চট্টগ্রাম শনিবার, ২৯ জানুয়ারি, ২০২২

সর্বশেষ:

১০ ডিসেম্বর, ২০২১ | ১২:১২ অপরাহ্ণ

ডা. মোহাম্মদ ওমর ফারুক

আল-কোরআনের আলোকে শিষ্টাচার

ইসলাম পারস্পরিক শিষ্টাচার ও শ্রদ্ধাবোধকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তাগিদ দিয়েছে। শিষ্টাচার ঈমানের অন্যতম একটি অনুষঙ্গ। সত্যিকার মুমিন বান্দাদের চরিত্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হল ভদ্রতা, যেটি শিষ্টাচারের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কযুক্ত। এটি আল্লাহর রাসূল (সা.) তাঁর জিন্দেগীভর পালন করে এসেছেন। আবূ মুলাইকা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন ঃ ‘এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল যে, দুই মহান ব্যক্তি অর্থাৎ আবু বকর (রা.) ও উমর (রা.) যেন প্রায় ধ্বংসই হয়ে যাচ্ছিলেন, যেহেতু তাঁরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে তাঁদের কণ্ঠস্বর উঁচু করেছিলেন যখন বানী তামীম গোত্রের প্রতিনিধি হাযির হয়েছিলেন।

তাদের একজন মুজাশিহ গোত্রের হাবিস ইব্ধসঢ়;ন আকরার (রা.) প্রতি সমর্থন করেন এবং অপরজন সমর্থন করেন অন্য একজনের প্রতি। বর্ণনাকারী নাফি’ (রা.) এর তাঁর নাম মনে নেই। তখন আবু বকর (রা.) উমরকে (রা.) বলেন ঃ ‘আপনিতো সবসময় আমার বিরোধিতাই করে থাকেন। উত্তরে উমর (রা.) আবু বকর (রা.)কে বলেন ঃ ‘আপনার এটা ভুল ধারণা’। এভাবে উভয়ের মধ্যে তর্কের ফলে তাদের কণ্ঠস্বর উঁচু হয়। তখন নিমোক্ত আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। ‘হে ঈমানদার ব্যক্তিরা, কখনো নিজেদের আওয়াযকে নবীর আওয়াযের উপর উঁচু আওয়াযে কথা বলো না, এমন যেন কখনো না হয় যে, তোমাদের সব কাজকর্ম (এ কারণেই) বরবাদ হয়ে যাবে এবং তোমরা তা জানতেও পারবে না’- সূরা আল হুজুরাত-০২। আবদুল্লাহ ইবন যুবাইর (রা.) বলেন ঃ ‘এরপর উমর (রা.) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে এত নিম্নস্বরে কথা বলতেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দ্বিতীয়বার তাকে জিজ্ঞেস করতেন। (ফাতহুল বারী ৮/৪৫৪)।

আগের জামানায় পথে-ঘাটে আমাদের স্কুল শিক্ষক অথবা মাদ্রাসার হুজুরকে দেখলে শ্রদ্ধায় নিজেদের মস্তক অবনত হয়ে যেত এবং কুশলাদি জিজ্ঞেস করতাম। কিন্তু সেই ঐতিহ্য আমরা এখন হারাতে বসেছি। এই আধুনিক যুগের কিশোর ছাত্ররা তাদের স্কুলশিক্ষক দেখলেই বিরুপ মন্তব্য করে। শ্রদ্ধাবোধের ধার ধারে না, অশালীন আচরণে বিব্রতকর অবস্থায় তাঁদেরকে ফেলে দেওয়া হয়। এমনকি শিক্ষকের গায়ে হাত তুলতেও দ্বিধা করে না। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের তাদের মনঃপুত না হলে পথিমধ্যে লাঞ্চিত ও অপমানিত করতেও কুন্ঠাবোধ করে না এই প্রজন্মের অবাধ্য কিশোর-ছাত্ররা। মানবতার মহান শিক্ষকদের উপনামে ডাকতেও তারা বিন্দুমাত্র দ্বিধা করে না।

আর এটি ১৫০০ বছর আগেই আল্লাহতায়ালা এভাবেই বলছেন ‘একজন আরেকজনকে (অযথা) দোষারোপ করবে না, আবার একজন আরেকজনকে খারাপ নাম ধরেও ডাকবে না, (কারণ) ঈমান আনার পর কাউকে খারাপ নামে ডাকা একটা বড় ধরনের অপরাধ, যারা এ আচরণ থেকে ফিরে না আসবে তারা যালেম’- সূরা আল হুজুরাত- ১১। আল্লাহ তা’আলা মানুষকে লাঞ্চিত ও অপমানিত করতে এবং তাদেরকে ঠাট্টা-উপহাস করতে নিষেধ করেছেন। হাদীসে আছে যে, গর্ব-অহংকার হল সত্য হতে বিমুখ হওয়া এবং মানুষকে ঘৃণ্য ও তুচ্ছ জ্ঞান করার নাম। (মুসলিম (১/৯৩)। আল্লাহ তা’আলা এর কারণ এভাবেই বর্ণনা করছেন যে, মানুষ যাকে লাঞ্চিত-অপমানিত করছে এবং উপহাসের পাত্র মনে করছে সেই হয়তো আল্লাহ তা’আলার নিকট বেশি মর্যাদাবান। পুরুষদেরকে এটা হতে নিষেধ করার পর পৃথকভাবে নারীদেরকেও এটা হতে নিষেধ করছেন। আল্লাহতায়ালা একে অপরকে দোষারোপ করা হারাম বলে ঘোষণা করছেন।

আল্লাহতায়ালা অন্য এক আয়াতে বলেন, ‘দুর্ভোগ প্রত্যেকের, যে পশ্চাতে ও সম্মুখে লোকের নিন্দা করে’- সূরা হুমাযাহ্ধসঢ়;-০১। আজ সমাজে আমরা কম বেশি সবাই অনুমান নির্ভর কথা বলি, একে অপরকে সন্দেহ করি, একে অপরের দোষ খুঁজি, গীবত করি। এগুলোর ব্যাপারে হুঁশিয়ারি করে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনুল করীমে বলছেন, ‘হে ঈমানদার ব্যক্তিরা, তোমরা বেশী বেশী অনুমান করা থেকে বেঁচে থাকো, কিছু কিছু অনুমান (আসলেই) অপরাধ এবং একে অপরের (দোষ খোঁজার জন্যে তার) পেছনে গোয়েন্দাগিরি করো না, একজন আরেকজনের গীবত করো না; তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে- (অবশ্যই) তোমরা এটাকে অত্যন্ত ঘৃণা করো; আল্লাহকে ভয় করো; নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা তাওবা কবুল করেন তিনি একান্ত দয়ালু’- সূরা আল হুজুরাত-১২। আল্লাহ তা’আলা স্বীয় মু’মিন বান্দাদেরকে সন্দেহ পোষণ করা হতে, অপবাদ দেয়া হতে, পরিবার পরিজন এবং অপর লোকদের অন্তরে অযথা ভয় সৃষ্টি করা হতে নিষেধ করছেন। তিনি বলছেন যে, অনেক সময় এরূপ ধারণা সম্পূর্ণ পাপের কারণ হয়ে থাকে। সুতরাং মানুষের এ ব্যাপারে সম্পূর্ণরূপে সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত। আমীরুল মু’মিনীন উমর ইব্ধসঢ়;নে খাত্তাব (রা.) বলেন ঃ ‘তোমার মুসলিম ভাইয়ের মুখ হতে যে কথা বের হয় তুমি যথা সম্ভব ওটার প্রতি ভাল ধারণাই পোষণ করবে’- (দুররুল মানসুর ৬/৯৯)।

আবূ হুরাইরাহ (রা.) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সালআম বলেছেন ঃ তোমরা কু-ধারণা হতে বেঁচে থাক, কু-ধারণা সবচেয়ে বড় মিথ্যা কথা। তোমরা কারও গোপন তথ্য সন্ধান কর না, একে অপরের পশ্চাতে নিন্দা করনা, একে অপরকে ঘৃণা কর না, একে অপর থেকে পৃথক থেক না এবং হে আল্লাহর বান্দারা! সবাই ভাই ভাই হয়ে যাও।’ (মুআত্তা ২/৯০৭, ফাতহুল বারী ১০/৪৯৯)। আনাস (রা.) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন ঃ ‘তোমরা একে অপরের সাথে মতবিরোধ কর না, একে অপরের সাথে মিলা-মিশা পরিত্যাগ কর না, একে অপরের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ পোষণ কর না, বরং আল্লাহর বান্দারা সবাই মিলে ভাই ভাই হয়ে যাও। কোন মুসলিমের জন্য এটা বৈধ নয় যে, সে তার মুসলিম ভাইয়ের সাথে তিন দিনের বেশি কথাবার্তা বলা ও মিলা-মিশা করা পরিত্যাগ করে’ মুসলিম ৪/১৯৮৩, তিরমিযী ৬/৪৬। ইসলামে শিষ্টাচার যে কত মহামূল্যবান সম্পদ তা উপরোক্ত কোরআন হাদীসের আলোকে বুঝা যায়। অতএব এটি প্রাত্যহিক জীবনের সাথে ঘনিষ্ঠ করে নেয়াই প্রকৃত মুমিন বান্দার অন্যতম উপাদান হতে পারে।

ডা. মোহাম্মদ ওমর ফারুক সিনিয়র কনসালটেন্ট (ইএনটি), জেনারেল হাসপাতাল, রাঙ্গামাটি।

পূর্বকোণ/এএ

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 623 People

সম্পর্কিত পোস্ট