চট্টগ্রাম শনিবার, ১৪ ডিসেম্বর, ২০১৯

৯ অগাস্ট, ২০১৯ | ১:২০ পূর্বাহ্ন

সোহেল হাসান গালিব

রবীন্দ্রনাথের এলিয়ট অনুবাদ

রবীন্দ্রনাথ ও এলিয়টের সাক্ষাৎ হয় ১৯২২ সালে, আমেরিকায়, এলিয়টের শিক্ষক জনৈক উড্স্ সাহেবের বাসায়। [ উৎস : রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর বিদেশি বন্ধুরা/ বিনায়ক সেন ]
কিন্তু সেন মশাই একটু গোলমাল করে ফেলেছেন। কারণ ১৯২২ সালে রবীন্দ্রনাথ আমেরিকায় ছিলেন না, ছিলেন ভারতে। টি এস এলিয়টও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাট চুকিয়ে চলে এসেছেন বিলাতে। এখানে উল্লেখ করা দরকার, রবীন্দ্রনাথ মোট ৪ বার আমেরিকা গিয়েছিলেন ১৯১২-১৩, ১৯১৬-১৭, ১৯২০-২১ এবং ১৯৩০ সালে। [উৎস : রবীন্দ্রজীবনী/ প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়]
আমার ধারণা তাদের সাক্ষাৎ হয়েছিল ১৯১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। এক সান্ধ্য আড্ডায় রবীন্দ্রনাথ হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারতীয় দর্শনের অধ্যাপক উড্সের সম্মানে উপনিষদ থেকে আবৃত্তির পাশাপাশি তার নিজের কিছু ঔপনিষদিক গান গেয়ে শোনান।
অনুমান করা অসঙ্গত নয়, ঠাকুরের মুখে শোনা শ্লোকের উচ্চারণই দি ওয়েস্টল্যান্ড-এর শেষ দুই চরণে উদ্ধৃত হয়েছে। যদিও এ সত্য যে, সংস্কৃত ভাষা ও ভারতীয় দর্শন খোদ এলিয়টেরই পাঠ্যবিষয় ছিল। কিন্তু আমাদের বক্তব্যের সমর্থন মেলে আর এফ রাট্রে নামক এলিয়টের জনৈক বন্ধুর চিঠিতে। রাট্রে ছিলেন রবীন্দ্র-অনুবাদক অজিতকুমার চক্রবর্তীরও বন্ধু। ১৯৪০ সালের মার্চ মাসে তিনি রবীন্দ্রনাথকে লেখেন :
আপনার মনে আছে কিনা জানি না, আমার এক সহপাঠী বন্ধু সেদিন সন্ধ্যায় উপস্থিত ছিলেন, তিনি এখনকার বিখ্যাত কবি টি এস এলিয়ট। তিনি ও আমি একই সঙ্গে ভারতীয় দর্শনের চর্চা করেছি। হতে পারে যে সেদিন সন্ধ্যায় আপনার মুখে আবৃত্তি শুনে তার ওয়েস্টল্যান্ড কবিতার (শেষের লাইনে) ‘শান্তি, শান্তি, শান্তি’ ব্যবহার করতে আগ্রহী হন। আমি অবশ্য তার কবিতার অনুরাগী নই, কিন্তু তার খ্যাতির কথা ভেবে তথ্যটি উল্লেখ করলাম। [উৎস : রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর বিদেশি বন্ধুরা/ বিনায়ক সেন]
স্বভাবতই রবীন্দ্রনাথ এ চিঠি পেয়ে খুব খুশি হয়েছিলেন। ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত টি এস এলিয়টের লেখা তিনি ধারাবাহিকভাবে অনুসরণ করে এসেছেন। টি এস এলিয়টের বইপত্র তাকে বিলাত থেকে পাঠাতেন কবি অমিয়চন্দ্র চক্রবর্তী। অমিয়কে লেখা প্রায় শ-চারেক চিঠি খুলে দেখলে এর সাক্ষ্য মেলে। এলিয়টের ঞযব ঋধসরষু জবঁহরড়হ নাটক পড়ে প্রশংসা করেছিলেন। কিন্তু অনেক খুঁজেও আমি নিশ্চিত হতে পারি নি, রবীন্দ্রনাথ গঁৎফবৎ রহ ঃযব ঈধঃযবফৎধষ পড়েছিলেন কিনা।
এসব তথ্য উত্থাপনের কারণ, রবীন্দ্রনাথের হাতে টি এস এলিয়টের কবিতার অনুবাদ কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এর আগে চিঠিপত্রে দুএক ছত্র অনুবাদ করলেও পূর্ণাঙ্গ কবিতা এই প্রথম। সম্ভবত বাংলা ভাষাতেই প্রথম। ঠিক একই বছর, অর্থাৎ ১৯৩২ সালে তিনি লেখেন তার বিখ্যাত ‘বাঁশি’ কবিতাটি। অনেকের বিশ্বাস, এটিও কিছুটা এলিয়ট-অনুপ্রাণিত রচনা। যেমন- হঠাৎ খবর পাই মনে/আকবর বাদশার সঙ্গে/হরিপদ কেরানির কোনো ভেদ নেই।/বাঁশির করুণ ডাক বেয়ে/ছেঁড়া ছাতা রাজছত্র মিলে চলে গেছে/এক বৈকুণ্ঠের দিকে।
এলিয়ট তার ঞযব খড়াব ঝড়হম ড়ভ ঔ. অষভৎবফ চৎঁভৎড়পশ-এ লিখেছেন :
ঘড়! ও ধস হড়ঃ চৎরহপব ঐধসষবঃ, হড়ৎ ধিং সবধহঃ ঃড় নব;
অস ধহ ধঃঃবহফধহঃ ষড়ৎফ, ড়হব ঃযধঃ রিষষ ফড়
ঞড় ংবিষষ ধ ঢ়ৎড়মৎবংং, ংঃধৎঃ ধ ংপবহব ড়ৎ ঃড়ি,
অফারংব ঃযব ঢ়ৎরহপব;
এই রাজপুরুষের উল্লেখের কারণে নিশ্চয়ই মিল খোঁজা হয় নি। আমাদের বিবেচনায় অবশ্য অন্তর্গত মিলও নেই। হরিপদ কেরানির মূল সমস্যা দারিদ্র্য, সে কারণে দায়িত্বগ্রহণে অপারগতা এবং তজ্জনিত হাহাকার। প্রুফ্রকের সমস্যা দারিদ্র্য নয়। জীবনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে অনিশ্চয়তা, সিদ্ধান্তহীনতা। এই দার্শনিক সংকটের ফলাফল অস্তিত্বের শূন্যতাবোধ।
যা হোক, এলিয়টী আধুনিকতাকে রবীন্দ্রনাথ কিভাবে অনুধাবন করেছেন এবং মোকাবেলা করতে চেষ্টা করেছেন, তার কিছু প্রামাণ্য দলিল উপস্থাপন করা জরুরি। আমরা দেখব, তিনি একদিকে আধুনিকতার সমালোচক, অন্যদিকে নিজের কবিতায় তার অনুপ্রবেশে অনুমোদক, উচ্ছ্বসিতও বটে।
২৩ ফ্রেব্রুয়ারি ১৯৩৯, অমিয়কে ঠাকুর লিখছেন :
আমাদের দেশে হাল আমলের কাব্য, যাকে আমরা আধুনিক বলচি, যদি দেখি তার দেহরূপটাই অন্য দেহরূপের প্রতিকৃতি তাহলে তাকে সাহিত্যিক জীবসমাজে নেব কী করে? যে কবিদের কাব্যরূপ অভিব্যক্তির প্রাণিক নিয়মপথে চলেছে তাঁদের রচনার স্বভাব আধুনিকও হতে পারে সনাতনীও হতে পারে অথবা উভয়ই হতে পারে, কিন্তু তার চেহারাটা হবে তাদেরই, সে কখনই এলিয়টের বা অডেনের বা এজরা পাউন্ডের ছাঁচে ঢালাই করা হতেই পারে না। সজীব দেহের আপন চেহারার পরিচয়েই মানুষকে সনাক্ত করা চলে, তার পরে চালচলনে তার ভাবের পরিচয় নেয়া সম্ভব হয়। যে কবির কবিত্ব পরের চেহারা ধার করে বেড়ায় সত্যকার আধুনিক হওয়া কি তার কর্ম?
তোমাকে আমি এত কথা বললুম তার মূলে আছে আমার নিজের কাব্যরূপের অভিব্যক্তির অভিজ্ঞতা। সেই অভিব্যক্তি নানা পর্বে নানা পথে গেছে কিন্তু সব নিয়ে স্বতই তার একটা চেহারার ঐক্য রয়ে গেল। যুগধর্মের তিলকলাঞ্ছিত হবার লোভে সেটাকে বদল করা আমার পক্ষে অসম্ভব।
তুমি এখনকার ইংরেজ কবিদের যে সব নমুনা কপি করে পাঠাচ্চ পড়ে আমার খুব ভালো লাগচে,সংশয় ছিল আমি বুঝি দূরে পড়ে গেছি, আধুনিকদের নাগাল পাব না। এই কবিতাগুলি পড়ে বুঝতে পারলুম আমার অবস্থা অত্যন্ত বেশি শোচনীয় হয় নি।
আমার বড়ো বড়ো চিঠির বহর দেখে মনে কোরো না আমার অবকাশের ধিংঃবষধহফ বুঝি বহুবিস্তৃত।
আরও কিছু টুকরো কথা তুলে দিচ্ছি চিঠি থেকে :
মরুতে যে গাছ ওঠে তার টেকনিক কাঁটার টেকনিক। সে কেবলই বলে দূরে থাকো, যে যার আপন আপন চ-ীম-পে। [৬ জানুয়ারি ১৯৩৫]
এই যুগের মধ্যে যে আবর্তন যে আবিলতা এসেছে আমি জীবন আরম্ভ করেছিলুম তার থেকে দূরের হাওয়ায়। এই ক্ষুব্ধ মনেবৃত্তি আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মধ্যে পড়ে না। তাই ব’লে জানবার কৌতূহল নেই বা তাকে অশ্রদ্ধা করি তা নয় কিন্তু জানবার ভাষাতেই যদি তালা লাগানো থাকে তা হলে হতাশ হয়ে এই সাহিত্য-লীলাটাকেই দোষ দেই কিংবা নিজের অদৃষ্টকে। [১৬ ডিসেম্বর ১৯৩৮]
কান পেতে থাকি, জিজ্ঞাসা করি এরা কী শোনাতে চায়। কানে আসে গোলমাল, নতুন ফ্যাশনের কলরব। গোলমাল করার চেয়ে সহজ কিছুই নেই। যদি সবটাই হয় গোল, মাল কিছুই না থাকে। কোনো এক দেশে ভাঙনের যুগের ব্যাকুলতা যে আকুতি জাগিয়ে তোলে, তার উদ্ব্যগ্র ভাষা অনেকখানি হয়তো বোঝা কঠিন, কিন্তু বোঝবার একটা কোনো বিষয় তার ভিতরে আলোড়িত হয়, তার অন্তর থেকে বাণীর ইঙ্গিত ফেনায়িত হয়ে উঠতে থাকে, সে ইঙ্গিত আপন মমতায় ব্যাকরণেরও বাঁধানিয়ম ভাঙে। বস্তুত সেই ভাঙাচোরার উচ্ছৃঙ্খলতাই তার ঈডিয়মরূপে কাজ করে। যেখানে বলবার উদ্বেগেই বলবার বেড়া ভাঙতে থাকে সেখানে বেড়া ভেঙেছে বলেই হয়তো রাস্তার নির্দেশ পাওয়া যায়। কিন্তু যেখানে অন্তর্গত আবেগে বলবার কোনো তাড়া নেই, কেবল বেড়া ভাঙারই উৎসাহ আছে সেখানে মনে সন্দেহ জাগে। [১৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৯]
অমিয়, তুমি জান চারিদিকের সঙ্গে আমার মনের স্পর্শের যোগ খুব ঘনিষ্ঠ। যাই বলি না কেন বর্তমান যুগধর্মের প্রেরণাকে অতিক্রম করা আমার পক্ষে অসম্ভব। আমার পথের বাঁকচুর সে ঘটিয়েছেই সব সময় জানতে পারি বা না পারি। আমার বিশ্বাস আমার মধ্যে আধুনিক দেখা দিয়েছে পুরাতন বাসাতেই, এই যে আমার বাসায় জায়গা ছিল যথেষ্ট। [২৩ ফ্রেব্রুয়ারি ১৯৩৯]
টি এস এলিয়ট-এর ঞযব ঔড়ঁৎহবু ড়ভ ঃযব গধমর কবিতার যে অনুবাদ রবীন্দ্রনাথ তার পুনশ্চ কাব্যে ঠাঁই দিলেন, সেই ‘তীর্থযাত্রী’ কবিতার একটি পঙ্ক্তি এমন : ‘দুজন মানুষ খোলা দরোজার কাছে পাশা খেলছে টাকার লোভে’। মূলে ছিল ‘ঝরী যধহফং ধঃ ধহ ড়ঢ়বহ ফড়ড়ৎ ফরপরহম ভড়ৎ ঢ়রবপবং ড়ভ ংরষাবৎ’। ‘ছয়টি হাত’ কেন ‘দুজন মানুষ’ হয়ে গেল, বুঝে ওঠা মুশকিল। সম্ভবত তাস খেলাটা পাশা খেলায় রূপান্তরিত হওয়া মাত্র আমাদের মহাভারতীয় অভিজ্ঞতা ‘দুজন’কেই মুখোমুখি টেনে আনে।
সবশেষে, আমাদের মনে একটা প্রশ্ন জাগে, টি এস এলিয়ট নিজে কি এসব অনুবাদের কথা জানতে পেরেছিলেন? জানলে কি তার মন কৃতজ্ঞতায় আর্দ্র হয়ে উঠত? অথবা খ্রিস্টীয় এলিয়ট রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে কী ধারণা পোষণ করতেন? একটি ছোট্ট সৌহার্দ্যরে ঘটনা আমরা জানতে পারি। এজরা পাউন্ড যিনি প্রথম জীবনে রবীন্দ্রমুগ্ধ, শেষ জীবনে খানিকটা ক্ষুব্ধ। তাঁর মৃত্যুর পর ‘সিলেক্টেড লেটার্স’ নামে যে বইটি বেরোয় এলিয়টের সম্পাদনায়, তা থেকে রবীন্দ্র-দ্বেষমূলক লেখাটি সম্পাদক বাদ দেন।

The Post Viewed By: 396 People

সম্পর্কিত পোস্ট