চট্টগ্রাম শনিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২২

সর্বশেষ:

১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২২ | ৩:২৪ অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক 

‘আমি নারী, তবে সবই পারি’

শাহীন আক্তার রেখা। পড়াশোনা করছেন হাটহাজারী সরকারি কলেজে ডিগ্রি প্রথম বর্ষে। তার স্থায়ী নিবাস ফটিকছড়ি উপজেলার ছাদেক নগরে। ২০১৯ সালে মাধ্যমিক শেষ করে ভর্তি হন কলেজে। কলেজে পড়া অবস্থায় সরকারি একটি কম্পিউটার প্রশিক্ষণের খবর আসে, যেখানে দীর্ঘ ৯ মাস সম্পূর্ণ ফ্রিতে নারীদের কম্পিউটার বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। কোর্সের নাম ছিল ‘শী পাওয়ার প্রজেক্ট’। সেই প্রজেক্টে চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার আইটি সেক্টরে নির্বাচিত শেষ ৮ জন ছাত্রীদের মধ্যে একজন এই রেখা। যদিও এই প্রজেক্টে কম্পিউটারের অফিস এপ্লিকেশন সফটওয়্যারগুলো সম্পর্কে ট্রেনিং দেওয়া হয়, কিন্তু তার সাথে ফ্রিল্যান্সিং সম্পর্কে কিছু বেসিক ধারণাও তাদের দেয়া হয়। প্রশিক্ষণ শেষে পায় সরকারি কম্পিউটার প্রশিক্ষণ সার্টিফিকেট ও ভাতা হিসেবে ৩৪ হাজার টাকা। ওই প্রশিক্ষণ থেকেই রেখার ফ্রিল্যান্সিং বিষয়ে হাতেখড়ি। ধীরে ধীরে তার ধ্যানে জ্ঞানে ফ্রিল্যান্সিং বিষয়টি আরো ওতোপ্রতোভাবে জড়িয়ে পরে।

কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতি চলাকালীন হাটহাজারীতেই ডিজিটাল আইটি নামের এক প্রতিষ্ঠানে ফ্রিল্যান্সিং বিষয়ে নতুন এক কোর্সের খবর পান রেখা। এর আগে সরকারিভাবে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ নেওয়ার কারণে কিছু ভাতা পেয়েছিলেন রেখা, সেই টাকা থেকে কিছু টাকা দিয়ে ভর্তি হন ডিজিটাল আইটি প্রতিষ্ঠানটির ফ্রিল্যান্সিং বিষয়েক কোর্স ‘ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে’।

ফটিকছড়ি থেকে প্রতিদিন দেড় ঘণ্টা জার্নি করে হাটহাজারি এসে পড়ালেখার পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সিংয়ের ক্লাস করা খুব একটা সহজ ছিলোনা রেখার জন্য। একজন মেয়ে হয়েও দুপুর থেকে প্রায় সন্ধ্যা পর্যন্ত ফ্রিল্যান্সিং-এর ক্লাস করতো। সন্ধ্যার পর বাড়ি ফেরার কারণে রাস্তা ঘাটে অনেক অপ্রীতিকর পরিস্থিতির শিকার হতে হয়েছে তাকে। এমনকি গ্রামে থাকার কারণে রাত্রিবেলা বাড়ি ফেরার সময় শুনতে হতো নানা ধরনের কটুকথা। তাও হাল ছাড়েননি রেখা। মেয়ে হিসেবে নিজেকে নিজের পায়ে দাড়ানোর এক অদম্য ইচ্ছা জাগে তার মনে। পরিবার থেকে সহযোগিণা পাওয়ায় রেখার জন্য সফল হওয়াটা কিছুটা সহজ হলো । ফ্রিল্যান্সিংয়ের ক্লাস করার সময় প্রয়োজন পড়েছিল ল্যাপটপের। কিছুদিন ক্লাসে থাকা ল্যাপটপ দিয়ে কাজ চালানো গেলেও পরে তা আর সম্ভব হচ্ছিলো না। নিম্ন- মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হওয়ায় সে সময় পরিবার থেকে ল্যাপটপ কিনে দেয়াও সম্ভব ছিলো না। তাই সরকারি ভাতা পাওয়া বাকি টাকা দিয়ে কিনে নতুন ল্যাপটপ।

অনেক স্বপ্ন এবং আশা নিয়ে পুরোদমে ৩ মাস ধরে ফ্রিল্যান্সিংয়ের কাজ শেখেন রেখা। এই প্রশিক্ষণ শেষে নিজে বাসায় ৫/৬ মাস চর্চা করেন। তারপর ফ্রিল্যান্সিংয়ের কাজ পাওয়ার জন্য মার্কেট প্লেস ফাইভার সম্পর্কে জানা শুরু করেন। তবে কাজ শেখার পরও মার্কেট প্লেসগুলোতে নিজের প্রোফাইল বানানোর সাহস হচ্ছিলো না রেখার। তাই আরো কিছুদিন সময় নিয়ে যুটা সম্ভব নিজের একটা ইউনিক প্রোফাইল বানান তিনি। ভাগ্যক্রমে একাউন্ট খোলার ১০ দিন পর এর এক ক্লায়েন্টের মেসেজ পান। কাজটি ছিল ৫ ডলারের। প্রথম অর্ডার হওয়াতে একটু সময় নিয়ে ধীরে কাজটি শেষ করেন রেখা। এবং কাজটির জন্য ফাইভ স্টার রিভিউ পেয়েছিলেন। ক্লায়েন্ট খুশি হওয়াতে একই ক্লায়েন্ট থেকে পরপর আরো ২টি কাজ পান রেখা। কাজ শেষ হওয়ার ৩ দিন পর নতুন আরো ২ জন ক্লায়েন্ট পান রেখা। তাদের অর্ডারগুলো ছিল ৫০ এবং ৪০ ডলারের।  আর এভাবেই শুরু হয় গ্রামের মেয়ে রেখার ফ্রিল্যান্সিং ক্যারিয়ার।

শুরুর দিকটা অনেক কষ্টের হলেও পরে আর পেছনে তাকাতে হয়নি। প্রথম মাসেই ৪০০ ডলার আয় করেন রেখা। যা ছিল তার প্রত্যাশার বাইরে। তখন থেকেই ফ্রিল্যান্সিং ক্যারিয়ার এর প্রতি বিশ্বাস আরো বেড়ে যায়। আর বুঝতে পারেন এখান থেকেই কিছু একটা করা সম্ভব। অনেক উজ্জ্বল ভবিষ্যত রয়েছে ফ্রিল্যান্সিংয়ে। রেখা দেড় বছরে নতুন নতুন অনেক ক্লায়েন্টের কাজ করতে থাকেন। আর তার ক্লায়েন্ট রিভিউ সংখ্যা দাড়ায় ২৪৫টি। তিনি এখন ডিজিটাল মার্কেট প্লেস ফাইভারের একজন লেভেল ২ সেলার। তবে ফাইভার ছাড়াও অনেক রেগুলার ক্লায়েন্টদের কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে রেখার। আর এ পর্যন্ত ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে প্রায় ৮ হাজার ডলার আয় করেছেন।

ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে রেখার মতো মধ্যবিত্ত পরিবারের একটি সুন্দর স্থান তৈরি হয়েছে। একজন অল্পবয়সী মেয়ে হয়ে পড়ালেখার পাশাপাশি নিজের পরিবারের পাশে দাড়ানোর সুযোগ হয়েছে এবং জীবনে চলার পথে একজন মেয়ে হিসেবে আত্মনির্ভর করার মতো ক্ষমুা তৈরি হয়েছে। সরকারি বেসরকারি এমন উদ্যোগের কারণে ছোট্ট একটা গ্রাম থেকে উঠে আশা রেখার মতো মেয়েদের জীবনের চলার পথকে সহজ করে দেওয়া হয়েছে। তাদের  আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তোলা হয়েছে।

ফ্রিল্যান্সিং করতে গিয়ে রেখা যে সমস্যাটির সম্মুখীন হয় তা হলো তার উপার্জিত অর্থ দেশে আনা। পেমেন্ট গেটওয়ে হিসেবে বাংলাদেশে পেপাল এর কার্যক্রম না থাকায় কাজ শেষে উপার্জিত অর্থ দেশে আনতে নির্ভর করতে হয় তৃতীয় কোনো মাধ্যমের উপর। এতে উপার্জনের বড় অংকের অর্থ হারাতে হয় ফ্রিল্যান্সারদের। তাই রেখার মু লাখ লাখ ফ্রিল্যান্সারদের আশা সরকার নিবিড়ভাবে পেপাল সার্ভিস আনতে আন্তরিকতার সাথে কাজ করবে এবং ফ্রিল্যান্সারদের জন্য মানি ট্রান্সফারের যেসব জটিলুা রয়েছে সেগুলো খুব শীঘ্রই সমাধান হবে।

রেখা তার ফ্রিল্যান্সিং ক্যারিয়ার বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নারীদের ফুল টাইম চাকরি করা অত্যন্ত কঠিন একটা কাজ। দেশের বেশিরভাগ স্বামীরা সংসারের কাজ করতে অভ্যস্ত নয়। ফলে, কোন নারী চাকরি করলেও তাকে সংসারের সকল কাজ করতে হয়। এই কারণেই, বাংলাদেশের নারীরা চাকরি করে না বা তাকে করতে দেয়া হয় না। কিন্তু তারা ইচ্ছে করলেই অনায়েসে কিছু সময় ফ্রিল্যান্সিং করে ভালো আয় করতে পারে। আমার মতে ফ্রিল্যান্সিং নারীদের জন্য অত্যন্ত উপযুক্ত একটি পেশা হতে পারে। ফ্রিল্যান্সিং করে একজন নারী স্বাবলম্বী হতে পারবে সহজেই। নারীরা যদি অর্থনীতিতে পুরুষদের সাথে তাল মিলিয়ে অবদান রাখতে পারে তবেই আমাদের দেশের অর্থনীতির উন্নতি হবে। আর সেটি ফ্রিল্যান্সিং করে নারীরা সহজেই করতে পারবে। যেমন আমি নারী, তবে আমি সবই পারি। এজন্য দরকার সঠিক গাইড লাইন এবং কাজ শেখার উন্নত ব্যবস্থা।

লেখক:  নিজস্ব প্রতিবেদক

পূর্বকোণ/এএ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট