চট্টগ্রাম রবিবার, ২২ মে, ২০২২

সর্বশেষ:

২৩ জানুয়ারি, ২০২২ | ১০:৩৪ পূর্বাহ্ণ

উন্নয়নশীল দেশে বিনিয়োগ প্রবাহে ঝুঁকি বাড়ার সংশয়

এই মুহূর্তে পুরো বিশ্বের দৃষ্টি পূর্ব ইউরোপে ঘনিয়ে উঠা সম্ভাব্য যুদ্ধের ‘আভাস’র দিকে। নেতৃবৃন্দের বিবৃতি, উচ্চ পর্যায়ের কূটনৈতিক বৈঠক আর সৈন্য চলাচলের দৈনিক সংবাদ পরিক্রমায় চোখ সবার। কিন্তু মার্কিন ও রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীদ্বয়ের কিংবা ইইউ’র উচ্চপদস্থদের একের পর এক বৈঠকের পরই আমরা আসলে বুঝতে পারি- ‘ব্যাপার গুরুতর’। প্রশ্ন হলো ওখানে আসলে হচ্ছেটা কী? ইউরোপ কিংবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের বিশ্বের এতে করে কতটা উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত?
এখন সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়টি হল- ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসনের সমূহ সম্ভাবনা। রাশিয়া ইউক্রেনের সীমান্তে এক লাখেরও বেশি সৈন্য’র সমাবেশ ঘটিয়েছে; কিন্তু দেশটিতে আক্রমণেচ্ছার কথা অস্বীকার করেছে। তবে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপ সুনির্দিষ্ট কিছু দাবির প্রতি সহমত পোষণ না করলে ‘অনির্দিষ্ট পদক্ষেপ’র হুমকি দিয়েছেন। এই দাবিগুলির মধ্যে রয়েছে- ইউক্রেনের মতো দেশগুলিকে অন্তর্ভুক্ত করে ন্যাটোর আর কোনওরূপ স¤প্রসারণ যেন না করা হয়। অবশ্য ইউক্রেন ন্যাটোর সদস্যপদ পাওয়ার জন্য ইতোমধ্যে আবেদন করেছে। মার্কিন রাষ্ট্রপতি জো বাইডেন বা ন্যাটো- কেউই এ ‘দাবি’র প্রতি সাড়া দেননি। তাদের বক্তব্য হলো- দেশগুলির স্ব স্ব ‘ভবিষ্যত নিরাপত্তা বিষয়ক সিদ্ধান্ত’ নেওয়ার সার্বভৌম অধিকার রয়েছে। তবে এটা নিশ্চিত যে ইউক্রেন-যুদ্ধ যদি শুরু হয়েই যায় তাহলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপকে সবচেয়ে গুরুতর রাজনৈতিক ও সামরিক সঙ্কটে নিমজ্জিত হতে হবে।
এ অঞ্চলের সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অবস্থানের উত্থান-পতনের অন্তর্নিহিত অনেক ইতিহাস রয়েছে। প্রেসিডেন্ট পুতিন বলেছেন সোভিয়েত ইউনিয়নের (ইউএসএসআর) ভেঙে যাওয়া ২০ শতকের ‘সবচেয়ে খারাপ ভূ-রাজনৈতিক বিপর্যয়’। তিনি বিশ্বাস করেন, এখন রাশিয়ার উচিত তার হ্রাানো সেই ‘প্রভাবের ক্ষেত্র’টি পুনরুদ্ধার করা, ন্যাটো যেমন তার ১৪টি প্রতিষ্ঠাতা সদস্য থেকে আজ ৩০ টিরও বেশি দেশের বিরাট এক জোটে পরিণত হয়েছে। পুরনো সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত অনেক দেশও এ জোটে ভিড়েছে। এ ক্ষণে পুতিন মনে করছেন, রাশিয়া ন্যাটোর এই ‘স¤প্রসারণ’ দ্বারা হুমকির সম্মুখীন। তাই তিনি ইউরোপে ক্ষমতার ভারসাম্য পুনরুদ্ধার করতে চাইছেন।
আরও একটু পিছনে ফিরে গেলে দেখা যাবে, সেই ৯ শতক থেকেই রাশিয়ার সাথে ইউক্রেনের একটা অংশীদারিত্বের সম্পর্ক রয়েছে। বহু বছর ধরে এটি ‘জার’ (Tzar) সাম্রাজ্যভুক্ত ছিল এবং পরে সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ হয়। গত বছর পুতিন তার প্রকাশিত দীর্ঘ এক নিবন্ধে বলেছিলেন যে ‘রুশ ও ইউক্রেনিয়রা একক সত্তা, এক জাতি’। পুতিনের দৃষ্টিকোণ থেকে ন্যাটোর কাছে ইউক্রেনকে হারানো একটি ‘বড় ক্ষতি’ হবে।
অন্যদিকে, ইউক্রেন একটি সার্বভৌম গণতান্ত্রিক দেশ। দেশটি প্রকাশ্যে বলেছে, আত্মনিয়ন্ত্রণের নীতির ভিত্তিতে ইউক্রেনের জনগণই সিদ্ধান্ত নেবে তারা ন্যাটোতে যোগ দেবে কিনা। একটি সর্বাত্মক যুদ্ধের সম্ভাবনা সম্ভবত এখনো নেই কিন্তু বাস্তবতা হয়তো এ ‘ধারণা’কে মিথ্যে প্রমাণিত করতে পারে। এটা ঘটতে পারে পূর্ব ইউক্রেনের ‘ডনবাস’র মতো বিতর্কিত এলাকায় সম্ভাব্য সেনা অনুপ্রবেশের সাথে সাথে। রাশিয়া গত কয়েক বছর ধরেই এ অঞ্চলে সক্রিয় রয়েছে। এছাড়া রয়েছে সাইবার যুদ্ধ’র ঝুঁকি। গত সপ্তাহে ইউক্রেনের অবকাঠামোতে সাইবার হামলা হয়েছে যার জন্য ইউক্রেন ও ন্যাটো রাশিয়াকেই দায়ী করেছিল।
তবুও রাশিয়া যদি ইউক্রেনে ঢুকেই পড়ে, তাহলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলো অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং অন্যান্য পদক্ষেপের হুমকি দিয়ে রেখেছে। এই পদক্ষেপ এবং পাল্টা পদক্ষেপ ‘শক্তি’র বাজারে (ইউরোপের গ্যাস সরবরাহের ৪০% রাশিয়া থেকে আসে) গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। তাছাড়া সাধারণ বাণিজ্য’র ক্ষেত্রে যদি রাশিয়াকে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয় তবে সেটা ‘দারুণ আলোরণ সৃষ্টিকারী’ কিছু একট হতে বাধ্য।
এখন নিকট-ভবিষ্যতে ইউক্রেনে ‘সামান্য রুশ বাড়াবাড়ি’র কী পরিণতি হতে পারে আমরা একটু কল্পনা করতে পারি। আমরা হয়তো দেখবো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটো দেশগুলির দ্বারা আরোপিত সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞা এবং/অথবা রুশ-ইউক্রেন সীমান্তবর্তী দেশগুলিতে আরও বেশি সামরিক বিনিয়োগ এবং সেনা মোতায়েনের দৃশ্য। তাছাড়া একটা ‘সাইবার যুদ্ধ’র-ও অভিজ্ঞতা আমরা লাভ করতে পারি। নিঃসন্দেহে এই ঘটনাগুলি বিশ্বের বাকি অংশকে প্রভাবিত করবে।
বিশ্ব জ্বালানি বাজার আন্তঃসংযুক্ত হওয়ায় ইউরোপে গ্যাস সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটলে ‘শক্তি’র দাম (তেল ও গ্যাস) বাড়বে। সাইবার যুদ্ধের বৃদ্ধি ঘটলে বিশ্বব্যাপী অবকাঠামোর স্থিতিশীলতার উপর দ্বিতীয় এবং তৃতীয় পর্যায়ের প্রভাব পড়তে পারে। সাইবার অপরাধীরা তাদের অসাধু লক্ষ্যপূরণে তৎপর হয়ে উঠবে। বৃহত্তর পরিসরে দেখলে, ইউক্রেনে আগ্রাসন সম্ভবত বিশ্বব্যাপী স্টক মার্কেটকে বিপর্যস্ত করবে কারণ ইতোমধ্যেই কোভিড, মুদ্রাস্ফীতি এবং সরবরাহ চেইন ইত্যাদি নিয়ে বিনিয়োগকারীরা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। যার অর্থ উন্নয়নশীল দেশগুলিতে বিনিয়োগ প্রবাহে ঝুঁকি বেড়ে যাবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে বর্তমানে ২২ থেকে ২৫ বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ গার্মেন্টস পণ্য রপ্তানি করে থাকে বাংলাদেশ। যদি অনাকাক্সিক্ষতভাবে যুদ্ধ লেগে যায় তাহলে এই বিপুল পরিমাণ রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হবে। এছাড়া বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ২৫ শতাংশ থেকে ৩০ শতাংশ বেড়ে যাবে। অর্থাৎ, ইউক্রেনে উত্তেজনা বৃদ্ধির পরিণতি কেবল একটি ‘ইউরোপীয় সমস্যা’ হিসেবে আর থাকছে না।
এবারে আরও একটু পিছিয়ে যাই। এ ক্ষণে আমাদের সকলের স্বীকার করা উচিত হবে যে, ইউক্রেন সংকটের মূলে রয়েছে- ইতিহাস, জাতীয় পরিচয়, ভূ-রাজনৈতিক আকাক্সক্ষা এবং নীতির সংমিশ্রণ। এটা এমন একটা ‘অস্থির মিশ্রণ’ যা বিশ্বব্যাপী পাঠকদের কাছে খুব পরিচিত। এশিয়া, আফ্রিকা বা মধ্যপ্রাচ্যে- যেদিকেই তাকানো যাকনা কেন ইউক্রেন-পরিস্থিতির সাযুজ্য খুঁজে পেতে মোটেই বেগ পেতে হবে না।
এরই মাঝে যুদ্ধের দামামা বাজতে শুরু করেছে জোরে শোরে। আর বাড়ছে দাবি-পাল্টা দাবির গতি। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে কোনোও সহজ সমাধান নেই। তবে এটাও ঠিক বিশ্ব-নেতাদের উত্তেজনা প্রশমন এবং অধিকতর সতর্কতা অবলম্বন করার এটাই সময়। পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধি করে আবেগাদির লাগাম টেনে ধরে ‘কূটনীতি’কে তার শ্রমসাধ্য প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যাবার সুযোগ দেয়া উচিত। অন্যথায়, ইতিহাসের শিক্ষা ভুলে গিয়ে আরও অস্থিরতার পথে নেমে যাওয়া খুব সহজ।

লেখক: ওয়াহিদ জামান, ওয়াশিংটন
# সিইও, ডব্লিউএন্ডএ কনসাল্টিং : প্রাক্তন প্রধান কৌশলী ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা হারশে (Hershey)।
# ‘ফার্মার ব্রাদার্স’র পরিচালনা পরিষদের সদস্য।
এছাড়াও ‘ফরচুন ফাইভ হানড্রেড’ কোম্পানির বেশ ক’টি প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। বর্তমানে উদ্যোক্তাদের পরামর্শ আর সিনিয়র এক্সিকিউটিভদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন।

পূর্বকোণ/এএইচ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট