের কথা এড়িয়ে যাবার উপায় নেই। রবীন্দ্রনাথতো ঈশ্বরবাদি ছিলেনই, নজরুলও দেখা যায় তাঁর অতি প্রতিবাদী কবিতালাপের মধ্যেও আশা করছেন যে একজন মানবত্রাতা যাঁকে তিনি “রাজবন্দীর জবানবন্দী”-তে ভগবান হিসেবে উল্লেখ করেছেন (“কেননা ভগবান আমার সাথে আছেন।”) তিনি এসে দরিদ্রকে উদ্ধার করে মানব-মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করবেন। রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুলের অধ্যাত্মবাদিতা ধর্মের হেরফেরে ভিন্নরকম হতে পারেকিন্তু চরিত্রেতে একই।

কাজেই নজরুলের “দারিদ্র” তত্ত্বের প্রথম দিকটা হচ্ছে নিতান্তই নৈয়ায়িক, অর্থাৎ যত দারিদ্র, তত মহত্ব। এই নৈতিকতায় তিনি বিশ্বাস করতেন।

কিন্তু তাঁর “দারিদ্র” তত্ত্বের দ্বিতীয় দিকটি হচ্ছে পুরোটাই সামাজিক-অর্থনীতির ব্যাপার, যেখানে ধর্ম একটি প্রশ্রয়ধর্মী অনুষঙ্গ হিসেবে কাজ করে। এ দিকটি সংজ্ঞায়িত করতে গেলে দেখা যায় ‘খাদ্য’কেই নজরুল বিরাট মেটাফর বা চিত্রকল্প হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তাঁর সম্পাদিত লাঙ্গল পত্রিকায় প্রকাশিত বহু সমাদৃত “সাম্যবাদী” কবিতাগুচ্ছগুলিকে একত্র করলে পাওয়া যায়, সমাজের প্রতিভূ যারা তাদের বঞ্চনার ফলে গরিব মানুষ তার মৌলিক চাহিদা ‘খাদ্যবস্তু’ থেকে বারণকৃত হয়েছে। ‘খাদ্য’ মেটাফরকে যদি আমরা শারীরিক ভাষায় বলি, তাহলে বলতে হয়, ‘পেট’ বা ‘উদর’ই হচ্ছে নজরুলের দারিদ্র তত্ত্বের ভিত্তি। দুনিয়াটা এই তত্ত্ব অনুযায়ী ‘হ্যাভস’ আর ‘হ্যাভ নটস’-এ বিভক্ত।
এই তত্ত্বের প্রকৃষ্ট কাব্যিক প্রকাশ হয়েছে “মানুষ” কবিতাটিতে। একজন ক্ষুধার্ত ভিখারি, হয়তো সে মুসলমান, কিন্তু সেটি ধর্তব্য নয়; হয়তো সে হিন্দু, কিন্তু সেটিও ধর্তব্যের বিষয় নয়; বরঞ্চ ধর্তব্যের বিষয় হলো, সে মূর্তিমান “ক্ষুধার ঠাকুর” হয়ে যখন মন্দিরে প্রসাদ চাইতে গেল এবং বলল “দ্বার খোলো বাবা, খাইনি ক’ সাত দিন”, তখন মন্দিরের দরজা তার মুখের ওপর বন্ধ হয়ে গেল। একই ভিখারি তখন গেল একটি মসজিদে খাবারের আশায়। এখানে এটা মনে করা কঠিন যে নজরুল দু’জন ভিখারিকে কল্পনা করেছেন, একজন গেছে মন্দিরে (সম্ভবত হিন্দু ভিখারি, ‘পান্থ’) আর আরেকজন গেছে মসজিদে (সম্ভবত মুসলমান ভিখারি, ‘মুসাফির’)। বরঞ্চ আমরা আগেই ইংগিত দিয়েছি, একজনই ভিখারি হবে, তা না হলে “ভুখারি ফিরিয়া চলে, / তিমির রাত্রি, পথ জুড়ে তার ক্ষুধার মানিক জ্বলে!” পঙ্ক্তিদ্বয় দাঁড়াতে পারে না, কারণ ভিখারির খাদ্য-সন্ধানের নিমিত্তে ভ্রমণটাই এখানে মুখ্য। কিন্তু মসজিদেও মোল্লা করল কি নামাজ না পড়ার দায়ে ভিখারিকে তাড়িয়ে দিয়ে “গোস্ত্-রুটি নিয়া মসজিদে দিল তালা।” এই বিপর্যস্ত অবস্থায় ভিখারির সৃষ্টিকর্তার কথা মনে এলো, অর্থাৎ নজরুলের অধ্যাত্মবাদী জিকির জায়গা পেল: “ভুখারি ফিরিয়া চলে, / চলিতে চলিতে বলে- / ‘আশিটা বছর কেটে গেল, আমি ডাকিনি তোমায় কভু, / আমার ক্ষুধার অন্ন তা’ বলে বন্ধ করোনি প্রভু।!
নজরুলের জীবনভর সাধারণ দারিদ্র ছাড়াও তিনি যে বন্দিদশায় হুগলি জেলে এক নাগাড়ে ৩৯দিন অনশনব্রত পালন করেছিলেন, সে অভিজ্ঞতা থেকেও তিনি ক্ষুধার যে শারীরিক বৈকল্য-প্রক্রিয়াগুলো হয় সেগুলির সঙ্গে সম্যক পরিচিত ছিলেন। ক্ষুধার ভয়াবহ রূপ ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি তাঁর অন্যতম উপন্যাস মৃত্যুক্ষুধায়। উপন্যাসের অন্যতম নায়িকা মেজ-বৌএর ক্ষীর রান্নার বর্ণনায় মানব জীবনে খাদ্যের উপযোগিতার কথা ফুটে উঠেছে। ক্ষীরের উৎস হলো দারোগা-গিন্নীর পাঠানো বিড়ালের খাওয়া বাসি দুধ। নজরুলের অতুলনীয় বর্ণনা:

“ক্ষীর-রান্না হয়ে যায়। ছেলেমেয়েরা যে যেখানে যা পায়—থালা, বাটি, ঘটি, বদ্না—তাই নিয়ে উনুন ঘিরে বসে যায়।
“অপূর্ব সেই ক্ষীর! অদূরে দারোগা মির্জা সাহেবের বাড়ি। তাঁরই বাড়ির দুধ বেড়ালে খেতে না পেরে যে-টুকু ফেলে গিয়েছিল, তাই দারোগা-গিন্নি পাঠিয়ে দিয়েছেন এদের বাড়ি। তাঁর অপার করুণা, তাই সে স্বল্প দুধে জল মিশিয়ে আধ-পোয়া দুধকে আধ সের করে ঝি’র হাত দিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছেন। এই না-চাইতেই জল পেয়ে এদের সকলের চোখ দিয়ে যে কৃতজ্ঞতার জল পড়ছে, তা ঐ আধ-সের জলের অনেক বেশি।
“এই ক্ষুধিত শিশুদের আজকের সারাদিনের আহার।
এই তাদের ক্ষীর-পরব-ঈদ্ ।”
এই ক্ষীর-পরবের পাশাপাশিউপন্যাসটির নায়ক আনসার তাঁর বোন বুঁচিকে বোঝাচ্ছেন ক্ষুধা কী ভয়ানক ব্যাপার:
“তুই তো মা, তুই কি বিশ্বাস করবি যে, ক্ষুধার জ্বালায় মা তার ছেলের হাত থেকে কেড়ে খাচ্ছে? নিজের ছেলেমেয়েকে নরবলির জন্য বিক্রি করছে দু-মুঠো অন্নের জন্য? খোদা তোকে সুখে রাখুন, কিন্তু ক্ষুধার জ্বালা যে কী জ্বালা, তা যদি একটা দিনের জন্যও বুঝতিস, তা হলে পৃথিবীর কোন পাপীকেই ঘৃণা করতে পারতিস্ নে।”
ক্ষুধার জ্বালায় মেজ-বৌ যখন ছেলেমেয়ে ফেলে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করে বরিশাল চলে গেছে তখন তার শিশু ছেলে খোকা দাদীর কাছে উপোস থাকতে থাকতে নানা জায়গায় যখন খাদ্যের সন্ধানে ঘুরছে সেসময় রাতের অন্ধকারে গিয়ে পড়ে সে মসজিদের কাছে। দাদি চিৎকার করে ডাকে, “‘অ হান্পে, কোথায় যাচ্ছ্স্ িরে এই অন্ধকারে?’ অন্ধকারের ওপার থেকে উত্তর আসে, ‘ম’জিদে শিন্নি আছে, আনতে যাচ্ছি।’ তাকে “বড়-বৌ , মসজিদের দ্বার থেকে কোলে করে আনতে চায়, সে ধুলায় গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদে। বলে, ‘যাব না, আমি শিন্নি খাব, আমার বড্ড ক্ষিদে পেয়েছে গো! আমি যাব না।’”
ঠিক এর পরের বাক্যে নজরুল অনেকটা “মানুষ” কবিতার অনুরূপ বর্ণনা করলেন চরম এক বক্রোক্তিতে। খোকার ঐ আর্তির পর নজরুল বর্ণনা করছেন: “মসজিদের ভিতর থেকে মৌলবী সাহেবের কণ্ঠ ভেসে আসে। কোরানের সেই অংশ-যার মানে-‘আমি তাহাদের নামাজ কবুল করি না, যাহারা পিতৃহীনকে হাঁকাইয়া দেয়!’ মৌলবী সাহেব জোরে জোরে পাঠ করেন, ভক্তরা চোখ বুজিয়া শোনে!”

নজরুলের দারিদ্র-তত্ত্বের মধ্যে ক্ষুধার সঙ্গে মোল্লা বা পুরোহিতনিয়ন্ত্রিত প্রচলিত ধর্মর্চচার সম্পর্ক এ মেরু-ঐ মেরুর। বস্তুত এভাবেও বলা যায়, নজরুলের দর্শনে ক্ষুধার কাছে ধর্মের উপযোগিতা কেবলই একটি প্রয়োজন-নির্ভর প্রপঞ্চ।প্রয়োজনের বাইরে এর আধ্যাত্মিক উপযোগিতা সম্পর্কে চিরকালের সংশয়ী নজরুল। মানুষেতে ধর্মের উপযোগিতা ঐ পার্থিব চাওয়া-পাওয়ার মধ্যেই শেষ। কিন্তু ধর্মের স্বর্গ-নরক প্রপঞ্চতে নজরুল বিশ্বাসী ছিলেন না। যেমন, “মানুষ” কবিতার আলোকে আমরা বলতে চেয়েছি, ক্ষুধা মেটানোর আশায় নজরুল ভিখারিকে মন্দির থেকে মসজিদ পর্যন্ত ঘুরিয়ে আমাদেরকে দেখিয়েছেন যে মানুষের এই মৌলিক চাহিদার কাছে ধর্মের উপযোগিতা কতটা অপ্রাসঙ্গিক। ঠিক সেরকম মৃতুক্ষুধা উপন্যাসে কাহিনীর অন্যতম চরিত্র মেজ-বৌ যেন ঐ ভিখারিরই সম্প্রসারিত একটি বাস্তব চরিত্র।

মরণাপন্ন সেজ-বৌ আর তার চেয়েও মরণাপন্ন তার কোলের শিশুকে হঠাৎ করে চিকিৎসা দিতে এসেছে “ওমান কাতলি” (রোম্যান্ ক্যাথলিক) গির্জার পাদরি সাহেব এবং নার্স। তাদের চিকিৎসায় সেজ-বৌ আর তার শিশু কেউ না বাঁচলেও রসায়নটা হয়ে গেল অন্য জায়গায়। মেজ-বৌএর ওপর চোখ পড়ল ঐ নার্স মিস জোন্সের। মিস জোন্স মেজ-বৌএর কাছ থেকে কথা নিল যে তার দুই বাচ্চা সহ তারপরের দিন সকালে সে গির্জায় মিস জোন্সের সঙ্গে দেখা করতে যাবে।
মেজ-বৌ আর তার বাচ্চা দু’টোকে মিস জোন্স চা-বিস্কুট দিয়ে আপ্যায়ন করলেও “ক্ষুধার্ত শিশু বিস্কুট হাতে করে মায়ের মুখের দিকে চেয়ে রইল। মেজ-বৌ অষ্ফুটস্বরে বলল, ‘খা।’” অন্যদিকে মেজ-বৌ খ্রিস্টানদের ছোঁয়া মুসলমানদের খেতে নেই বলে নিজে কিছু খেল না।

এর পরপর যখন আনসার মেজ-বৌএর সঙ্গে গির্জার আবাসনে গিয়ে দেখা করতে যান এটা জানতে যে সে কি স্বেচ্ছায় খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করেছে, না কি তাকে জোর করে খিস্টান বানানো হয়েছে, মেজ-বৌ প্রত্যুত্তরে তার ছেলে আর মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে, “এ দু’টোই আমার শত্রু। এখানে এসে তবু দু-বেলা দুটো খেতে পাচ্ছি! ওদের উপোস করা সহ্য করতে না পেরেই আমি এখানে এসেছি।”

বিধবা মেজ-বৌএর রূপের ঝলক আর কথার চমকে পুরুষমাত্রই তার প্রেমে পড়ছে এরকম মনে হলেও, মেজ-বৌও সহজে পর পুরুষের প্রতি আকর্ষিত হয়। উপন্যাসের শুরুতে তার দেবর, উঠতি বয়সের যুবক প্যাঁকালের প্রতি তার মন নরম থাকে, অন্তত প্যাঁকালের সঙ্গে ঠাট্টা মশকরার ভিত্তিতে তাই মনে হওয়া স্বাভাবিক। অন্যদিকে তার শাশুড়ি অর্থাৎ গজালের মা মেজ-বৌকে প্যাঁকালের সঙ্গে বিয়ে দিতেও মনস্থ করেন, যেটি প্যাঁকালের প্রবল বিরোধিতায় শেষ পর্যন্ত বাস্তবে রূপ নেয়নি। অন্যদিকে আনসারের সঙ্গে কথাবার্তার সময় বোঝা যায় দু’জন দু’জনের প্রতি সমভাবে আকর্ষিত হয়েছেন। তাই, আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, মেজ-বৌ যখন মিস জোন্সের তাগিদে বরিশালে চলে যেতে মনস্থ করে, তখন সে ছেলেমেয়ে দুটোকে সঙ্গে নেয় না। কাঠামোগত দিক থেকে দেখলে উপন্যাসের এটি একটি বড় দুর্বলতা, কিন্তু বিষয়গত দিক থেকে দেখলে, এটির ব্যাখ্যা এমন হতে পারে যে মেজ-বৌ নিজে খ্রিস্টান হয়ে ‘নাসারা’ হয়ে গেলেও ছেলেমেয়ে দুটোকে সেদিক থেকে মুক্ত রাখতে চায়। বরিশাল চলে যাওয়ার পেছনে আরেকটি কারণ হলো আনসার যেহেতু কৃষ্ণনগরে থাকবেন না, মেজ-বৌও থাকবে কেন?: “কান্না-কাতরকণ্ঠে সে বলে উঠল, ‘যাবেই যদি তবে এ ঋণের বোঝা চাপিয়ে যেয়ো না। আমিও কাল চলে যাই, তুমিও চলে যাও।’” নজরুল-জীবন ভিত্তিক একটা ব্যাখ্যাও এখানে দেওয়া যায়। নজরুল-জীবন নিয়ে একটি চাপা তত্ত্ব আছে যে নজরুলের নিজের মা জাহেদা খাতুনের সঙ্গে নৈকট্যের বদলে অভিমান-ভরা সম্পর্ক ছিল। তাঁকে অনশন ভাঙাতে তাঁর নিজের মা পারেননি, পেরেছিলেন চাচী-শাশুড়ি বিরজাসুন্দরী দেবি। মেজ-বৌ এর সঙ্গে সন্তানদের আপাত বিচ্ছেদ সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়।
আনসার আর মেজ-বৌএর মধ্যে শেষ দেখা হয় রানাঘাট স্টেশনে। তখন আনসার “শৃক্সক্ষলাবদ্ধ প্রহরী-বেষ্টিত” অর্থাৎ গ্রেপ্তারকৃত, আর মেজ-বৌ বরিশালগামী। আর যখন “ট্রেন এসে পড়ল, আনসার দেখতে পেল, ইঞ্জিনের অগ্নিচক্ষুর মতই অদূরে দুটি চক্ষু জ্বলছে। মৃত্যু-ক্ষুধার মত সে চাউনি জ্বালাময়, বুভুক্ষু, লেলিহান। সে চোখে অশ্রু নাই, শুধু রক্ত।”
মেজ-বৌএর আনসারের জন্য এই তাৎক্ষণিক জেগে ওঠা প্রেম, এবং তার পরিসমাপ্তি সহসাই হয়ে গেল, দুজনের ভাগ্য দু’ভাবে নির্ধারিত হওয়ার কারণে। মেজ-বৌএর বরিশাল বাসের প্রথম বছর যেতে না যেতেই সে অমোঘ চিঠিটি গজালের মায়ের তরফ গেল যে খোকা গুরুতর অসুস্থ, বাঁচে কি না-বাঁচে ঠিক নেই। মেজ-বৌ পড়ি কি মরি করে ছুটে আসে। অবশ্য তখন সব শেষ। বাড়িতে ঢুকে মেজ-বৌ ডাক দিল, “খোকা, আমার খোকা কই?” প্রত্যুত্তরে বড়-বৌ “চিৎকার করে কেঁদে উঠল, ‘রাক্ষুসী, এতদিনে এলি! খোকা নেই! কাল সকালে সে চলে গেছে!’”
খোকার মৃত্যুর চল্লিশার দিন মেজ-বৌএর হঠাৎ খেয়াল হলো সে পাড়ার সকল “ছোট ছোট খোকাদের ডেকে নিজে রেঁধে খাওয়াবে।” কিন্তু সে খ্রিস্টান, তার হাতের রান্নাতো কেউ খাবে না। মোড়ল সে কথা বলাতে, মেজ-বৌ ডুকরে কেঁদে উঠে বলল, “আমি আজই মুসলমান হব! আমার খোকার আত্মা যেন চিরকালের ক্ষুধা নিয়ে না ফিরে যায়।”
আপাত দৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে নজরুল যেন মেজ-বৌ বা প্যাঁকালের (যে নিজেও এরি মধ্যে তার খ্রিস্টান স্ত্রী কুর্শিসহ পুনরায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে কারণ খানবাহাদুর সাহেব তাকে একটা কুড়ি টাকার চাকরি পাইয়ে দিয়েছে।) ধর্মান্তরিত হয়ে আবার নিজ ধর্মে ফিরে আসা দিয়ে বলতে চাইছেন নিজ ধর্ম অন্য ধর্মের চেয়ে উত্তম। বা এভাবেও দেখা যায় যে ব্রিটিশ সা¤্রাজ্যবাদের অন্যতম একটি নীতি ছিল অধিকৃত জনগোষ্ঠীকে, বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, যেমন যারা সংখ্যালঘু ও দরিদ্র, তাদেরকে খিস্টান হিসেবে ধর্মান্তরিত করা। মেজ-বৌ আর প্যাঁকালের পুনরায় নিজ ধর্মে ফিরে আসার মধ্যে নজরুল হয়তো ব্রিটিশ সা¤্রাজ্যবাদের ধর্মান্তকরণ প্রচেষ্টার অসারতা প্রমাণ করলেন। কিন্তু আমার কাছে মনে হয় ইংগিতটা আরো গভীর। নজরুল বলতে চান যে পেটের ক্ষুধার কাছে ধর্মান্তর হওয়া বা আবার নিজ ধর্মে ফিরে আসা কোনটাই গুরুত্বপূর্ণ নয়। ক্ষুধা মেটানোটাই আসল ব্যাপার। ধর্ম মানুষের প্রয়োজনকে নির্দিষ্টভাবে মেটাতে পারে না, মানুষের প্রয়োজনই ধর্মের ব্যবহারকে নির্দিষ্ট করে। মেজ-বৌ দারিদ্র থেকে মুক্তির এক প্রয়োজনে খ্রিস্টান হয়ে গিয়েছিলো, আবার সে খোকার মৃত্যুতে প্রায়শ্চিত্ত করতে গিয়ে আরেক প্রয়োজনে মুসলমান হয়ে গেল। ঠিক “মানুষ” কবিতার ভিখারিটির মতো, যে ক্ষুধা মেটানোর প্রয়োজনে নিষ্ফলভাবে মন্দির থেকে মসজিদে ঘুরে গেল, আর অনুরূপভাবে মেজ-বৌ মসজিদ থেকে গির্জা, আবার গির্জা থেকে মসজিদে ফিরে এলো, নিজের ক্ষুধা মেটানোর জন্য না হলেও অন্যের ক্ষুধা মোটানোর জন্য। ভিখারিটির জন্য যেমন মন্দির বা মসজিদ নিজের প্রয়োজনের বাইরে প্রাসঙ্গিক নয়, মেজ-বৌএর কাছেও গির্জা বা মসজিদ কোনটিই নিজের প্রয়োজনের বাইরে প্রাসঙ্গিক নয়। সে প্রয়োজনটি কী? সেটি হলো ক্ষুধা মেটানো। অর্থাৎ নজরুলের দারিদ্র-তত্ত্বের গোড়ায় নিহিত আছে ধর্মের প্রাসঙ্গিকতা নয়, বরঞ্চ ধর্মের অপ্রসাঙ্গিকতা। এটিই তাঁর অসাম্প্রদায়িকতার ভিত্তি: “গাহি সাম্যের গান- / মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।” কিংবা “মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান।”
দারিদ্র মেজ-বৌকে খোকাকে হারাতে বাধ্য করেছে, আবার সেই দারিদ্রই তাকে মহান করেছে। তখন নিজের খোকাকে হারিয়ে আবার সব খোকাদের মাঝে সে খোকাকে ফিরে পেয়ে মেজ-বৌএর মানসিক স্তর এমন উন্নত পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে তখন সে রুবিকে পর্যন্ত উপদেশ দিতে পারে যে রুগ্ন আনসারকে দেখার জন্য তার সেদিনই ওয়ালটেয়ারে চলে যাওয়া উচিত।
মেজ-বৌ বলে: “কিন্তু আজ আমাকে নিয়ে আর আমার কোন ভয়-ডর নেই। খোকাকে যদি না হারাতাম, এই খোকাকে যদি না পেতাম, তাহলে আমি সব-আগে গিয়ে তাঁকে সেবা করে ধন্য হতাম।” “রুবি মেজ-বৌর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলে উঠল, ‘অর্থাৎ তুমি রুবি হলে এতক্ষণ বেরিয়ে পড়তে।’” “মেজ-বৌ হেসে ফেলে বললে, ‘হুঁ। তাই।”
মেজ-বৌএর কোন “ভয়-ডর নেই” কারণ দারিদ্রের শিক্ষা তাকে করে তুলেছে মহান।
নজরুলের দারিদ্র-তত্ত্ব নিয়ে আমরা এর আধ্যাত্মিক অবস্থান ও পার্থিব অবস্থানের দ্বি-মুখীনতা নিয়ে আলাপ করেছিলাম। কিন্তু মেজ-বৌএর চরিত্রের মধ্য দিয়ে এই বৈপরীত্যেরই একটি সমন্বিত রূপ ফুটে উঠেছে। একদিকে সে দারিদ্রের নির্মম কশাঘাত সইয়েছে, অন্যদিকে সে কশাঘাত সইয়ে সে বুঝতে পেরেছে দারিদ্রের শিক্ষা হলো নিজের দু:খের বিনিময়ে অপরের দুঃখকে সুখে পরিণত করা। সন্ত পলের মহান যিশু সম্পর্কে সে কথাটি আবার ফিরে আসছে, “যিশু দারিদ্রকে বরণ করে নিয়েছিলেন, যাতে তাঁর দারিদ্রের বিনিময়ে তোমরা ধনী হতে পারো।”
“হে দারিদ্র তুমি মোরে করেছো মহান। / তুমি মোরে দানিয়াছো খ্রিস্টের সম্মান।” এবং কথাটি শেষ হচ্ছে “কণ্টক-মুকুট শোভা” দিয়ে। যীশুর মতো মেজ-বৌও সেই “কণ্টক-মুকুট” পরেছে, এবং তাই রুবি মেজ-বৌকে উদ্দেশ করে বলছে, “তোমার আর ভয় নেই। তুমি ভয়ের সাগর উৎরে গেছ।”

The Post Viewed By: 262 People

সম্পর্কিত পোস্ট