চট্টগ্রাম শনিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২২

সর্বশেষ:

৪ আগস্ট, ২০২২ | ৩:১৯ অপরাহ্ণ

ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক

তাইওয়ান প্রণালী : ১৯৪৯ সাল থেকেই সমস্যা-জর্জরিত

২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় গণচীনে ‘জাপানী হামলা প্রতিরোধ’ যুদ্ধকালে চীনের কুওমিনতাং পার্টি চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে জাপানের আগ্রাসন বিরোধী জাতীয় যুক্তফ্রণ্ট গড়ে তুলে জাপানী সাম্রাজ্যবাদীদের আক্রমণ প্রতিরোধ করে। জাপান-বিরোধী এ প্রতিরোধ যোদ্ধারা (জাতীয় যুক্তফ্রণ্ট) জয়ী হবার পর চিয়াং কাইশেকের নেতৃত্বাধীন কুওমিনতাং গোষ্ঠী (চীন প্রজাতন্ত্র) যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনপুষ্ট হয়ে সারা দেশ জুড়ে গৃহযুদ্ধ বাধায়।

 

অন্যদিকে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে চীনা জনগণ তিন বছরের বেশি সময় ধরে মুক্তিযুদ্ধ চালায়। তখনকার কুওমিনতাং গোষ্ঠির অনুসৃত নীতি গণবিরোধী বিবেচিত হবার দরুণ সারা দেশের বিভিন্ন জাতির জনগণ এই গোষ্ঠীকে ঘৃণা করতে শুরু করে। ফলে কুওমিনতাং পার্টির ‘চীন প্রজাতন্ত্র’ (বা রিপাবলিক অব চায়না) সরকার উৎখাত হয়। ১৯৪৯ সালের ১ অক্টোবর মূলতঃ কমিউনিস্ট পার্টি-নির্ভর ‘চীন গণ প্রজাতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সেটাই চীনের একমাত্র বৈধ সরকার হয়ে দাঁড়ায়। কুওমিনতাং গোষ্ঠীর কিছু সৈন্য এবং সরকারি কর্মকর্তা সরে গিয়ে তাইওয়ানে আশ্রয় নেয়। ১৯৪৫-এ জাপানের আত্মসমর্পনের পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মিত্রদের পক্ষ থেকে তাইওয়ানের দখল নিয়েছিল তৎকালীন চীন প্রজাতন্ত্র। বিপদকালে সেটাতেই ঘাঁটি গড়ল তারা। তখনকার মার্কিন সরকারের সমর্থনে তাইওয়ান প্রণালীর দু’ তীরের মধ্যে বিচ্ছিন্নতার সৃষ্টি হলো।

 

এ প্রণালীর একদিকে এখন স্ব-শাসিত তাইওয়ান এবং অপর পাশে বিশাল কর্তৃত্ববাদী প্রতিবেশি গণ-প্রজাতন্ত্রী চীন। মার্কিন হাউসের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির এই সপ্তাহে তাইওয়ান সফরে এ প্রণালীতে উত্তেজনা যখন তীব্র সংকটে পরিণত, তখন ঐতিহাসিকরা আগের তিনটি আলোড়ন সৃষ্টিকারী মুহূর্তকেও চিহ্নিত করেছেন।

প্রথম তাইওয়ান প্রণালী সংকট
চীনা গৃহযুদ্ধের শেষে, মাও সেতুং-এর কমিউনিস্ট বাহিনী সফলভাবে চিয়াং কাই-শেকের জাতীয়তাবাদীদের (চীন প্রজাতন্ত্রী) তাড়িয়ে দিয়েছিল, যারা তাইওয়ানে ‘ঠাঁই’ গড়েছিল। ফলস্বরূপ প্রণালীর দু’ প্রন্তের অবস্থা দাঁড়ায় এরূপ- মূল ভূখণ্ডে পিপলস রিপাবলিক অফ চায়না (পিআরসি) এবং তাইওয়ানে রিপাবলিক অব চায়না (আরওসি)। সংকটের শুরু হয় ১৯৫৪’র আগস্টে যখন জাতীয়তাবাদীরা মূল ভূখণ্ড থেকে মাত্র কয়েক মাইল দূরের দুটি ছোট দ্বীপ (তাইওয়ান শাসিত) কিনমেন এবং মাতসুতে হাজার হাজার সৈন্য স্থাপন করে। কমিউনিস্ট চীন দ্বীপগুলিতে ভারী গোলা ও বোমাবর্ষণ করে এবং তাইপেই থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার উত্তরে ইজিয়াংশান দ্বীপপুঞ্জ সফলভাবে দখলের মাধ্যমে এর প্রতিক্রিয়া জানায়। সঙ্কট শেষ পর্যন্ত প্রশমিত হয় বটে, কিন্তু এ ঘটনা চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে প্রায় সরাসরি সংঘর্ষের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছিল।

দ্বিতীয় সংকট
ক’বছর পর- ১৯৫৮ সালে আবারও সংকট শুরু হয় যখন মাও-এর বাহিনী কিনমেন এবং মাতসুতে আবারও জাতীয়তাবাদী সৈন্যদের বিতাড়িত করার জন্য তীব্র বোমাবর্ষণ শুরু করে। এই দ্বীপগুলি হারালে জাতীয়তাবাদীদের পতন হতে পারে এবং বেইজিং শেষ পর্যন্ত তাইওয়ানও দখল করে নিতে পারে বলে উদ্বিগ্ন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোয়াইট ডি আইজেনহাওয়ার তার সামরিক বাহিনীকে তাদের তাইওয়ানী মিত্রদের রক্ষার নির্দেশ দেন। যুক্তরাষ্ট্র এক পর্যায়ে এমনকি চীনের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েনের কথাও বিবেচনা করে। উপকূলীয় দ্বীপগুলি নিতে না পেরে বা জাতীয়তাবাদীদের বশ্যতা স্বীকার করাতে না পেরে বেইজিং শেষমেষ যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছিল। মাওয়ের বাহিনী ১৯৭৯ পর্যন্ত কিনমেন-এ মাঝে মাঝে গোলাবর্ষণ চালিয়ে গেলেও উত্তেজনাপূর্ণ অচলাবস্থাসহ মোটামুটি একটা যুদ্ধবিরতি বজায় ছিল।

তৃতীয় সংকট
পরবর্তী উল্লেখযোগ্য সংকটটি এসেছিল প্রায় ৩৭ বছর পর। এই মধ্যবর্তী দশকগুলিতে, চীন এবং তাইওয়ান- দু’টি দেশেই অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। মাওয়ের মৃত্যুর পর, চীন কমিউনিস্ট পার্টি-নিয়ন্ত্রিত ছিল ঠিকই কিন্তু নিজেকে ‘সংস্কার ও বিশ্বের সামনে উন্মুক্ত করার’ প্রয়াস জোরেশোরেই শুরু করে দিয়েছিল। তাইওয়ানও ইতিমধ্যে, চিয়াং কাই-শেকের কর্তৃত্ববাদী বছরগুলিকে ঝেড়ে ফেলে এবং একটি প্রগতিশীল গণতন্ত্রে বিকশিত হতে শুরু করেছে। অনেকেই স্বতন্ত্রভাবে তাইওয়ানিজ (এবং চীনা নয়) পরিচয় গ্রহণ করে।
১৯৯৫ সালে আবার উত্তেজনার পারদ বিস্ফোরিত হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তাইওয়ানের রাষ্ট্রপতি লি তেং-হুই-এর স্বনামে একটা বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শনে যাবার প্রতিবাদস্বরূপ তাইওয়ানের আশেপাশের জলে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা শুরু করে দেয় বেইজিং। বেইজিং লি-কে বিশেষভাবে ঘৃণা করত- তার কারণ হলো- তিনি তাইওয়ানকে একটি ‘স্বাধীন রাষ্ট্র’ ঘোষণা করে বসেছিলেন।
এক বছর পরে, তাইওয়ানে প্রথম সরাসরি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রাক্কালে, বেইজিংয়ের ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা আরো ব্যাপকতা পেয়েছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের দুটি বিমানবাহী জাহাজের উপস্থিতি লি’র নির্বাচনে বড় ব্যবধানে জয়লাভ করায় দারুণ সহায়ক ভূমিকা পালন করেছিল। এর এক বছর পরে, প্রথম মার্কিন হাউস স্পিকার হিসেবে নিউট গিংরিচ তাইওয়ান সফর করে নজির স্থাপন করেন। ন্যান্সি পেলোসিও কী ২৫ বছর পরে সে পথই অনুসরণ করলেন? [তথ্য সহায়তা : এনডিটিভি]

 

 

পূর্বকোণ/আর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট