চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২১

২ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ | ১১:৫১ পূর্বাহ্ণ

মেজর (অব.) মো. এমদাদুল ইসলাম

রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশকে কৌশলী হতে হবে

মিয়ানমার সেনাবাহিনী গতকাল (১ ফেব্রুয়ারি) সেদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে নিয়েছে। ইতিমধ্যে অং সান সুচিসহ সেদেশের প্রেসিডেন্টকে আটক করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, গত ৮ নভেম্বর ২০২০ অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে অং সান সুচি’র দল এনএলডি শতকরা প্রায় ৮৩ শতাংশ ভোট পেয়ে পার্লামেন্টে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। এই নির্বাচনে এনএলডি’র প্রতিপক্ষ ছিল সেনা সমর্থিত এসডিপি বা স্টেট ডেভেলপমেন্ট পার্টি। তারা নির্বাচনে এনএলডি’র কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। সেনাবাহিনী নির্বাচনে এসডিপি’র চরম পরাজয় মেনে নেয়নি। এই প্রেক্ষাপটে সেনাবাহিনী নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ উত্থাপন করে এবং এসব অভিযোগের তদন্ত দাবি করে। অং সান সুচির সরকার তা করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে ১ ফ্রেব্রুয়ারি পার্লামেন্ট অধিবেশন আহ্বান করে। সেনাবাহিনী বিষয়টিকে সহজভাবে নেয়নি বরং তারা যে সুযোগ খুঁজছিলেন এ ঘটনা তাদের সামনে তাই উপস্থিত করে।

কেন এই অভ্যুত্থান?
১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা লাভ করার পর থেকে মূলত মিয়ানমার সেনাবাহিনী দ্বারা শাসিত হয়ে আসছে। মিয়ানমারে সামরিক বাহিনী সময়ে সময়ে তিনটি ক্যু সংঘটিত করে এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে তারা অনেকটা নির্বিঘেœ সামরিক শাসন পরিচালনা করে। মিয়ানমারে সংবিধান স্বীকৃত ১৩৪টির মত জাতিসত্তা রয়েছে। এদের ধর্ম বর্ণ জাতিসত্তা একে অপর থেকে ভিন্ন ভিন্ন। এই জাতিসত্তা গুলোর মধ্য থেকে সার্বজনীন তেমন কোন নেতৃত্বও গড়ে উঠেনি। ফলশ্রুতিতে জাতীয় নেতৃত্বের শুন্যস্থান বলতে গেলে সেনা কমান্ডাররাই পূরণ করেন। অন্যদিকে, এই সেনা কমান্ডাররাই আবার স্বীয় স্বার্থে মিয়ানমারে একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশ বা আবহ সৃষ্টিতে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।

বর্তমান সামরিক অভ্যূত্থান এমনই এক অন্তরায় সৃষ্টির অভিপ্রায় থেকে সংঘটিত।

এমনিতেই ২০০৮ সালে সামরিক বাহিনী দ্বারা প্রণীত সংবিধানে সামরিক বাহিনীকে ক্ষমতার একচ্ছত্র অধিপতি করা হয়েছে। পার্লামেন্টে এক তৃতীয়াংশ আসন বিনাভোটে সেনাবাহিনীর জন্য নির্দিষ্ট করে রাখা হয়েছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং সীমান্ত বিষয়ক তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী সেনাপ্রধান কর্তৃক মনোনীত হন। এতকিছুর পরও সেনাবাহিনীর এই ক্ষমতা গ্রহণের পিছনে অং সান সুচি’র নির্বাচনে পূর্ববতী প্রণীত একটি পরিকল্পনাও হয়ত সেনাবাহিনীকে অস্বস্তিতে রেখেছিল এবং অং সান সুচির ব্যাপারে অসন্তুষ্ট ও সন্দিহান করে তুলেছিল। এ বিষয়টি হচ্ছে ক্রমান্বয়ে প্রতি পার্লামেন্ট নির্বাচনে বিদ্যমান সেনাবাহিনীর ৫% করে সিট কমানো। এই পদ্ধতিতে সেনাবাহিনীকে সংসদে কোটাশুন্য হবে, এমন সংশয় তৈরি হয়েছিল।

অভ্যুত্থান এবং আর্ন্তজাতিক সম্প্রদায় :
ইতিমধ্যে আর্ন্তজাতিক সম্প্রদায় বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, জাতিসংঘ, অষ্ট্রেলিয়া , ভারত তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। এসব প্রতিক্রিয়া মিয়ানমারের সামরিক শাসকরা খুব একটা ধর্তব্যের মধ্যে আনবে বলে মনে হয় না।

অতীতে দেখা গেছে, এরকম ক্ষেত্রে সারা বিশ্ব প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে কঠোর অবরোধ করেছে, মিয়ানমার মোটেও তাতে কর্ণপাত করেনি। এবারও তার পুনরাবৃত্তি ঘটবে। তবে সুচি’র অনুসারীরা যদি প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে তবে ইতিহাস অন্য ধরণেরও হতে পারে। তবে বাস্তব বিবেচনায় এটি দুরাশা মাত্র।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে রোহিঙ্গা সমস্যা :
আপাততঃ রোহিঙ্গা বিষয়টি চাপা পড়বে বলেই মনে হচ্ছে। তবে বাংলাদেশকে এ বিষয়ে সরব থেকে সামরিক শাসকদের চাপে রাখা ছাড়া অন্যপথ কঠিন হয়ে পড়বে। এ অভ্যূত্থান বাংলাদেশের জন্য সুযোগও সৃষ্টি করেছে। এ সুযোগ হল যদি মিয়ানমারের শাসকদের কাছে প্রতীয়মান করানো যায় রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের মাঝে বিশ্বব্যাপী তাদের একটি গ্রহণযোগ্য ভাবমূর্তি গড়ে উঠার ব্যাপক সম্ভাবনা এবং সুযোগ বিদ্যমান।

পূর্বকোণ/পি-আরপি

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 235 People