চট্টগ্রাম শনিবার, ০২ ডিসেম্বর, ২০২৩

সর্বশেষ:

বইপত্র এজাজ ইউসুফীর

গদ্যের গোলাঘর

সাহিত্যের শস্যভা-ার

হাসান মেহেদী

৩ মে, ২০১৯ | ১:২৩ পূর্বাহ্ণ

এজাজ ইউসুফীর পরিচয় বহুমাত্রিক। তিনি একাধারে, গবেষক, প্রাবন্ধিক, কবি, সাংবাদিক ও সম্পাদক। সুদীর্ঘ সময় সম্পাদনা করছেন সাহিত্যের ছোট কাগজ ‘লিরিক’।
বাংলা কবিতার অনিবার্য নাম এজাজ ইউসুফী সমাজ-সংস্কৃতি-রাষ্ট্রদর্শন-অর্থনীতির মতো বিচিত্র ভাবনার নির্যাস নিয়ে এবারের বইমেলায় হাজির হয়েছেন প্রবন্ধগ্রন্থ ‘গদ্যের গোলাঘর’ নিয়ে।
উত্তরাধুনিক সাহিত্য আন্দোলনের প্রাণবন্ত সৈনিক এজাজ ইউসুফীর ‘গদ্যের গোলাঘর’- বৈচিত্র্যময় বিষয়ের জন্য পাঠকের ভাবনার মহীরুহকে করবে দিগন্ত বিস্তৃত।
এক চল্লিশটি প্রবন্ধের মধ্যে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রথিতযশা মনীষারা যেমন আছেন, তেমনি-আছেন সমকালীন লব্ধপ্রতিষ্ঠ কবি ও কথাকার, আছেন সমাজের প্রোজ্জ্বল বাতিঘর হয়ে থাকা নানা পেশার কৃতীজনেরা।
কবি এজাজ ইউসুফী নিজে এমাটি আর সবুজের প্রশ্রয়ে বেড়ে ওঠা ঋদ্ধ-প্রাঞ্জল মনীষার প্রতিকৃতি তাঁর দৃষ্টি ও মননে তাই ধরা পড়েছে এক দিকে যেমন বেদনা মলিন সৌন্দর্যময় দেশজ-লোকজীবনের বর্ণিল প্রতিভূ, অন্যদিকে আমাদের সমাজ বৃত্তের বাইরের চিন্তনলোকের নানা বিষয়-আশয়।
গ্রন্থভুক্ত প্রবন্ধ-সমূহের একটি বড় অংশই দেশ ও দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আলো ছড়ানো আমাদের চেতনালোকের দীপশিখা হয়ে যাঁরা দেদীপ্যমান, তাঁদের নিয়ে। এজাজ ইউসুফীর কলমে চিত্রময় হয়ে উঠেছেন-বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তিতুল্য কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্রোপাধ্যায়, সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী মার্কিন কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, ঔপন্যাসিক অমিয়ভূষণ মজুমদার সাহিত্যিক মাহবুব উল আলম, কালজয়ী লেখক-চলচিত্রকার হুমায়ূন আহমেদ, কবি ও গল্পকার মহীবুল আজিজসহ অনেকেই।
বাণীময় হয়ে উঠেছেন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব বসু, শামসুর রাহমান, সুনীল নাথ, সুভাস মুখোপাধ্যায়, গোলাম মোস্তফাসহ বাংলা কবিতার অনিবার্য নামগুলো। তাঁর প্রবন্ধের বিষয় হয়েছেন তাঁর সময়কার কবি ওমর কায়সারও। লেখক ব্যবচ্ছেদ করেছেন ওমর কায়সারের ‘প্রতিমাবিজ্ঞান’ কাব্যগ্রন্থ।
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেমন লেখকের লেখায় জীবন্ত হয়ে উঠেছেন তেমনি মানবিক বাংলাদেশ গঠনের এক একজন সাহসী যোদ্ধা; যেমন পূর্বকোণ-প্রতিষ্ঠাতা, পুণ্যাত্মা মোহাম্মদ ইউসুফ চৌধুরী, সমাজবিজ্ঞানী, বাঙালির রেনেসাঁপুরুষ ড. অনুপম সেন, ‘সাংবাদিকদেরবন্ধু’-খ্যাত প্রগতির অন্যতম ধারক সিদ্দিক আহমেদ হয়ে উঠেছেন প্রাণময়।
লেখক নতুন আলোয় আবিষ্কার করেছেন বাঙালির ঐতিহ্যসন্ধানী শিল্পী এসএম সুলতান আর আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে জীবনবাজি রাখা আলোকচিত্রী কিশোর পারেখকে। এজাজ ইউসুফী তাঁর সময়কার কবি-কথাশিল্পীদের পাঠ-নির্যাস যেমন তুলে এনেছেন তেমনি কালান্তরের শিল্পী-সাহিত্যিকদের নিয়ে এসেছেন পাদপ্রদীপের আলোয়। রচনা করেছেন নবীন-প্রবীণের এক অনন্য সেতুবন্ধুন।
এজাজ ইউসুফীর দীর্ঘ পেশা-জীবনের উপলব্ধি আর চিন্তন জগতের বীক্ষণে সমাজ বৃত্তের পরতে পরতে আবর্তিত ঘটন-অঘটনের চিত্রল বর্ণনা পাওয়া যায়- ‘গদ্যের গোলাঘর’-এর বেশ কিছু প্রবন্ধে।
শিরোনাম ধরে উল্লেখ করা যায়-‘কবিতার মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের কবিতা, ‘সেক্যুলার রাষ্ট্রচিন্তা পুঁজিবাদী কষ্টকল্পনা’, ‘বাংলাদেশেরগণমাধ্যমে: স্বাধীনতা ও দায়বদ্ধতা, ‘ধর্ম, রাজনীতির মানবিকতা : বাংলাদেশ প্রসঙ্গ,’ ‘ধর্মীয় রাজনীতি কেন বন্ধ করতে হবে?,’ ‘প্রজন্ম চত্বরের অদম্য তরুণ কোন পথে যাবে?,’‘স্বাধীনতা ও ইস্পিত চেতনা,’‘বাঙালির অস্তিত্ব রক্ষার মহাসংকট কালে আপনার একটি ভোট,’ ‘স্বাধীনতা-উত্তরসংবাদ পত্রের স্বাধীনতা ও বিভাজনের স্বরূপ এর মতো জাতীয় সমস্যা ও সম্ভাবনা-বিষয়ক ভাবনাবলয় স্পর্শী প্রবন্ধমালা।
আবার নিজের শহর চট্টগ্রামকে নিয়ে লেখক একটু আলাদা করে ভাবতেও ভুলে যাননি। তাঁর ‘চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক বিকাশের ধারাক্রম’ ও ‘মঞ্চ-জটিল তার পটভূমি : চট্টগ্রাম প্রেক্ষিত’ তারই প্রমাণ।
বিচিত্র বিষয় নিয়ে রচিত কতক প্রবন্ধে বিবিধ সমাজ-সংকট পর্দা উত্তোলনের পাশাপাশি তিনি সংকট উত্তরণের বিষয়টিতেও পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
দীর্ঘ সাংবাদিকতা ও লেখক-জীবনের চলতি পথে কুড়িয়ে পাওয়া রত্ন-ভা-ারে ঋদ্ধ হয়েছে গ্রন্থভুক্ত প্রবন্ধগুলো। প্রাককথনে তিনি উল্লেখ করেন- “গদ্যের গোলাঘর’আমার সুদীর্ঘকালে গদ্যময় বয়ান। মূলত কবিতার বসতি করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পরবর্তীকালে কবিতার শেকড়-সন্ধান করতে গিয়ে দার্শনিক ভাবজগতের সঙ্গে পরিচয় ঘটে। উপরন্তু ছোটকাগজ ‘লিরিক’ সম্পাদনা করতে গিয়ে- সাহিত্য, দর্শন, ধর্ম, রাজনীতি, অর্থনীতিসহ নানা ধরনের বিষয়ের সাথে পরিচয় আর অন্তরঙ্গ সখ্যের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। … পাঠপ্রতিক্রিয়া হিসেবে কিছু গদ্যও লিখতে হয়েছে অনিবার্যভাবেই। তারই সংকলন ‘গদ্যের গোলাঘর’।”
বলাবাহুল্য, কবি এজাজ ইউসুফীর-এ ‘অনিবার্য’ গদ্য লিখনীই বাংলাসাহিত্য-ভা-ারে এক আলোকময় সংযোজন হয়ে ওঠবে কাল-পরিক্রমায়। অধিকাংশ রচনা বিভিন্ন সময়ে পত্রিকা ও সাময়িকীতে প্রকাশিত হলেও সেগুলোর পুনর্পাঠ ও গ্রন্থভুক্ত করা বল চলে সময়েরই দাবি।
বইটির আলোচনাধর্মী দীর্ঘ ভূমিকা লিখেছেন বাংলাদেশের আরেক যুগন্ধর সমাজবিজ্ঞানী লেখক অধ্যাপক ড. অনুপম সেন। তাঁর মূল্যায়ধর্মী ভূমিকাটিকে গ্রন্থের লেখক এজাজ ইউসুফীর মানসচিত্র বললে মোটেও অত্যুক্তি হবে না। নিঃসন্দেহ ভূমিকাটি গ্রন্থের শ্রীবৃদ্ধি করেছে।
হাতেগোনা কয়েকটি মুদ্রণ প্রমাদ বাদ দিলেগ্রন্থটিকে সর্বাঙ্গ সুন্দর বলা যায়।
‘গদ্যের গোলাঘর’ গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে চট্টগ্রামের প্রতিশ্রুতিশীল প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান খড়িমাটি। দৃষ্টিনন্দন প্রচ্ছদ এঁকেছেন শিল্পী মোস্তাফিজ কারিগর। উন্নতকাগজ ও বোর্ড বাঁধাইয়ে ৩২৪ পৃষ্ঠার গ্রন্থটির দাম রাখা হয়েছে তিনশত টাকা মাত্র।
মন-মগজে কবি হয়েও এজাজ ইউসুফীর মানস-দৃষ্টি দিয়ে দেখা সমাজের যে চিত্রপাঠকের সামনে উন্মুক্ত করেছেন, তা শস্যশিল্পীর শ্রমে-ঘামে উৎপাদিত সোনার ফসলে ভরা শস্য-ভা-ারেরই প্রতিরূপ ‘গদ্যের গোলাঘর’। গ্রন্থটি শেকড়সন্ধানী বাঙালি পাঠকের অনুসন্ধিৎসু মনে ঠাঁই করে নেবে বলেই বিশ্বাস।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট