চট্টগ্রাম শুক্রবার, ২৪ জানুয়ারি, ২০২০

সর্বশেষ:

১২ ডিসেম্বর, ২০১৯ | ৮:০৯ অপরাহ্ন

অনলাইন ডেস্ক

সূচিকে আন্তর্জাতিক আদালতে নিয়ে ছাড়ল লড়াকু গাম্বিয়া

রোহিঙ্গাদের প্রতি ইতিহাসের নির্মম নিপীড়ন দেখেও যেখানে বিশ্বের পরাশক্তিগুলো মুখ বুজে ছিল সেখানে আফ্রিকার ছোট একটা দেশ দেখিয়ে দিল প্রতিবাদ কাকে বলে, কীভাবে করতে হয়। আদালতের কাঠগড়ায় অং সান সুচিকে দাঁড় করিয়ে তাবৎ বিশ্বের সমীহ আদায় করে নিয়েছে দেশটি। উজ্জ্বল ইতিহাস সমৃদ্ধ গাম্বিয়া মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বর্বরোচিত এই গণহত্যার বিচার চেয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে ঠুকে দিয়েছে মামলা। গত মঙ্গলবার থেকে মামলাটির শুনানি চলছে।

বিচার কার্যক্রমে মামলায় বাদি গাম্বিয়া, আসামি মিয়ানমার ছাড়াও ওআইসিসিসহ বেশ কিছু দেশ ও সংস্থা অংশ নিয়েছে। আদালতে অং সান সু চি মিয়ানমারের পক্ষে হাজির হয়েছেন। গাম্বিয়ার প্রতিনিধি দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন দেশটির অ্যাটর্নি জেনারেল ও বিচারমন্ত্রী আবুবকর মারি তামবাদু। ২০১৮ সালের মে মাসে ঢাকায় ওআইসি পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলনে তামবাদু তাঁর দেশের নেতৃত্ব দেন। ঢাকায় বৈঠকে বসার আগে কক্সবাজারের উখিয়ায় রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনে গিয়েছিলেন তিনি। উখিয়ার জরাজীর্ণ শরণার্থী শিবিরে বসে তিনি রোহিঙ্গাদের মুখ থেকে শুনেছিলেন নির্যাতনের হৃদয় বিদারক কাহিনী। সব শুনে নিজে কেঁদেছিলেন, কাঁদিয়েছিলেন অন্যদেরও। সেদিনই তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন রোহিঙ্গাদের পক্ষে লড়বেন। মিয়ানমারকে মানবতাবিরোধী অপরাধে আদালতে দাঁড় করাবেন। এরপর থেকে তামবাদু আন্তর্জাতিক পরিসরে যেখানেই কথা বলেছেন, সেখানেই মিয়ানমারের নৃশংসতার কথা উল্লেখ করেছেন।

২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে মন্তব্য করেছিলেন রুয়ান্ডার গণহত্যার সঙ্গে তিনি রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর নৃশংসতার মিল খুঁজে পাচ্ছেন। কাজেই মিয়ানমারকে আদালতে নেয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। তার এই কথা যে নিছক বুলি আওড়ানো ছিল না তার প্রমাণ আজকের মামলা। আইসিজেতে আসার কারণ ব্যাখ্যা করে আবু বকর মারি তামবাদু বলেন, একমাত্র এই আদালতই শান্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে পারে, আশা জাগাতে পারে। আন্তর্জাতিক বিচার ব্যবস্থাকে অবশ্যই কার্যকর করতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা চাই আইসিজে মিয়ানমারকে বলুক যে এখনই রোহিঙ্গা শিশুদের হত্যা বন্ধ করতে হবে, নৃশংসতার অবসান ঘটাতে হবে।

প্রতিবাদকারী এ দেশটি সম্পর্কে বাংলাদেশের মানুষের আগ্রহ জন্মেছে প্রচুর। অনেকেই জানতে চান, কেমন দেশ গাম্বিয়া? কোথায় এদেশের অবস্থান।

গাম্বিয়ার পরিচয় : পশ্চিম আফ্রিকার ছোট্ট একটি দেশের নাম গাম্বিয়া। রাষ্ট্রীয় নাম গাম্বিয়া ইসলামি প্রজাতন্ত্র। এটি আফ্রিকা মহাদেশের মূল ভূখন্ডের ক্ষুদ্রতম দেশ। দেশটির উত্তর, পূর্ব ও দক্ষিণ দিকে সেনেগাল দ্বারা পরিবেষ্টিত। আর পশ্চিমে রয়েছে মহাসাগর। অথৈই নীল জলরাশির আটলান্টিক মহাসাগর। গাম্বিয়া নদী থেকেই দেশটির নামকরণ। নদীটির দেশের মধ্যভাগ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে আটলান্টিক মহাসাগরে পতিত হয়েছে। আর এই নদীতে কেন্দ্র করেই মূলত গাম্বিয়া। সাগর উপকূল থেকে প্রায় মহাদেশের প্রায় ৩২০ কিলোমিটার অভ্যন্তর পর্যন্ত চলে গেছে। তবে এর সর্বোচ্চ প্রস্থ মাত্র ৫০ কিলোমিটার। বন্দর শহর বাঞ্জুল দেশটির রাজধানী। সেরেকুন্দা দেশের বৃহত্তম শহর। গাম্বিয়া একটি কৃষিপ্রধান দেশ। এখানকার বেশির ভাগ মানুষ দরিদ্র। চীনাবাদাম এখানকার প্রধান উৎপাদিত শস্য এবং প্রধান রপ্তানি দ্রব্য। পর্যটন শিল্প থেকেও আয় হয়। আটলান্টিক সাগরের উপকূলের সমুদ্রসৈকতগুলিতে ঘুরতে এবং গাম্বিয়া নদীর বিচিত্র পাখপাখালি দেখতে পর্যটকেরা দেশটিতে আসেন। গাম্বিয়াকে শুধু পাখির দেশ বললেও ভুল হবে না। গাম্বিয়া ১৯ শতকে একটি ব্রিটিশ উপনিবেশে পরিণত হয়। ১৯৬৫ সালে দেশটি স্বাধীনতা লাভ করে। স্বাধীনতার পর দেশটি একটি স্থিতিশীল গণতন্ত্র হিসেবে গণ্য হয়। ১৯৯৪ সালে একটি রক্তপাতহীন সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ করা হয় এবং সামরিক নেতা ইয়াহিয়া জাম্মেহ তার স্থান নেন। জাম্মেহ পরবর্তীকালে গাম্বিয়ার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিজয়ী হন। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে জামমেহকে পরাজিত করার পরে জানুয়ারী ২০১৭ সালে অ্যাডামা ব্যারো গাম্বিয়ার তৃতীয় রাষ্ট্রপতি হন। কয়েক বছর আগে গাম্বিয়া উপনিবেশিক ধারা থেকে বেরিয়ে এসে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করেছে। গাম্বিয়ার ৯৫ ভাগ মানুষ মুসলিম, বাকি ৫ ভাগ খ্রিস্টান বা অন্যান্য। তবে সংখ্যালঘুরা তাদের ধর্ম বাধাহীনভাবে পালন করতে পারে। ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ঘোষণার পর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া জাম্মেহ রমজান মাসের পবিত্রতা রক্ষায় গাম্বিয়ায় নাচ-গান এবং ড্রামসহ সব ধরনের বাদ্যযন্ত্র বাজানো নিষিদ্ধ করেছিলেন। তবে আজ যে গাম্বিয়া অনন্য সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে মানবতার পাশে দাঁড়িয়েছে তাদের ইতিহাস কিন্তু মোটেও মসৃণ নয়। অনেক কাঠ-খড় পুড়িয়ে তারা আজকের এই গণতান্ত্রিক অবস্থানে এসেছে।

আফ্রিকার অন্যান্য রাষ্ট্রের মতো গাম্বিয়াও দাস প্রথার শৃঙ্খলে আবদ্ধ ছিল শতাব্দীর পর শতাব্দী। গাম্বিয়ার লিখিত ইতিহাস থেকে জানা যায়, নবম ও দশম শতাব্দীতে এখানে আরব মুসলমানরা ব্যবসায়িক কারণে আসতে শুরু করে। দাস প্রথার গোড়াপত্তন তাদের হাত ধরেই হয়। তখন গাম্বিয়া নামে কোনো রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ছিল না। এটি ছিল মালি সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত। চৌদ্দ শতক থেকে দেশটি ধীরে ধীরে গাম্বিয়া নামে পরিচিত হতে শুরু করে। জানা যায়, নবম ও দশম শতাব্দীতে গাম্বিয়া অঞ্চলে আরব ব্যবসায়ীদের আগমণ ঘটে। দশম শতাব্দীতে, মুসলিম বণিক এবং আলেমগণ পশ্চিম আফ্রিকায় বেশ কয়েকটি বাণিজ্যিক কেন্দ্র স্থাপন করেছিলেন। তারা ট্রান্স-সাহারান বাণিজ্য রুট স্থাপন করেছিলেন, যার ফলে এ অঞ্চল থেকে সোনা ও হাতির দাঁতের রফতানি করা হতো। পাশাপাশি বিভিন্ন তৈরি পণ্য আমদানি করা হত। আর এভাবেই এক সময় ইসলামের ছায়াতলে আসে গাম্বিয়া। দেশটির অধিকাংশ মানুষ সুন্নী মুসলমান। তারা মূলত মালেকী মাযহাবের অনুসারী। তবে কিছু শিয়া মতালম্বীও রয়েছে।

গাম্বিয়া আন্তর্জাতিক বিষয়ে বিশেষত পশ্চিম আফ্রিকান এবং ইসলামিক বিষয়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে থাকে। যদিও বিদেশে দেশটির সীমাবদ্ধ প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। এর আগে লাইবেরিয়া এবং সিয়েরা লিওনের গৃহযুদ্ধের সমাধানে গাম্বিয়া সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। সবার কাছে সুপরিচিত ইসলামী ব্যক্তিত্ব ড. বিলাল ফিলিপস কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ইসলামিক অনলাইন বিশ্ববিদ্যালয়ের (আইওইউ) মূল ক্যাম্পাস গাম্বিয়ার কানিফিং শহরে। এই অনলাইনভিত্তিক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম বিশ্বের ২৫০টির মতো দেশে রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির চার লাখ ৩৫ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী রয়েছে। শিক্ষার ক্ষেত্রে গাম্বিয়া খুব এগিয়ে না থাকলে ছোটবেলা থেকেই শিশুদের ধর্মীয় শিক্ষা দেয়া হয়। অধিকাংশ ছেলেমেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না পেলেও আরবী ভাষা ও কুরআন শিক্ষা দেয়া হয়।

কে এই আবুবাকার?

গাম্বিয়ান রাজনীতিবিদ এবং আইনজীবী হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি পাওয়া আবুবাকার মারি তামবাদু ২০১৭ সালে ৭ ফেব্রুয়ারী থেকে গাম্বিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট অ্যাডামা ব্যারোর মন্ত্রিসভায় বিচারমন্ত্রী ও অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়িত্ব পালন করেছেন। এর আগে তিনি রুয়ান্ডার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আইনজীবী হিসাবে কাজ করেছেন। আবুবাকার মারি তামবাদুর জন্ম ১৯৭২ সালের ১২ ডিসেম্বর। তিনি মারি তামবাদু নামে পরিচিত। তার পিতার নাম আলহাজ মারি তামবাদু। গাম্বিয়ার রাজধানী বানজুলে তার পড়াশুনা শুরু করেন। পরবর্তীতে উচ্চ শিক্ষার জন্য ব্রিটেন যান। ব্রিটেনের ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি করেন। লিংকন’স ইন থেকে বার-এট-ল ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর তিনি ইউনিভার্সটি অব লন্ডন থেকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের উপর এলএলএম সম্পন্ন করেন। তামবাদু গাম্বিয়ায় পাবলিক প্রসিকিউটর হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।

২০০৩ সালে তিনি গাম্বিয়া ছেড়ে তানজানিয়ায় চলে যান। সেখানে রুয়ান্ডার জন্য গঠিত জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সহযোগী আইনী কর্মকর্তা হিসাবে ২০০৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১২ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত প্রসিকিউটরের বিশেষ সহকারী হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ সময় তিনি রুয়ান্ডার সেনাবাহিনীর প্রাক্তন জেনারেল আগস্টিন বিজিমুঙ্গুসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছিলেন। ২০১৬ সালে এই বিচার কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর তিনি নিজ দেশে ফিরে আসেন।

ছয়টি ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারেন। সেগুলো হলো: ইংরেজি, ফরাসী, ওলোফ, মান্ডিংকা, ক্রিও এবং সোনিনকে। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচারের শুনানির প্রথম দিন মিয়ানমারকে কাণ্ডজ্ঞানহীন হত্যাকাণ্ড বন্ধের দাবি জানিয়েছেন তামবাদু।

শুনানিতে আবুবকর মারি তামবাদু বলেছেন, ‘গাম্বিয়া যা চায় তা হচ্ছে, আপনারা মিয়ানমারকে এই কাণ্ডজ্ঞানহীন হত্যাকাণ্ড বন্ধ করতে বলুন।’ উদ্বোধনী বক্তব্যে তামবাদু বলেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গা সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে চলতে থাকা গণহত্যা বন্ধে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক আদালতের বিচারকদেরকে ব্যবস্থা নিতেই হবে।

 

পূর্বকোণ/এস-রাশেদ

The Post Viewed By: 265 People

সম্পর্কিত পোস্ট