চট্টগ্রাম রবিবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

সর্বশেষ:

৩০ আগস্ট, ২০১৯ | ১:১৭ এএম

ড. মুহাম্মদ কামাল উদ্দিন

জাতীয় কবি নজরুলের অর্থনৈতিক চিন্তা

পেট-পোরা তার রাক্ষসী ক্ষুধা
ধনিক সে নির্মম
দীনের রক্ত নিঙাড়িয়া করে
উদর ভুধর-সম।’

ভাষাভঙ্গি ও চেতনাবোধের দিক বিবেচনায় উল্লেখিত উক্তিগুলো আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুলের মনে না হলেও প্রকৃত অর্থে উক্তিগুলো তাঁর। জাতীয় অর্থনীতির মুক্তি এবং ধনিক শ্রেণীর মানুষের শোষণ আর বঞ্চনার প্রতিবাদে নজরুল এমন উক্তি করেছেন। অর্থনীতি যে কোন সমাজের মূল নিয়ন্ত্রক শক্তি এই বিষয়টিকে যেমন তিনি ব্যক্তি জীবনে উপলব্ধি করেছেন তেমনি নাগরিক সমাজে ও তার প্রতিফলনের চেষ্টা করছেন এমনটি বুঝাবার জন্য এই উক্তি করা হয়েছে। উৎপাদন-সর্ম্পক ও উৎপাদনের প্রক্রিয়া শ্রমিক শ্রেণীর হাতে না থাকলে রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্থহীন হয়ে পড়ে। তাই জাতীয় মুক্তির প্রধান হাতিয়ার হিসাবে নজরুল মানুষের ২টি পথ আবিস্কার করেছেন-
০১। রাজনৈতিক স্বাধীনতা
০২। অর্থনৈতিক মুক্তি।
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি ব্যতিত কোন প্রকারেই মানুষের প্রকৃত মুক্তি হতে পারে না এটি কবি খুব কাছে থেকে বুঝতে পেরেছেন। প্রকৃত অর্থে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসন ও তার সহযোগী দেশীয় সামান্ত শোষণের যথার্থ স্বরূপ তিনি প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় উপলব্ধি করেছেন। যারফলে কবি মানুষের মুক্তির ঠিকানা হিসাবে এই দুইটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েছেন। অপরদিকে কবি সমকালীন বিশ্বের স্বরূপ দেখেছেন সংগ্রামশীল জাতীয়তাবাদের উথান, রুশ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ও শ্রমিক শ্রেণীর জাগরণ তার মনে ইতিবাচক প্রভাব বিস্তার করেছে। যারফলে কবি শোষণমুক্ত অর্থনীতি ব্যবস্থার পক্ষে ও সাম্যবাদী অর্থব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দাবী জানিয়েছেন। তিনি চেয়েছেন একটি শোষণমুক্ত ও সম্পদের সম বণ্টনের অর্থনীতি। লাঙ্গল, সাম্যবাদী, গণবাণী ও সর্বহারা পর্যায়ে নজরুলের অর্থনৈতিক চিন্তার প্রকাশ মিলে।
শ্রমিক-প্রজা-স্বরাজ-সম্প্রদায়ের ইস্তেহার নজরুলের দস্তখতে প্রকাশিত হয়। সংগঠনের অন্যান্য নেতার সম্মতি সাপেক্ষে তিনিই এ ইস্তেহার রচনা করেন। এই ইস্তেহারে ঘোষিত অর্থনৈতিক চিন্তা নজরুলের অর্থনৈতিক চিন্তা হিসাবে বিবেচনা করা হয়। কারণ, উত্তরকালে তাঁর সাহিত্য কর্মে এ চিন্তারই শিল্পিত বিন্যাস ঘটেছে। শুধু এইটুকুতে শেষ নয়, পাটির মূখপাত্র লাঙল ও গনবাণীতেও এ অর্থনৈতিক চিন্তা গাঢ় বর্ণে বিধৃত হয়েছে। সংগঠনের ইস্তেহারের চরমদাবী অংশে বলা হয়েছে-
০১। ‘আধুনিক কলকারখানা, খনি, রেলওয়ে, টেলিগ্রাফ, ট্রামওয়ে, সঈমার প্রভৃতি সাধারণের হিতকারী জিনিস লাভের জন্য ব্যবহার না হইয়া দেশের উপকারের জন্য ব্যবহার হইবে এবং এতৎ সংক্রান্ত কর্মীগণের তত্ত্বাবধানে জাতীয় সম্পত্তিরূপে পরিচালিত হইবে।’
০২। ‘ভূমির চরম স্বত্ব আত্ন-অভাব পূরণ ক্ষয় স্বায়ত্ত-শাসন-বিশিষ্ট পল্লীতন্ত্রের উপরে বর্তিবে। এই পল্লীতন্ত্র ভদ্র শুভ্র সকল শ্রেণীর শ্রমশ্রেণীর হাতে থাকিবে।’
পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় ধূর্ত ও শক্তিমান লোকগুলো শ্রমিক শ্রেণীকে নিমর্মভাবে শোষণ করে সম্পদের পাহাড় গড়ে। পুঁজিবাদী সমাজও শোষণের ঐ নগ্ন লপচ্ছবি তাঁর কাব্যে এভাবে প্রোৎকীর্ণ হয়েছে-
‘রাজার প্রাসাদ উঠিছে প্রজার জমাট রক্ত ইটে,
ডাকু ধনিকের কারখানা চলে নাশ করি কোটি ভিটে।
দিব্যি পেতেছে খল কলওলা মানুষ পেষানো কল
আখ-পেষা হয়ে বাহিরে হতেছে ভ’খারী মানব-দল।’
কবি সাধারণ মানুষের পক্ষে বার বার এভাবে জেগে উঠেছেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল সর্বহারা ও নিম্নশ্রেণীর খেটে-খাওয়া মানুষেরা একদিন অবশ্যই জেগে উঠবে। তাই এভাবে কবি নানা কবিতা ও গানের মাধ্যমে কৃষক ও শ্রমিক শ্রেণীকে জাগিয়ে তোলার প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়েছেন। সর্বহারা, কৃষাণের গান, শ্রমিকের গান, ধীবরদের গান, ছাত্রদলের গান, অন্তর-ন্যাশনাল সঙ্গীত বা চাষার গান প্রভৃতি বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য। আর এই গান ও কবিতা গুলোর মাধ্যমে কবির সাম্যবাদী চিন্তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। তিনি শোষক চিহ্নিত করেছেন তাদের চরিত্র অংকন করেছেন, শোষণ প্রক্রিয়া তুলে ধরেছেন এবং সাথে সাথে শ্রমজীবি মেহনতি মানুষকে অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অবতীর্ণ হবার শ্রেণীসচেতন আহবান জানিয়েছেন। শোষক শ্রেণীকে তিনি জোঁক, রাবণ ও এজিদের সঙ্গে প্রতিউপমিত করেছেন। শোষকরা জোঁকের মত রক্ত শোষা এবং রাবণের সীতা হরণের মতো কৃষকের সম্পদ হরণ করেন।
এই শোষণ বা লুণ্ঠনে পুঁজিপতিরা এজিদের মতো নির্মম, নিষ্ঠুর। এই সব বক্তব্যের মাধ্যমে কবি মানুষকে সচেতন করার প্রাণপন চেষ্টা করেছেন। সাম্যবাদী অর্থব্যবস্থা সর্বসাধারণের গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্যে তিনি ধর্মের শিক্ষা তুলে ধরেছেন-
‘ইসলামে নাই ছোট বড় আর
আশরাফ আতরাফ,
এই ভেদ জ্ঞান নিষ্ঠুর হাতে
করা মিসমার সাফ।’
ভারতবর্ষে বিশেষত বাংলাদেশের অধিকাংশ মুসলমান ছিল অশিক্ষিত ও ধর্মভীরু। সে কারণে ইসলাম ধর্মের সাম্যবাদী দর্শনের দিকে মুসলমানদের দৃষ্টি আকর্ষণের প্রয়োজন ছিল। এই বাস্তবতাকে উপলব্ধি করে তিনি দূরদৃষ্টির পরিচয় দিয়েছেন। তিনি বরাবর লক্ষ করেছেন জমিদাররা কৃষকের অর্থ শোষণ করে শহরে গিয়ে আনন্দুৎসবে থাকে আর গ্রামে তাদের গোমস্তারা সাধারণ কৃষকের উপর নানা অত্যাচার নিপীড়ন চালায়। জমির সঙ্গে জমিদারের কোন সর্ম্পক নাই, গোমস্তারা তাদের জমি দেখা-শোনা করে। আবার উৎপন্ন ফসলেও নেই কৃষকের ন্যায্য অধীকার। জমিতে কৃষকের সঠিক অধিকার না থাকায় কৃষকও কৃষিতে মনোযোগ দিচ্ছে না। ফলে কৃষি কাজে দারুণ প্রভাব পড়ছে যা দেশের অর্থনীতির জন্য হুমকি স্বরূপ।
শ্রেণী-দৃষ্টিকোণ থেকেই তিনি শোষক ও শোষিতের সর্ম্পক লক্ষ্য করেছেন। তাই তাঁর কাছে স্বদেশী শোষকে বা স্বধর্মী শোষকে ও বিদেশী শোষকে বা বিধর্মী শোষকে কোনো পার্থক্য নাই বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। জাত-ধর্ম-বর্ণ-দেশ নির্বিশেষ সকল শোষকের চরিত্র এক। তারা শ্রমিক শ্রেণীকে পাশবিক প্রক্রিয়ায় শোষণ করে। এ জাতীয় শোষক গোষ্ঠীর প্রতি তাঁর ঘৃণা, দ্রোহ ও অভিসম্পাত-
‘…….যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস,
যেন লেখা হয় আমার রক্ত লেখায় তাদের সর্বনাশ।’
নজরুলই একমাত্র প্রতিবাদী কবি হিসাবে সেই সময় এই জাতীয় শোষক শ্রেণীর বিরুদ্ধে জেগে উঠেন। তিনিই প্রশ্ন করেন এভাবে আর কত অত্যাচার আর নির্যাতন চলবে? আমরা কী তাহলে আমাদের অধিকার ফিরে পাব না? তাই শোষক শ্রেণীকে উদ্দেশ্য করে কবি বলেন,
‘ইহাদের লোভ নিরন্ন দেশবাসী করিবে না ক্ষমা,
বহু আক্রোশ বহু প্রহরণ আছে জমা।’
এভাবে সর্তক করেন শোষক শ্রেণীকে। অত্যাচার থামানোর কথা বলেন। তিনি-
‘‘শোন অত্যাচারী ! শোনরে সঞ্চয়ী
ছিনু সর্বহারা হব সর্বজয়ী।’
ঈদুল ফিতর নাটিকায় সঞ্চয়ী মনোভাবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী লেখা উচ্চারিত হয়। এখানে তিনি এক কৃপণ, নির্দয় ও সঞ্চয়ী জমিদারের চরিত্র তুলে ধরেছেন। সে কৃষক নামাজ রোজা করলেও ফেতরা, সাদকা বা জাকাত দিতেন না। কবি লিখেন এভাবে,
‘ইসলাম বলে সকলের তরে মোরা সবাই
সুখ-দুঃখ সব ভাগ করে নেব সলে ভাই,
নাই অধিকার সঞ্চয়ের।’
পৃথিবীতে সকলের সম-অধিকার ও মর্যাদা থাকবে কিন্তু নাই। ফলে এখানে কেউ শোষক কেউ শোষিত, কেউ ধনী আবার কেউ গরীব। এই চিত্র বুর্জোয়া সমাজ ব্যবস্থার। এই ব্যবস্থাকে কবি এক অদ্ভুদ ব্যবস্থা হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন। নজরুল সকল সময় চেয়েছেন সম্পদের সুষম বণ্টন। পুঁজিবাদী সমাজকে ভেঙে একটি শোষণ মুক্ত সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন। আর এই অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম কবি সারাটা জীবন চালিয়েছেন। এখনও কবির এই শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার বক্তব্য ও লেখনি সাধারণ মানুষের মুক্তির পথে উৎসাহ যোগায়। যুগে যুগে যারা মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য সংগ্রাম করেছেন তাদেরই একজন কবি নজরুল ইসলাম অন্যতম। তাই এই অবস্থার উত্তরণে সকলের সহযোগিতা চেয়ে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন এভাবে-
‘এ আশা মোদের দুরাশারও নয়, সেদিন সুদূর নয়-
সমবেত রাজ কণ্ঠে যেদিন শুনিব প্রজার জয়।’

The Post Viewed By: 96 People

সম্পর্কিত পোস্ট