চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ০৯ আগস্ট, ২০২২

সর্বশেষ:

১০ জুলাই, ২০২২ | ২:৫৭ অপরাহ্ণ

অলক চক্রবর্তী

শেষ হয়েও হয় না শেষ ‘হরতনের বিবি ইস্কাপনের গোলাম’

প্রদীপ আচার্যের প্রথম বই ‘হরতনের বিবি ইস্কাপনের গোলাম’ ১৩ টি গল্প নিয়ে সাজানো। একেকটি গল্পে প্রদীপ পাঠককে দাঁড় করিয়ে দেন এক সীমাহীন আবিস্কারের দিকে। এ যেমন কাহিনীর নতুনত্বে তেমনি তার বাক্যশৈলীর মাধ্যমে। বাক্যের মধ্যে অনায়াসে ঘোর তৈরি করতে পারেন তিনি। বলা যায় এ তাঁর ভাষার জাদু। তেমনি এক গল্প হলো ‘মগ্নতায় বির্বণতা’। গল্পের বিষয় হলো— এক ছেলে রাস্তায় বসে মাছ বিক্রি করে। আর গল্পের উত্তম পুরষ প্রতিদিন তাকে চাকরি থেকে ফেরার পথে দেখতে পান। হয়তো সামান্য ওখানে জিরিয়ে নেন। সেই ফাঁকে একটুখানি আলাপ—
‘দেওয়ানহাট ব্রিজের নিচে গড়ে ওঠা গোটা দশ-পনেরো ঝুপড়ির একটিতে সে আর দাদি থাকে। মেঘনার ভাঙনে সব নদীর পেটে গেলে সে চট্টগ্রামে এসেছিল বাবার কোলে চড়ে। কবে, সেটা সঠিক বলতে পারে না। হাতের ইশারায় উচ্চতা দেখায়। তার বাবা নাকি রিক্সা চালাত, ট্রাকের ধাক্কায় রাস্তায়ই মরে পড়েছিল লোকটা। ঘটনাটা এতটাই নির্বিকারভাবে বলে সে, যেন ট্রাকের ধাক্কায় বাবার এই মৃত্যু খুবই মামুলি এক ব্যাপার তার কাছে, নিতান্তই সাধারণ। বরং বাবা মারা গেলে মায়ের আবার বিয়ে করাটা তার বর্ণনায় জীবন্ত হয়ে ওঠে, দুচোখে প্রবল বিস্ময় নিয়ে ব্যাপারটার বিশদ বয়ান করে সে। তার মা, শীতের এক ঘোরলাগা সন্ধ্যায় কপালে বড় লালটিপ লাগিয়ে, পরনে লালডুরে শাড়ি পেঁচিয়ে, আধহাত ঘোমটা টেনে ওভারব্রীজের ওপর থেকে ঝুঁকে আছে নিচে, হাত নাড়ছে তার দিকে তাকিয়ে। মায়ের অন্যহাত জড়িয়ে আছে অচেনা এক পুরুষের শক্ত বাহু। দুচোখে প্রবল বিস্ময় আর অবিশ্বাস নিয়ে সে দেখছে মায়ের এই অচেনা, অপরিচিতরূপ।’— (মগ্নতায় বির্বণতা)।
এখানে কি অসাধারণ বর্ণনা করেন লেখক! আর এ কারণেই যেনো আমরাও দেখতে পাই— শীতের এক ঘোরলাগা সন্ধ্যায় কপালে বড় লালটিপ লাগিয়ে, পরনে লালডুরে শাড়ি পেঁচিয়ে, আধহাত ঘোমটা টেনে ওভারব্রীজের ওপর থেকে ঝুঁকে আছে নিচে, হাত নাড়ছে কেউ।
সামান্য বিষয়কে নিয়েও তিনি তরতর করে এগিয়ে যান বিষয়ের গভীরতার দিকে— এবং অর্ন্তদৃষ্টিতে দেখান সেখানের পূঙ্খানুপুঙ্খ চিত্র।  ‘…সুহাসিনীর আবছা ছায়া তিলকের পাশ দিয়ে যেতেই তাকে কাছে টানতে চায় তিলক। সুহাসিনী নিজেকে যত ছাড়িয়ে নিতে চায় দূরত্ব কমে আসে তত।
হাসু, অশ্বিনীকুমারের কাছে বর মাগুম তুমি যেন আমার হইয়া যাও— ধরা গলায় বলে তিলক।
এখন ছাড় তো! -তিলককে আলতো হাতে সরিয়ে দিয়ে দ্রুত ছুট লাগায় সুহাসিনী।— (বিন্নি ধানের খই ও কতিপয় স্বপ্নখাদক)।
প্রেমের কি চমৎকার বর্ণনা। এরপর গল্পের একপর্যায়ে সুহাসিনী ভাইকে রাতের আঁধারে খুঁজতে গিয়ে ধর্ষিত হয় এবং এরপরের অংশটি আবার উদ্ধৃত করছি পাঠকদের জন্য—
‘অবশ, চেতনাহীন পড়ে থাকে সুহাসিনী। অবচেতন মনে স্মৃতি বিলিকাটে, স্মৃতি তাকে নিয়ে যায় বিয়ের ছয় মাসের মাথায়— স্বামীর নিথর শরীর চিতায় তুলে দেয়ার মুহূর্তটুকুতে। তার মনে হয় কোথাও ঝড় উঠেছে ভীষণ, ঘৃণা আর ক্ষোভের তীব্র তোলপাড়ে ডুবে যাচ্ছে তার বোধের পারদ। চোখের কোণ বেয়ে নামা গরম জলের ধারায় শুকনো মাটি ভিজে ওঠে অনেকটা। মাটিতে লেপ্টে থাকে ছোপ ছোপ রক্ত। শেষবারের মতো তিলকের কথাগুলো কানে
বাজে সুহাসিনীর, যেন বহুদূর থেকে ভেসে আসে, হাসু, অশ্বিনীকুমারের কাছে বর মাগুম, তুমি যেন আমার হইয়া যাও…’
আমাদের কানেও বাজে এই করুণ আকুতি। এইভাবে লেখক গল্পের ইতি টানেন।

বিষয়বস্তুর দিক থেকে বলতে গেলে সমাজের ঘটমান সমসাময়িক বিষয়গুলো তাঁর গল্পে গুরুত্ব পেয়েছে বেশি। কত রকম বিষয়ের অবতারণা করেছেন লেখক এই বইতে, যেমন— করোনা মহামারি, সাম্প্রদায়িক বিষ-বাষ্প, দারিদ্রতার কষাঘাত, মাদকের নিষ্টুর থাবা, আদিম বাসনার লোলুপতা— ইত্যাদি। আবার এর ভেতরেই মানুষের অবস্থান এবং সম্পর্কের টানাপোড়েন তিনি তুলে ধরেছেন অবলীলায়।
লেখক যেমন এ বইয়ে সম্ভ্রান্ত জীবনের কাহিনী তুলে ধরেন পাশাপাশি দরিদ্র-নিম্নবৃত্ত জীবনের ঘটনাও চিত্রায়ন করেছেন একনিষ্ঠতার সঙ্গে। কোথাও একবারের জন্যও মনে হয় না লেখক এখানে আগুন্তুক। বরং মনে হয়েছে তিনি এ সমাজেরই একজন। অর্থাৎ তিনি এ জীবনগুলো অত্যান্ত নিবিঢ়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। এখানেই লেখক হিসেবে তাঁর সফলতা। সমাজের নানা ঘটনা তিনি তাঁর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে দেখে চরিত্রের সঙ্গে বিলীন হয়ে যান এখানে তাঁর লেখক-সত্ত্বার শক্তি নিরুপণ করা যায়।
‘ব্ল্যাকবোর্ড’ গল্পে করোনায় এক শিশু মারা যাওয়ার করুণ কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। করোনায় শিশু রঞ্জনার মৃত্যুর কারণে তারই সহপাঠী শিশু টগর মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে যায়। সে স্বপ্নে তার সমবয়সী রঞ্জনাকে দেখতে পায়। দেখতে পায়— ‘দু’জনে সর্পিল ভঙ্গিমায় এক গাছ থেকে অন্য গাছের দূরত্ব দৌড়াতে দৌড়াতে মাড়িয়ে বারান্দা পেরিয়ে এসে দাঁড়ায় তাদের শ্রেণিকক্ষের সামনে। …দু’জনে জানালার ভাঙা কাঁচের ফাঁক দিয়ে উঁকি দেয় ক্লাস রুমের ভেতর।’—  (ব্ল্যাকবোর্ড)
স্কুলে নানা বৈচিত্রময় ঘটনার পর টগরের ঘুম ভাঙ্গে। এবং টগর তখন সত্যিই স্কুলে গিয়ে দেখতে চায় রঞ্জনা  ব্ল্যাকবোর্ডে কিছু লিখেছে কিনা। তার মা স্বপ্ন দেখার কথা বলার পরেও সে মাকে সরিয়ে স্কুলের দিকে দৌড় দেয়। গল্পটি আমাদের মনকে আদ্র করে তোলে। কিন্তু প্রদীপ আচার্য স্বপ্নকে স্বপ্নের রঙেই রাঙিয়ে তোলেন নিপুণ শিল্পীর তুলিতে।
সাম্প্রদায়িকতার বিষয় নিয়ে ‘ফেরা’ গল্পটিও পাঠকের ভালো লাগবে। সাম্প্রদায়িক ঘটনার সময় গফুর নামে একজন এগিয়ে আসে তার আবাল্য বন্ধুকে বাঁচাতে। তার কাছে তখন জাত-ধর্ম প্রাধান্য পায়নি। ‘তখন ছিল বসন্ত। ফাগুনের রাত। প্রায় একটা। …হঠাৎ তীব্র চিৎকারে ঘুম ভাঙে গফুরের। বাইরে এসে দেখে পাড়ার পুবের শেষ মাথায় আগুন। ব্যাপারটা বুঝতে আর একমুহূর্তও লাগে না তার। এ মাটির ওপর অনেক আগেই চোখ পড়েছিল সিকদার ব্যাপারির। …এরা সিকদার ব্যপারির লোক! আগুন লাগিয়ে পালাচ্ছে! …নিরঞ্জনকে সাহায্য করতে জলিলকে বাগে আনার চেষ্টায় এতটুকু দেরি হয় না গফুরের। …জলিলকে জাপটে ধরে তার হাতের লাঠিটা ছাড়িয়ে নিয়ে গফুর তার পিঠে বসিয়ে দেয় এক ঘা। ততক্ষণে জলিল আর নিয়ন্ত্রণ রাখতে না পেরে পিছলে পড়ে। লাঠির আঘাত তার পিঠে না লেগে সোজা মাথায় গিয়ে লাগে। …খুন, খুন! পালা, গফুর পালা! গফুর পালায়নি। সে যদি পালাত সেদিন, নির্দোষ নিরঞ্জনকে তাহলে ছেড়ে কথা বলত না সেদিন কেউ। নিরঞ্জনকে বইতে হতো গফুরের শাস্তির ভার। গফুর সেটা চায়নি। নিজের অপরাধের শাস্তি নিরীহ নিরঞ্জনের ওপর চাপাতে সায় দেয়নি তার মন। সেদিন না পালানোর সেই ভাবনাটা গফুরকে আজও তৃপ্ত করে।’Ñ (ফেরা)।
সমাজের এই পরোপকারী অসাম্প্রদায়িক মানুষগুলোর কথা পর্দার আড়ালে থেকে যায়। প্রদীপ আচার্য এ চরিত্রকে সামনে নিয়ে এসেছেন— যখন আমাদের সমাজে এক শ্রেণির মানুষ সাম্প্রদায়িকতাকে উপজীব্য করে ফায়দা লুঠতে চায়। সংখ্যায় কম হলেও এ ধরনের চরিত্র আছে আমাদের সমাজে। আমাদের চারপাশেই এরকম বন্ধু-বান্ধব নেহায়েত কমও নয়। এরকম অসংখ্য ভালোলাগার উদ্ধৃতি দেওয়া যায় এই বইটি থেকে।
তাঁর গল্পের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো তাঁর গল্পের শেষ মূহূর্তগুলো— যেনো মনে হয় শেষ হয়েও হলো না শেষ। এখানে তিনি পাঠকের জন্য অবশিষ্ঠাংশটুকু রেখে দেন। নিখুঁত বর্ণনায় মানুষের চরিত্রের স্ব-বিরোধী এবং অনুদ্ভাসিত দিকগুলো তিনি দু’একটা বাক্যের আঁচড়ে তুলে ধরেন। এত টানাপোড়েনের মধ্যেও তিনি খেই হারান না, বরং পরিমিতির মধ্যে সেই বিষয়গুলো বা সংকটগুলো মোকাবেলা করেন খুব সহজে। কঠিন এক বাস্তবতার মুখোমুখী ঘটনার গল্প ‘করোটিতে ঘুণপোকা-ঘোর’। কখনো কখনো এমন ঘটনার মুখোমুখী হতে হয় আমাদের— তখন কোনো ভাষা থাকে না, কি করণীয় বুঝতে পারা যায় না। কিন্তু লেখক নিজেকে নিরন্তর নিরীক্ষার মধ্যে রেখেছেন— সংকটের মুখোমুখী হয়েছেন অনায়াসে।
গল্পের মাধ্যমে তিনি সমাজের ঐতিয্যগুলো তুলো ধরেন নিখুঁত বর্ণনায়। অনেক গল্প তিনি বড় ক্যানভাসে ধরেন। প্রথমে মনে হবে কোনো উপন্যাসের শুরু। ফলে উঠে আসে চমৎকার চিত্রকল্প—প্রকৃতির নিটোল বর্ণনা। তাঁর এ চিত্রকল্প প্রতিটি গল্পেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। কিন্তু তিনি সঠিকভাবেই তাঁর গল্পের পরিসরেই আবদ্ধ থাকেন লক্ষ্যের মাত্রায়। এ বইয়ে বড় গল্প এবং ছোট গল্প দুই-ই আছে। গল্পগুলো হলো— হরতনের বিবি ইস্কাপনের গোলাম, বিন্নিধানের খই ও কতিপয় স্বপ্নখাদক, ব্ল্যাকবোর্ড, ফেরা, জলজ গাথা, ঘুমে ডুবে যায় কবিয়াল চোখ, মগ্নতায় বিবর্ণতা, লাইফসাপোর্ট, ভালোবাসা সুদূরের নাম, করোটিতে ঘুণপোকা-ঘোর, নিলীন, মানুষ, অতঃপর শূন্যে দাঁড়িয়ে।
দু’একটা জায়গায় মুদ্রণজনিত ত্রুটির কারণে শব্দ আলাদা হয়ে যাওয়ায় পাঠকের প্রথমত বুঝতে অসুবিধা হলেও পরিশেষে বলা যায় নানা বিষয়-বৈচিত্রে সমৃদ্ধ বইটি পাঠকের নিঃসন্দেহে ভালো লাগবে।

হরতনের বিবি ইস্কাপনের গোলাম – প্রদীপ আচার্য।
প্রথম প্রকাশ- ফেবব্রুয়ারি, ২০২২।
প্রকাশন- অমরাবতী

 

 

পূর্বকোণ/এসি

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট