চট্টগ্রাম শনিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২২

সর্বশেষ:

১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২২ | ৩:৪১ অপরাহ্ণ

ডিজিটাল বাংলাদেশের মস্তিস্ক জাতীয় তথ্যভান্ডার

সৈয়দ এলতেফাত হোসাইন

 

তথ্য সংরক্ষণে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের উপর নির্ভরতা কাটিয়ে বাংলাদেশ বছরে ৩৫৩ কোটি টাকা সাশ্রয় করছে। গাজীপুরের কালিয়াকৈরে বঙ্গবন্ধু হাইটেক সিটিতে ক্লাউড কম্পিউটিং ও জি-ক্লাউড প্রযুক্তিতে স্থাপিু জাতীয় তথ্যভান্ডার বা ডাটা সেন্টার দেশের অত্যাধুনিক তথ্য ভান্ডার হিসেবে এ ভূমিকা পালন করছে।

সাত একর জমির উপর নির্মিত ‘হার্ট অব ডিজিটাল বাংলাদেশ’ খ্যাত তথ্যভান্ডারটি ইতোমধ্যে বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তর ডেটা সেন্টারের স্বীকৃতি পেয়েছে। দেশীয় তথ্যের সুরক্ষার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোও এই তথ্যভা-ার ব্যবহারে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

ডাটা সেন্টারের একজন মুখপাত্র জানান, বাংলাদেশ ডাটা সেন্টার কোম্পানি লিমিটেড (বিডিসিসিএল) কর্তৃক পরিচালিু এই তথ্যভান্ডারটি ফোর টিয়ার ডাটা সেন্টার, যার ডাউন টাইম শূন্যের কোঠায় এবং আপটাইম ৯৯ দশমিক ৯৯৫ শতাংশ।

এই ডাটা সেন্টারের ব্যাকআপ হিসেবে যশোরে স্থাপিু শেখ হাসিনা টেকনোলজি পার্কে দুই পেটাবাইট ক্ষমুাসম্পন্ন তিন স্তর বিশিষ্ট ‘ডিজেস্টার রিকোভারি ডাটা সেন্টার’ স্থাপন করা হয়েছে। যে কোনো কারণে জাতীয় ডাটা সেন্টার দুর্যোগ কবলিু হলে সকল তথ্য সেখান থেকে উদ্ধার করা যাবে।

২০০৮ সালের ১২ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ বিনির্মাণের লক্ষ্যে ব্যাপক কার্যক্রম শুরু হয়। দেশের তথ্য উপাত্ত নিরাপদে সংরক্ষণ এবং নিরবচ্ছিন্ন গুণগণ মানসম্পন্ন ই-সেবা প্রদান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি উপদেষ্টা সজিব ওয়াজেদ জয় দেশে একটি ফোর টিয়ার জাতীয় তথ্যভান্ডার নির্মাণের পরামর্শ দেন। সে আলোকেই এই তথ্যভান্ডারটি গড়ে তোলা হয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৯ সালের ২৮ নভেম্বর ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এই ‘ডাটা সেন্টার’ উদ্বোধন করেন। যুক্তরাষ্ট্রের আপটাইম ইন্সটিটিউট কর্তৃক স্বীকৃতপ্রাপ্ত বাংলাদেশের একমাত্র ফোর টিয়ার ডাটা সেন্টারটি ২০১৯ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর যুক্তরাজ্য ভিত্তিক ডাটা সেন্টার ডায়নামিক সংস্থা কর্তৃক ‘ডিসিডি-এপিএসি এ্যাওয়ার্ড ২০১৯’ অর্জন করে।

বিডিসিসিএল সচিব একেএম লতিফুল কবির বলেন, এ ডাটা সেন্টারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ২ লাখ স্কয়ার ফিট বিশিষ্ট তথ্যভান্ডারের মূল দ্বিতল ভবন, দুই পাশে দুইটি ইউটিলিটি ভবন এবং সামনে একটি অভ্যর্থনা ভবন। ডাটা সেন্টারের নিরবচ্ছিন্ন অপারেশন ও মেইন্টেন্যান্স নিশ্চিত করতে বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগসহ সকল গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে রিডান্ডেন্সি (দ্বৈততা) রয়েছে। এখানে ক্লাউড কম্পিউটিং, ক্লাউড ডেক্সটপ, ক্লাউড স্টোরেজ, ডাটা স্টোরেজ ও ব্যাকআপ, ডাটা সিকিউরিটি ও কো-লোকেশন সার্ভিস রয়েছে, যা সপ্তাহে ৭ দিন ২৪ ঘণ্টা সেবা নিশ্চিত করতে সক্ষম।

তিনি জানান, ইতোমধ্যে এই কোম্পানির সাথে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন, নির্বাচন কমিশন, ভূমি জরিপ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, সরকারের ই-নথি ও এটুআই প্রকল্পসহ সরকারের ১০টি প্রতিষ্ঠান সার্ভিস চুক্তি স্বাক্ষর করেছে এবং আরও ১২টি প্রতিষ্ঠান চুক্তি স্বাক্ষরের পর্যায়ে রয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে দুই পেটাবাইট ক্ষমুা নিয়ে এই সেন্টারটির যাত্রা শুরু হলেও র্বুমানে এর ক্ষমুা ২২ পেটাবাইটে উন্নীত করা হয়েছে। শিগগিরই এটি ২০০ পেটাবাইটে উন্নীত করা হবে।

তথ্যভান্ডারটিতে এখন জি-ক্লাউড স্থাপনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে জানিয়ে লতিফুল কবির বলেন, ডাটা সেন্টারে ওরাকল প্রযুক্তির জি-ক্লাউড স্থাপন সম্পন্ন হলে এর মাধ্যমে ইনফ্রাস্ট্রাকচার এ্যাজ এ সার্ভিস (আইএএএস), প্লাটফর্ম এ্যাজ এ সার্ভিস (পিএএএস) এবং সফটওয়্যার এ্যাজ এ সার্ভিস (এসএএএস) এই তিনটি সেবাই দেয়া সম্ভব হবে। এর ফলে বাংলাদেশ ওরাকল এর লাইসেন্স ও নবায়ন বাবদ বাৎসরিক ব্যয় ৪৫ মিলিয়ন ডলার সাশ্রয় হবে এবং কোম্পানির আয়ও বৃদ্ধি পাবে।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমদ পলক বলেন, সরকারের ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ কর্মসূচি বাস্তবায়ন, জনপ্রশাসনে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে কাজের দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়ানো, তথ্য সংরক্ষণ ও জনগণের দোরগোড়ায় ডিজিটাল সেবা পৌঁছে দিতেই সরকার এই ‘ফোর টিয়ার ন্যাশনাল ডেটা সেন্টার’ স্থাপন করে।

তিনি বলেন, এতে ডিজিটাল কনটেন্টগুলোর সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যমে জনসেবা উন্নত হবে। প্রকল্পটির মাধ্যমে সরকারের সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সব সরকারি কার্যালয়ের আইসিটি কার্যক্রম সরাসরি যুক্ত থাকবে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, বার্থ রেজিষ্ট্রেশন সিস্টেম, ১১ কোটি মানুষের জাতীয় পরিচয়পত্র, ই-নথি ও সুরক্ষাসহ ৫৫ হাজার ওয়েবসাইট এই ফোর টিয়ার ডাটা সেন্টারে রক্ষিত আছে। ‘হাইটেক পার্ক, শেখ কামাল আইটি ট্রেইনিং এন্ড ইনকিউবেশন সেন্টার এবং স্কুল অব ফিউচার’ যদি হয় ডিজিটাল বাংলাদেশের ‘হাত-পা’, তাহলে এই ‘ডেটা সেন্টার’ হলো ‘মস্তিস্ক’।

পলক বলেন, আমাদের লক্ষ্য হলো, আমরা গভর্নমেন্ট ক্লাউডে (জি-ক্লাউড) যাবো। এতে আমাদের তথ্য সংরক্ষণের সক্ষমুা হবে অসীম। আমরা আশা করছি আগামী ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যেই আমরা ওরাকল জি-ক্লাউড চালু করতে পারবো। তখন এটি হবে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার সর্ববৃহৎ জি-ক্লাউড প্লাটফর্ম।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ডাটা সেন্টার কোম্পানি লিমিটেড এর মালিকানাধীন ফোর টায়ার জাতীয় ডাটা সেন্টারটির কারিগরি বৈশিষ্ট্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- এর আপটাইম ৯৯ দশমিক ৯৯৫ শতাংশ, এটি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আপটাইম ইন্সটিটিউট কর্তৃক সার্টিফিকেট প্রাপ্ত,  যুক্তরাজ্যভিত্তিক ডাটা সেন্টার ডায়নামিক সংস্থা কর্তৃক ‘ডাটা সেন্টার কন্সট্রাকশন টিম অব দ্য ইয়ার’ ক্যাটাগরিতে এশিয়া প্যাসিফিক ‘উঈউ-অচঅঈ অধিৎফ ২০১৯’ পুরস্কার প্রাপ্ত, এর রিডান্ডেন্সি ২ঘ+১, ২৪ ঘণ্টা ৭ সার্ভিস সুবিধা, ক্লাউড সার্ভিস সুবিধা, কো-লোকেশন সার্ভিস সুবিধা, ২ লাখ বর্গফুট আয়তনের ডাটা সেন্টার, ৪টি কেজ হল যার প্রতিটির আয়তন প্রায় ২ হাজার বর্গমিটার। ৪২ট, ২০০০*১২০০*৬০০সস স্পেস বিশিষ্ট ৪কড ও ১০ কড ক্ষমুাসম্পন্ন সর্বমোট ৬০৪টি র‌্যাক স্পেস, সর্বাধুনিক প্রযুক্তির অগ্নি নির্বাপন ব্যবস্থা, ক্লাউড সেবা প্রদান করার জন্য ১৫২টি র‍্যাক সমৃদ্ধ মডুলার ডাটা সেন্টার, সর্বোচ্চ ৪০ জিবিপিএস ক্ষমুা বিশিষ্ট উচ্চ গতির ইন্টারনেট ও ডাটা কানেক্টিভিটির সুবিধা, ২ পেটাবাইট ক্লাউড স্টোরেজ যা ২০০ পেটাবাইট পর্যন্ত সম্প্রসারণ যোগ্য, ৭৪৪টি ফিজিক্যাল সার্ভার, বহুস্তর বিশিষ্ট নেটওয়ার্ক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সর্বমোট ৮টি উচ্চক্ষমুার (প্রতিটি ২.৫ মেগা ভোল্টেজ ক্ষমুা সম্পন্ন) জেনেরেটর, সর্বমোট ৪৬৬টি সিসিটিভিসহ সার্বক্ষণিক মনিটরিং সিস্টেম,  ৬টি ২০০০ কিলো ভোল্টেজ ও ২টি ২৫০০ কিলো ভোল্টেজ ক্ষমুার ট্রান্সফর্মার ও  ৩৩/১১ কিলো ভোল্টেজ এর ১০.৫ মেগা ভোল্টেজ ক্ষমুা সম্পন্ন ২টি সাবস্টেশন ইত্যাদি।

লেখক: স্টাফ রিপোর্টার, বাসস

পূর্বকোণ/এএ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট