চট্টগ্রাম রবিবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

সর্বশেষ:

২৩ আগস্ট, ২০১৯ | ১:০০ এএম

বিটুল দেব

কবি সাজিদুল হকের চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ

আততায়ীর অপেক্ষায়

আততায়ীর অপেক্ষায়

প্রচ্ছদ : কাজী যুবাইর মাহমুদ
প্রকাশক : তৃতীয় চোখ
প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি ২০১৯
মূল্য : ১৮০ টাকা

কবিদের কবি জীবনানন্দ যেমন বলেছেন- সকলে কবি নয় কেউ কেউ কবি। ঠিক তেমনি সকলে পাঠক নয়, কেউ কেউ পাঠক। অনেক প্রবীণ সাহিত্যিকের মুখেও শোনা যায় বর্তমান কবিতার যুগ নয়। গল্প-উপন্যাসের যুগ। কথার বিপরীতে একদল কবিরা বলেন- কবিতার পাঠক নির্দিষ্ট পরিসীমায় হয়ে থাকে। যার কারণ, কবিতা পাঠে যে প্রজ্ঞা, রুচিবোধ এবং উন্নত মেধার প্রয়োজন তা সকল শ্রেণী পাঠকের থাকে না। তাই বলে কবিতার পাঠক কম। যে পাঠকের চিন্তা, চেতনা ও বোধ শক্তির অভাব, তার কবিতা বুঝে উঠাও অসম্ভব হয়।

কবি ও প্রাবন্ধিক সাজিদুল হক সাহিত্য সমাজে অন্যতম এক নাম। তবে তিনি অন্যান্য কবি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এবং প্রচার বিমুখ।
বর্তমানে অনেক কবি ফেসবুকে কবিতা লেখে না। আবার অনেক কবি ফেসবুকে কবিতা লেখে নিজের কাব্যতরুকে জানান দেয়। যারা লেখে না, তারা মূলত বলেন ফেসবুক থেকে কবিতা চুরি হয়ে যায়। কিন্তু কবি সাজিদুল হক বলেন চোরের কাজ চুরি করবে। তাই বলে কি আমরা কবিতা লেখবো না ? কবির ফেসবুকে দৈনিকের সাময়িকীতে নতুন নতুন কবিতা পাঠের সুযোগ করে দেন।

সবুজ আড্ডায় সাহিত্যের সকল বিষয় নিয়ে খুঁটিনাটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা কবির মুখ থেকে বেশি শোনা যায়। সমাজ ও আদর্শ রাজনীতির কথাও তুলে আনে ইতিহাসের পটভূমি থেকে। সম্পাদনা করেন চট্টগ্রামে ‘সবুজ আড্ডা’ নামে সাহিত্যের কাগজ। তিনি আরো সম্পাদনা করেছেন সুদর্শনচক্র এবং জোড়াসাঁকো ( যৌথভাবে)।
অন্যকোনো সুরঞ্জনা (তৃতীয় চোখ-২০১০) প্রথম কাব্যগ্রন্থ দিয়ে গ্রন্থ প্রকাশের সূচনা। দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ মহলের উল্টোদিকে (তৃতীয় চোখ-২০১২)। তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ নাটোরের মির্জাকন্যা (শাঁখ-২০১৫)। এবারের বই মেলায় কবি হাজির হয়েছেন ‘আততায়ীর অপেক্ষায়’ নামক চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ নিয়ে। মহলের উল্টোদিকে এবং নাটোরের মির্জাকন্যা বেশ সাড়া ও সুনাম অর্জন করেছে পাঠক মহল থেকে এবং আস্থা তৈরি করেছেন কবিতার শক্তি দ্বারা।
এবার পাঠ করা যাক আততায়ীর অপেক্ষায় গ্রন্থের প্রথম কবিতা-
গলির প্রবেশ মুখে কাকাবাবুর বইয়ের দোকান। কেটে যেত সময় বই বিক্রির ব্যস্ততায়। আসা যাওয়ার পথে আমিও নজর দিতাম বইয়ের ভাঁজে ভাঁজে। কেবলি কবিতার গন্ধে ছুটে গিয়েছি কাকার দোকানে, এমন অনুরাগ শতভাগ সত্য নয়। মাথায় ভিতরে পোকা জ¦ালায় সংরাগের আগুন। অন্য এক আহ্বান ছিলো নীরবতা ভেঙে। রাগিণীর জন্য ভুলে যেতাম বাসায় ফিরবার কথা। বালিকা কন্যার খুশবোয় মাতাল হাওয়ায় নেচে নেচে অস্থির তারুণ্য। অবদমনে মরে হাজার স্বপ্নের আহাজারি। কাকার প্রশ্রয়প্রাপ্ত আমি কতোবার নিয়ে এসেছি প্রিয় বইটি। ফিরছিলাম সন্ধ্যায়, নজরে পড়েনি কাকার উজ¦ল মুখ। বন্ধ বইয়ের দোকান ঘিরে রেখেছে প্রাচীন অন্ধকার। মরুভুমিতে ওঠেনি ঝড়, মেঘ দেখেনি কেউ ঈশানে। কাকাবাবু নিরুদ্দেশ! প্রতিবেশী কেউ বিস্মিত নয় নিরঞ্জন কাকার রাতারাতি অন্তর্ধানে। উপমহাদেশের মানুষ জানে, উদ্বাস্তু এরা বেরিয়ে পড়ে ইতিহাসের সন্ধিকালে। অধিক আলোর সন্ধানে। ত্রিভুবনের কোথাও হয়তো খুঁজে পাবে নিজেকে। (অন্তর্ধান, পৃষ্ঠা : ০৯)
টানা গদ্যকবিতার ভেতর ফুটিয়ে তুলেছেন কাকাবাবুর বইয়ের দোকানের অসাধারণ চিত্রগল্প। কবিতায় কবি বই বিক্রেতা কাকাবাবুর বয়ানে আরো ফুটিয়ে তুলেছেন এক কবিতা প্রেমিকের কথা। কবিতা পাঠের ঘোর নেশা কেটে পড়েছে তরুণ-তরুণীর প্রেমে। হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায় কাকাবাবুর দোকান। বই প্রেমিকের হৃদয়ে নেমে আসে অন্ধকার এবং কোথাও খুঁজে পায় না কাকাবাবু বইয়ের দোকানের মতো আলো।
আমি অন্ধকারের শরীর ব্যবচ্ছেদে

পেলাম দুই অক্ষর
ভয় !
অস্তিত্বের আরও গভীরে যাই
আবারও পেয়েছি দু’টো অক্ষর
মৃত্যু !
মানুষ এক জীবনে শেখে শুধুই
ভয় আর মৃত্যুর ব্যাকরণ।
(ভয়ের ব্যাকরণ, পৃষ্ঠা : ৫৩)
আলো এবং অন্ধকার একে অপরকে পরাজয়ে মত্ত থাকে। অন্ধকার এমনই ভয়ংকর সে প্রবেশ করে নিষিদ্ধ সীমানায়। কবি সহজ সরল বাক্যকে ভয় এবং মৃত্যুকে বণর্না করেছেন চমৎকার দুইটি অক্ষর দ্বারা।
অন্ধকারের আছে কোমল এক শরীর
তাকে দেখে না নিঃসঙ্গ মানুষ
শুভ্র মানুষ জন ফিরছে প্রার্থনা শেষে
নিশিপদ্ম আঁচলে বাঁধে সারারাতের বেদনা
সেতারে তোলা বেসুরো অস্ফুট আর্তনাদের
অদৃশ্য সাক্ষী ফজরের আজান।
প্রত্যুষে শ্রাবণের আকাশে নেই জলের ইশারা
শিকারির রক্ত পিপাসা করেছে অভিমানি
আমি সহ¯্র শতাব্দী আততায়ীর অপেক্ষায়।
(আততায়ীর অপেক্ষায়, পৃষ্ঠা : ১৩)
‘আততায়ীর অপেক্ষায়’ শিরোনামে এই কবিতা। আততায়ীর শব্দের অভিধানিক অর্থ হচ্ছে গোপনে হত্যাকারী অর্থাৎ আড়াল থেকে যে খুন করে। সমসাময়িক বাস্তব একটি কবিতা। এক সাথে আড্ডা হয়। কিন্তু গোপনে ফাঁদ পাতে বিপদে ফেলতে। এমন শিকারির অভাব নেই। আশে পাশে প্রতিবেশি আপন জনের ভেতর।
পরীক্ষিত বন্ধু;
তুমিই জ¦ালিয়ে রেখেছো
সন্দেহের চেরাগ
(ছায়ার সাথে যুদ্ধ, পৃষ্ঠা : ৩৭)
এমন অপ্রিয় সত্য বুলিতে লিপিবদ্ধ করেছে প্রতিটি কবিতায়। সমাজিক দায়বদ্ধতা কবিকে খুবই ভাবের জগতে মগ্ন রাখে। আর এই ভাবনা থেকে কবিতার সূচনা ও কবিতার সূত্রপাত। উত্তরাধুনিক সাহিত্য আন্দোলনের সাথেও কবি যুক্ত ছিলেন। উপরোক্ত সামান্য আলোচিত কবিতাগুলো ছাড়া আরো রয়েছে ৭২টি পৃষ্ঠায় ৬২টি কবিতা। কবিতাগুলো পাঠ করে ঠকবেন না এটাই বিশ^াস। জানতে পারবেন নতুন বিষয়বস্তুর নতুন ভাবদ্বারা। বইটি কবি উৎসর্গ করেছেন- আম্মা’কে। কবির জন্য এবং কবিতার জন্য শুভকামনা।

The Post Viewed By: 173 People

সম্পর্কিত পোস্ট