চট্টগ্রাম শনিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২২

সর্বশেষ:

১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২২ | ৩:০০ অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক 

গ্রামে ফ্রিল্যান্সার তৈরির কারিগর তমাল

মাইনুল আরেফিন তমাল চট্টগ্রামের একজন সফল ফ্রিল্যান্সার। তিনি শুধুমাত্র ফ্রিল্যান্সিংই করেন না বরং নতুন নতুন ফ্রিল্যান্সার গড়ে তুলতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন নিজের একটি ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। যেখানে চট্টগামের উপজেলা ও গ্রাম পর্যায়ের ছেলে মেয়েরা প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেরাই ফ্রিল্যান্সার হয়ে গড়ে উটেছে। আর গ্রামে থেকে তারা আত্মনির্ভরশীল হয়েছেন। চাকরীর পেছনে না ছুটি ঘরে বসেই তারা বিদেশী ক্লায়েন্টে কাজ করে দিচ্ছেন, আর মাস শেষে তাদের ব্যাংক একাউন্টে আসছে হাজার হাজার ডলার। এতে শুধু কর্মসংস্থানই সৃষ্টি হয়নি বরং দেশের অর্থনীতিতেও যোগান দিচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রার।

তবে তমালের শুরুটা ছিল খুব চ্যালেঞ্জিং। ২০১৫ সালে একটি নষ্ট কিবোর্ডের ল্যাপটপ দিয়েই ফ্রিল্যান্সিংয়ের প্রশিক্ষণ নেওয়া শুরু করেন তিনি। ওই নষ্ট কিবোর্ডের ল্যাপটপে অতিরিক্ত একটি কিবোর্ড যোগ করে কোনভাবে প্রশিক্ষণের ক্লাসগুলো চালিয়ে নিতেন তমাল। এমনকি সুন্দর দেখাতে ল্যাপটপের ডিসপ্লেতে একটি এ্যপল ম্যাকবুকের ছবি দিয়ে রাখতেন। অবশ্য মাত্র কয়েক বছরেই সেই ডিসপ্লেতে থাকা ম্যাকবুক বাস্তবে রুপ নিয়েছে।

চট্টগ্রাম জেলার হাটহাজারী উপজেলার ২নং ধলই ইউনিয়নের বদল বাড়ির ছেলে তমাল। এ বাড়ির অনেকে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন উচ্চ পদে কর্মরত থাকায় এলাকায় এ বাড়ির অনেক সুনার রয়েছে। তবে তাদেরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাঁরা চাইলেও এলাকার সব শিক্ষিত ছেলেমেয়েদের চাকরী দিতে পারবেন না। তাই তমালের মাথায় একটা চিন্তা কাজ করল ‘এমন কি করলে গ্রামের মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে?’ কারণ সে সময় ফ্রিল্যান্সিং বাংলাদেশে র্বুমান সময়ের মু এতো সুপরিচিত হয়ে উঠেনি।

তমালের এক বড়ভাইয়ের পরামর্শ ও অনুপ্রেরণায় সে আশার আলো খুঁজে পায়। লেগে পড়লো কাজে। চট্টগ্রাম শহরে নানা ফ্রিল্যান্সিং প্রতিষ্ঠানের ভিড়ে আসল প্রতিষ্ঠান খুঁজে পাওয়া ছিল একটা বড় চ্যালেঞ্জ। শহরের সব আইটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ঘুরে এবং তাদের সাথে কথা বলে তমাল বিকন আইটিতে প্রশিক্ষণ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ভর্তি হয় ডিজিটাল মার্কেটিং কোর্সে।

বিকেলে শিফটে ক্লাস করতে তমাল দুপুরেই হাটহাজারী থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শাটল ট্রেনে রওনা দিতেন। আর ক্লাস শেষে আবার ট্রেনেই ফিরতেন। ক্লাসে যা শিখতেন তা অন্যান্য সহপাঠীদের সাথে আলোচনা করতেন। নিজেদের মধ্যে জ্ঞান আদানপ্রদান করতেন। এভাবে ২-৩ মাস কোচিং করার পরও আরও ২-৩ মাস কাজের চর্চা করতে থাকেন তমাল। এরপর নিজেকে প্রস্তুত করার পর ফ্রিল্যাসিংয়ের কাজ পেতে মার্কেট প্লেসে একাউন্ট করেন। গ্রামে সেসময় মোবাইল নেটওয়ার্ক ছিল খুবই দুর্বল। তাই ঠিক মতো ইন্টারনেট কানেকশন পাওয়া যেু না। ঘরের ভিতরে কাজ করলে  মোবাইল রাখতে হতো বাইরের জানালায়।

প্রথম এক ক্লায়েন্টের ম্যাসেজ পাওয়ার পর তমালেন মনে হলো ৬ মাসের কষ্ট স্বার্থক হয়েছে। প্রথম ক্লায়েন্টেরর সব কমিউনিকেশন  হিমেল নামে এক বড়ভাই করে দিয়েছিলেন। কারণ তখনো তমালের মনে ভয় কাজ করছিল। শেষ পর্যন্ত ভালভাবে কাজটা বুঝিয়ে দিতে পারবেন তো! সেই প্রথম মাসে ইনকাম হয়েছিল ১৫ ডলার। তবে হাল ছাড়েননি তিনি। সম্ভাবনা খুঁজে পাওয়ায় প্রতিদিন ১২ঘণ্টার অধিক সময় দিতে থাকে। আস্তে আস্তে অনেক বেশি আসা শুরু হল। তখন আর পেছনে তাকাতে হয়নি তমালেন।

একসময় সব কাজ করা অনেক কঠিন হয়ে পরে। তারপর তমালের মাথায় আসে এই সুযোগটাই কালে লাগাতে হবে। পরিচিত যারা রয়েছেন তাদেরকে প্রশিক্ষণ দিয়ে শিখিয়ে দেবে ফ্রিল্যান্সিয়ের সম্পূর্ণ ধাপগুলি। কয়েকজন বড়ভাই ও সহকর্মীতে নিয়ে ফটিকছড়িতে একটা ব্যাচ শুরু করলেন তারা। ওই ব্যাচের সফলতা দেখে হাটহাজারী, নাজিরহাটে বিভিন্ন ব্রাঞ্চে ট্রেনিং শুরু দেওয়া শুরু হয়।

নতুন ফ্রিল্যান্সারদের উদ্দেশ্যে তমাল বলেন,  যে সব প্রতিষ্ঠান বা ব্যাক্তি শুধু ক্লাস নির্ভর না হয়ে ধাপে ধাপে সব কাজ শিখিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি একজন কায়েন্টের সাথে কিভাবে কমিউনিকেশন করতে হবে, কিভাবে নিজেকে উপস্থাপন করতে হবে, কিভাবে ক্লায়েন্টের বিশ্বস্ততা অর্জন করতে হবে এবং ক্লায়েন্ট ধরে রাখতে হবে, যে সব  প্রতিষ্ঠান এসব শিখিয়ে দেবেন বুঝে শুনে ওইসব প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণের জন্য যেতে পরেন। কারণ এখন ভুড়ি ভুড়ি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে ফ্রিল্যানিংয়ের। প্রচন্ড মনোবল আর ধৈর্য নিয়ে ফ্রিল্যান্সিং ক্যারিয়ার শুরু করতে হবে। অভিজ্ঞদের সাথে সব সময় যোগাযোগ রাখতে হবে। অযথা সোস্যাল মিডিয়া ব্যবহার থেকে দুরে থাকতে হবে। অন্যকে সাহায্য করার মন-মানসিকতা তৈরি করতে হবে। প্রযুক্তির সাথে নিজেকে আপডেট রাখতে হবে এবং ফ্রিল্যান্সিং করলেও পরিবারকে সময় দিতে হবে।

তমালের এমন ধৈর্য্য আর স্বপ্ন তাকে আজ সফলুার মুখ দেখিয়েছে। সেই ১৫ ডলারের কাজ এখন হাজার ডলারে পৌছেছে। মার্কেট প্লেসে আড়াই হাজারের অধিক কাজ করা হয়ে গেছে ইতিমধ্যেই। পাশাপাশি ৪শ এর অধিক ছাত্র ছাত্রীদের ফ্রিল্যান্সিং ক্যারিয়ার গঠনে সহযোগিণা করে এসেছে। অনেক বিদেশী ক্লায়েন্ট সরাসরি পার্টনারশিপ বিজনেস করতে যুক্তিবদ্ধ হচ্ছে। এভাবে তমালের মতো একজন ফ্রিল্যান্সার একদম শুন্য থেকে তার সফলতা আনতে সক্ষম হয়েছেন।

লেখক: নিজস্ব প্রতিবেদক

পূর্বকোণ/এএ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট