চট্টগ্রাম শুক্রবার, ১২ আগস্ট, ২০২২

ছবি- জাকির হোসেন

১৪ এপ্রিল, ২০২২ | ১২:১৭ অপরাহ্ণ

শৈশবের নববর্ষ

জুঁই দাশ

 

বাংলা নববর্ষে পুরনো বছর, পুরনো সময় পিছে ফেলে আসা স্মৃতিকে বিদায় জানিয়ে আগত নতুন দিনকে আহ্বান করে নতুনের চেতনায়, নবউদ্দীপনায় নিজেকে রাঙিয়ে তুলি। বাঙালি জাতির সাথে নববর্ষের রয়েছে আত্মার টান। হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সব ধর্মের মানুষরা নতুন বছরকে বরণ করতে নানা উৎসব-অনুষ্ঠানে মেতে উঠি। এই দিনটি বৈশাখের প্রথমদিন উদযাপিত হয় বলেই একে বলি পহেলা বৈশাখ। প্রতি বছর নতুন জামা, শাড়ি, খোঁপায় ফুল, হাতভর্তি কাঁচের চুড়ি, কপালে টিপ এ যেন আমাদের করে তোলে পরিপূর্ণ বাঙালি।
ছোটবেলা থেকেই খুব উৎসব মুখর পরিবেশে নববর্ষ পালন করে এসেছি। নববর্ষ আসার আগেই বাবার কাছে নতুন জামার জন্য বায়না ধরতাম। আর বাবা বরাবরই আমাদের ঘরের সবাইকে নতুন কাপড় নিয়ে দিত। আমার শৈশবের অর্ধেকটাই কাটিয়েছি বান্দরবানে। আগেই বলে রাখি, আমাদের পার্বত্য জেলা, বান্দরবানে সংস্কৃতির নিবিড় চাষ হয়, যেটা আমার জন্মস্থান। ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছি বারো মাসে তেরো পার্বণের মতো বান্দরবানে প্রত্যেক দিবসে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। এখানে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই একত্রে এক নিবিড় সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ। যা বলছিলাম, বান্দরবানে যেহেতু উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সংখ্যা বেশি, সে ধারাবাহিকতায় তাদের বিভিন্ন উৎসব পালিত হয়। মারমা, চাকমা, ত্রিপুরা এরা বৈসাবি অর্থাৎ মারমা গোষ্ঠীর সাংগ্রাই, চাকমা গোষ্ঠীর বিজু ও ত্রিপুরাদের বৈসু উৎসব হয়। এপ্রিলের ১৩, ১৪, ১৫ তারিখ এই তিনদিন ব্যাপী তাদের নানা আয়োজনে বান্দরবান সেজে উঠে অনন্য সাজে।
১৩ এপ্রিল ফুল বিউ হয়। আমরা এদিন সকালে স্নান সেরে পরিষ্কার জামা পড়ে বাহারি রঙের ফুল, নিম পাতার গুচ্ছ দিয়ে মালা গেঁথে ঘরের দরজা, জানালা, বিভিন্ন আসবাবপত্রে, কলসিতে বেঁধে দিতাম। সকাল থেকে অস্থির হয়ে উঠতাম কবে মালা গাঁথবো আর ঘরের দরজায় ঝুলিয়ে দিব। এর পরের দিন পালন করতাম বছরের প্রথম দিন। সকালে হলুদ-সরিষা বাটার এক মিশ্রণ গায়ে মেখে স্নান করে নতুন জামা পড়তাম। তারপর খইয়ের ছাতু দিয়ে মাটিতে নিজের কোন এক শত্রুর (মনের ভ্রান্তি) অবয়ব আঁকতাম আর ছুরি দিয়ে কাটতে কাটতে বলতাম শত্রুর মুখ কাটলাম, শত্রুর পেট কাটলাম…। শত্রুকে পুরো কেটে ফেলতাম (মূলত মনের আসুরিক প্রবৃত্তিকে দূর করতাম)। তারপর মা বলতো প্রথমেই যেন নিম পাতা খাই (আসলে তিতার পরেই মিঠা) এরপর অন্য কিছু যেমন খই, খইয়ের নাড়ু, তিলের নাড়ু, আটকড়াই (মুড়ি, চিড়া, মটর-খেসারি-মুগ-সিমের বিচি, মিষ্টিকুমড়ার বিচি, বাদাম, তিল বিভিন্ন রকমের ভাজা দিয়ে একপ্রকার মিশ্রণ) ইত্যাদি খেতাম।
প্রতিবেশীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে দিয়ে আসতাম, তাদের বাড়িতেও খেয়ে আসতাম। ওই দিন মোটামুটি বইয়ের সাথে দেখা হতো না। এইদিন খুব লহ্মী মেয়ের হয়ে থাকার চেষ্টা করতাম কারণ তখন ভাবতাম বছরের প্রথমদিন যদি বকা, মাইর এসব খাই তবে সারাবছরই খেতে হবে। তাই খুব সাবধানে থাকতাম। মা এইদিন অনেক ধরনের ঔষধি গুণসম্পন্ন সবজি (মোটামুটি ১৮-২০ ধরণের) দিয়ে আটওরার পাঁচন রান্না করত। তা আমার বরাবরই খুব পছন্দের খাবার। আমি এক থালা সবজির তরকারি নিয়ে খেতে বসতাম। ও আসল কথাটাই তো বলা হলো না স্নান করে এসেই কিন্তু বড়দের পা ছুঁয়ে প্রণাম করতাম আর ঈদের সেলামির মতো সেলামি (প্রণামী) চেয়ে বসতাম।
ঈশ্ শৈশবটা কতই না মধুর ছিলো। এখন আগের মতো অনেক কিছুই আর করা হয় না। শৈশবের সাথে সাথে বহু বিষয় হারিয়ে ফেলেছি। এই ১৪ এপ্রিল মারমাদের জলকেলি উৎসব পালিত হতো। তারা একে অপরের গায়ে পানি ছিটিয়ে এই দিবস পালন করে। দিনভর বিভিন্ন জায়গায় অপরিচিত কারো গায়ে হঠাৎ পানি ছুঁড়ে মেরে তাদেরও এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করায়। আমরা এইদিন ঘরের বাইরে যেতে খুব ভয় পেতে যদি পানিতে ডুব মারার মতো ভিজে যেতে হয়। এমন যে হয়নি আমার সাথে তা কিন্তু নয়। একবার হয়েছিল, আমি আমার বোন, বন্ধু-বান্ধবীদের নিয়ে খুব সতর্কতার সাথে চারপাশ দেখে শুনে রাজার মাঠ (এখানে অনেক বড় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন হয় প্রতিবছর) যাচ্ছিলাম, আশেপাশে পানি নিয়ে কাউকে দাঁড়িয়ে না থাকতে দেখে মহা আনন্দে চলে আসছিলাম। তবে না, আমার এই আনন্দ হয়তো কারো ভালো লাগেনি। হঠাৎ মনে হলো শুধু এক বালতি বৃষ্টি আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। নিজেদের জলে ভেসে যেতে দেখে খুবই মন খারাপ হয়েছিল (আসলে অনেকটা সময় নিয়ে সেজেগুজে বের হয়েছিলাম তো তাই)।
১৫ এপ্রিল আবারো নববর্ষের আনন্দে মেতে থাকতাম। মা মাছ, মাংস, পোলাও অনেক কিছু রান্না করতো আর আমরা কব্জি ডুবিয়ে খেতাম। বয়স বাড়ার সাথে সাথে অনেক কিছুই জীবন থেকে চলে গেলো, এখন হয়তো আগের মতো করে নববর্ষ পালন করা হয় না। তবুও নানা আড়ম্বরের স্বামী-সন্তান নতুন পরিবার নিয়ে নববর্ষ উদযাপন করি। আমরা বাঙালিরা নববর্ষকে এমনভাবে উদযাপন করি যাতে পুরাতন সকল গ্লানি মুছে নতুন উদ্দীপনায় সামনে অগ্রসর হতে পারি। ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’ এই গানটি যেনো আমাদের বুলিতে, কণ্ঠস্বরের সাথে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে। বিশ্ব মহামারী কোভিড-১৯ এর জন্য আমাদের সকল উৎসব কোলাহল থমকে ছিল। আজ আবারও এই মহামারীকে জয় করতে সক্ষম হয়েছি। চলুন আমরা সবাই নব আনন্দে নব উদ্দীপনায় নববর্ষের জোয়ারে ভেসে যায়। হে নববর্ষ… ‘এসো এসো আমার ঘরে এসো,
আমার ঘরে।’ প্রতিটি বাঙালির ঘরে ঘরে এর প্রসার ছড়িয়ে পড়ুক।

 

 

পূর্বকোণ/এসি

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট