চট্টগ্রাম সোমবার, ১৯ এপ্রিল, ২০২১

৯ জানুয়ারি, ২০২১ | ১০:১২ পূর্বাহ্ণ

আহত পুলিশ কর্মকর্তার মৃত্যু

সহিংসতার পর ক্যাপিটলের সুরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাপিটল ভবনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থকদের হামলা ও ভাংচুরের সময় আহত এক পুলিশ কর্মকর্তা হাসপাতালে মারা গেছেন। ক্যাপিটল পুলিশের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে ওই পুলিশ কর্মকর্তার মৃত্যুর খবর জানানো হয় বলে জানায় দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস।

মারা যাওয়া ওই কর্মকর্তার নাম ব্রায়ান ডি সিকনিক। তিনি বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় রাত সাড়ে ৯টার দিকে মারা যান। ২০০৮ সালে তিনি ক্যাপিটল পুলিশ বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জো বাইডেনের জয়ের স্বীকৃতির প্রক্রিয়ায় গত বুধবার মার্কিন কংগ্রেসে যৌথ অধিবেশন চলার সময় ট্রাম্প সমর্থকরা মিছিল করে ক্যাপিটল ভবনের সামনে জড় হয়।

একপর্যায়ে তারা নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে এবং ভবনের ভেতরে ঢুকে ব্যাপক ভাংচুর চালায়। ওই ঘটনার সময় দায়িত্বরত এক ক্যাপিটল পুলিশ কর্মকর্তা এবং ট্রাম্প ভক্ত বিমান বাহিনীর সাবেক এক নারী কর্মকর্তাসহ পাঁচ জন নিহত হয়েছেন।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাপিটল ভবনে গত বুধবার অধিবেশন চলার সময় প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থকরা যে তা-ব চালিয়েছে তাতে সেখানকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বুধবার যুক্তরাষ্ট্র সরকারের প্রাণকন্দ্রে ঘটে যাওয়া এই সহিংস ঘটনা পুরো বিশ্বকে হতবাক করে দিয়েছে। দেশটির নাগরিকরা এখনো ভয়াবহ ওই ঘটনার রেশ কাটিয়ে উঠতে পারেননি। অনেকের কাছেই এখনো বিষয়টি বোধগম্য হচ্ছে না। কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ঐতিহাসিক এবং রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ওই ভবনে নির্বাচিত আইনপ্রণেতাদের অধিবেশন চলাকালে এবং যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রেসিডেন্টকে স্বীকৃতি দেওয়ার মত সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে বিতর্ক চলার সময় হাজারো ট্রাম্প সমর্থক ওই ভবন ঘিরে সব নিরাপত্তার বলয় ভেঙ্গে জোর করে ভেতরে প্রবেশ করে এমন তা-ব চালালো তা এখনো তাদের কাছে বিরাট প্রশ্ন হয়ে আছে।

ঘটনার নানা ছবি ও ভিডিওতে দেখা যায় বিক্ষোভকারীরা ভবনের ভেতরে ঢুকে ভাংচুর করছেন, চিৎকার করছেন। ট্রাম্প সমর্থকদের কেউ কেউ নিজেদের ওই কা-ের ছবি তুলছেন বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরাসরি ভিডিও সম্প্রচার করছেন। কেউ কেউ ভবনে থাকা ঐতিহাসিক নানা জিনিসপত্র ভেঙ্গে ফেলছেন বা লুট করে নিয়ে যাচ্ছেন।
গণমাধ্যমের খবরে বা অনলাইনে যখন ওই সব কা-ের সরাসরি সম্প্রচার হচ্ছে তখন বিশ্ববাসী অবাক হয়ে ভাবছিলেন, এরকম একটি গুরুত্বপূর্ণ ভবনে দেশের প্রায় সব আইনপ্রণেতারা এতটা সংবেদনশীল একটি বিষয় নিয়ে যখন আলোচনা করছেন তখন ওই ভবনের নিরাপত্তার প্রস্তুতির এই হাল কেন?

কোথায় ইউএস ক্যাপিটল পুলিশের প্রায় দুই হাজার সদস্য। যাদের কাজ ক্যাপিটল ভবন এবং তার মাটিকে সুরক্ষিত রাখা। কেন তারা সময়মত ট্রাম্প সমর্থকদের থামাতে পারেনি। ট্রাম্প সমর্থকরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার চালিয়েই ওই বিক্ষোভ-সমাবেশের আয়োজন করেছিল। তারা আক্রমণের হুমকিও দিয়েছিল। কেন তবে তাদের আটকাতে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা প্রস্তুতি নেওয়া হয়নি?

বিক্ষোভকারীরা ভবনের ভিতর ঢুকে গেলে অনেক কংগ্রেস সদস্যকে নিজেকে বাঁচাতে চেয়ার বা টেবিলের নিচে মাথা নিচু করে আশ্রয় নিতে দেখা যায়। পরে তাদের সেখান থেকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়। তারপর কয়েকঘণ্টার চেষ্টায় দাঙ্গাকারীদের হটিয়ে দেওয়ার পর আবার অধিবেশন শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এমন ঘটনা বিরল। এ ঘটনার পর ওয়াশিংটন ডিসিতে ১৫ দিন অর্থাৎ আগামী ২১ জানুয়ারি পর্যন্ত জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। ২০ জানুয়ারি নতুন প্রেসিডেন্টের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান হবে।

এটা কি নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যর্থতা?
বুধবারের সহিংস ঘটনার পর ক্যাপিটল ভবন ঘিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থার সবচেয়ে বেশি সমালোচনা হচ্ছে। অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, ভিড় দেখে পুলিশ দ্রুত লাইন ভেঙ্গে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে। দাঙ্গাকরীদের অনেকে বর্ম পরে ছিলেন। কারো কারো হাতে দেশি অস্ত্র, কারো হাতে রাসায়নিক স্প্রে ছিল।

তারা ভবনের ভেতর ঢুকে কয়েকঘণ্টা ধরে তা-ব চালায়। তারপরও পুলিশকে তাদের ঘিরে ধরে ভবন থেকে বেরিয়ে যেতে সাহায্য করতে দেখা যায়। গ্রেপ্তার করার পরিবর্তে পুলিশ তাদের কাউকে কাউকে পথ দেখিয়ে ভবনের বাইরে নিয়ে যায়। সিঁড়ি দিয়ে নামতে এবং দরজা খুলতে সাহায্য করে।

ভাইরাল হওয়া একটি ছবিতে ক্যাপিটল ভবনে ভাংচুরের সময় এক পুলিশকে এক ব্যক্তির সঙ্গে ‘সেলফি’ তোলার জন্য পোজ দিতে দেখা যায়।

ওইদিন দাঙ্গায় অংশ নেওয়া একজন যুক্তরাষ্ট্রের চরম ডানপন্থি দল ‘প্রাউড বয়েজ’ এর খুব চেনা সদস্য নিক ওচস। তিনি ক্যাপিটল ভবনের ভেতর সেলফি তুলে নিজের টুইটার একাউন্টে পোস্ট দেন। পরে সিএনএনকে তিনি বলেন, ‘‘যেখানে হাজার হাজার মানুষ ছিল…পরিস্থিতির উপর তাদের (নিরাপত্তা বাহিনীর) কোনো নিয়ন্ত্রণই ছিল না। আমাকে ভবনের ভেতরে যেতে কেউ থামায়নি বা প্রশ্ন করেনি।

ভাইরাল হওয়া আরেক ছবিতে এক বিক্ষোভকারীকে সগর্বে হাউজ স্পিকার ন্যান্সি পেলসির ডেস্কে এক পা তুলে তার চেয়ারে বসে থাকতে দেখা যায়। ছবিতে তাকে স্পষ্ট চেনা যাচ্ছে। পেলসির ডেস্ক থেকে একটি চিঠিও চুরি করেন তিনি। তারপরও এ ঘটনায় কেন আটকের সংখ্যা এত কম তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নবনির্বাচিত ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস।

তিনি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, এই দেশ বিচারের দুইটি ধরনের সাক্ষী হলো। তার একটি হলো গতকাল ইউএস ক্যাপিটলে চরমপন্থিদের তা-ব এবং অন্যটি হলো, গত সামারে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে (ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার) পুলিশের টিয়ার গ্যাসের শেল ছোঁড়া। এটা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য।

দাঙ্গাকারীদের বিরুদ্ধে কী কী আইনি ব্যবস্থা নেয়া হতে পারে?
ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স বলেছেন, যারা বুধবারের দাঙ্গায় জড়িত ছিল তাদের আইনানুযায়ী বিচারের আওতায় আনা হবে। ওই ঘটনার যত ছবি ও ভিডিও অনলাইনে ঘুরছে তাতে দাঙ্গাকারীদের খুঁজে বের করে তাদের বিরুদ্ধে আলাদাতে প্রমাণ দেওয়া খুব বেশি কঠিন কাজ হবে না।

ভাইরাল হওয়া দাঙ্গার বেশ কয়েকটি ছবির মুখও বেশ পরিচিত। তারা বিভিন্ন চরম ডানপন্থি দলের সদস্য।

ক্যাপিটল পুলিশের পক্ষ থেকেও আসল অপরাধীদের খুঁজে বের করতে তদন্ত শুরুর কথা জানানো হয়েছে। আইনী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দাঙ্গাকারীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের বিরল ও গুরুতর অভিযোগ আনা হতে পারে। আর দোষীসাব্যস্ত হলে ২০ বছরের কারাদ-ের সাজা হবে।

 

 

পূর্বকোণ/পি-আরপি

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 141 People

সম্পর্কিত পোস্ট