চট্টগ্রাম বুধবার, ০৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৩

সর্বশেষ:

২০ ডিসেম্বর, ২০২২ | ৮:৪৪ অপরাহ্ণ

অনলাইন ডেস্ক

শিশুরাও যখন মানসিক ব্যাধির শিকার

বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়টি হচ্ছে ডিপ্রেশন বা হতাশা, যা ব্যক্তির মানসিক যন্ত্রণা ও অবসাদের অন্যতম কারণ। ডিপ্রেশন থেকে সৃষ্ট মানসিক যন্ত্রণা কোনো ঠুনকো বিষয় নয়। এটা মূলত এক ধরনের মানসিক ব্যাধি, যা আজকের দিনে সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়ে উঠছে।

মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয় নিয়ে কয়েক দশেক আগেও তেমন একটা গুরুত্ব দিয়ে ভাবা হতো না। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে এটি এখন আলোচনার মুখ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে। অনেকে ডিপ্রেশন বা মানসিক অবসাদকে স্বাভাবিক ব্যাপার কিংবা ব্যক্তির বাস্তবতাকে মেনে নিতে না পারার অপরিপক্কতা হিসেবে ধরে নেয়, যা একটি ভ্রান্ত ধারণা। প্রকৃতপক্ষে এটি অতি মাত্রায় ও দীর্ঘ সময় অবসাদ ও হতাশা থেকে উদ্ভূত মানসিক ও মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা। এক কথায়, মনের অসুখ বলা যায় একে।

 

মানব শরীরে ‘সেরোটনিন’ নামক উপাদানের তারতম্যের কারণে ডিপ্রেশনজনিত সমস্যা ঘটে থাকে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তবে এক্ষেত্রে ডোপামিন, নরইপিনেফ্রিন ইত্যাদি উপাদানের হ্রাসও অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত। একে বায়োলজিক্যাল কারণ হিসেবে অভিহিত করা হয়। এছাড়া রয়েছে বংশগত কারণ, ইচ্ছার বহির্ভূত কোনো সম্পর্কে থাকা বা চাপে পড়ে কিছু করা ও পরবর্তীকালে তার জন্য অনুতপ্ত থাকা, কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে না পারা, হীনম্মন্যতা, বুলিংয়ের শিকার, সম্পর্কে ব্যর্থতা ইত্যাদি।

আশ্চর্যজনকভাবে শিশুরাও মানসিক ব্যাধির শিকারে পরিণত হয় বলে বলছেন চিকিৎসকরা। যদিও শিশুদের ক্ষেত্রে এর ভিন্নতা রয়েছে। কারণ শিশুরা বড়দের মতো নিজেকে বুঝতে পারে না এবং বেশির ভাগ বাবা-মা এই বিষয়টিকে তেমন একটা গুরুত্ব দেন না। শিশুর মন খারাপ বলে বিষয়টিকে উপেক্ষা করেন অভিভাবকরা। আমাদের দেশে বাবা-মা সন্তানের শারীরিক সুস্থতার বিষয়ে যতটা উদ্বিগ্ন, তার অর্ধেকও ভাবেন না শিশুর মানসিক সুস্থতা নিয়ে—কী সাংঘাতিক! শিশুর ক্ষেত্রে এই মানসিক অবসাদের কারণ হলো বাবা-মায়ের মধ্যে ভালো সম্পর্ক না থাকা, তালাকপ্রাপ্ত বা বাবা-মায়ের কোনো একজনের অন্যত্র বিয়ে হয়ে যাওয়া কিংবা পিতা-মাতার অকাল প্রয়াণ হওয়া।

 

এসবের কারণে শিশুরা মানসিকভাবে মারাত্মক চাপে থাকে। প্রচণ্ড অসহায় বোধ করে। তাছাড়া প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার আগে নেশায় জড়িয়ে পড়া, দীর্ঘদিন শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকা, লক্ষ্য অনুযায়ী ফলাফল করতে না পারা, বাবা-মায়ের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক না থাকার কারণে নিজের সমস্যার কথা বলতে না পারা, স্কুলে বন্ধুদের সঙ্গে মনোমালিন্য হওয়া, শিক্ষকদের কাছ হতে উত্সাহ না পাওয়া, অতিরিক্ত পড়াশোনার চাপ, শিশুদের মেধা বিকাশের সুযোগ না থাকা, সহশিক্ষামূলক কার্যক্রমের ব্যবস্থা না থাকা, বিনোদনের অভাবে একঘেয়ে পরিবেশে অবস্থান করা, খেলাধুলার ব্যবস্থা না থাকা, থায়রয়েড জনিত সমস্যা, হরমোনজনির সমস্যা, ভিটামিন ডি-এর অভাব প্রভৃতি বিষয়কে শিশুর ডিপ্রেশনের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

শিশুরা এই মানসিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তির পন্থা হিসেবে বিপথগামী হওয়াসহ আত্মহত্যার পথে পা বাড়াচ্ছে। সম্প্রতি ইউনিসেফের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সারা বিশ্বে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে অন্তত ১৩ শতাংশ ভুগছে মানসিক সংকটে। যার মধ্যে ১০-১৯ বছর বয়সি প্রতি সাত জনের মধ্যে এক জনেরও বেশি মানসিক সমস্যায় ভুগছে। প্রতি বছর প্রায় ৪৬ হাজার কিশোর-কিশোরী এই অবসাদের কারণে আত্মহত্যা করে থাকে বলে সংস্থাটির জরিপে উঠে এসেছে; যা আমাদের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। তাই শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যের যত্নে বাবা-মাকে তৎপর হতে হবে।

 

শিশু কথা, চাহিদা ও অনুভূতির মূল্যায়ন করতে হবে। তাদের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার পরিবেশ করে দিতে হবে। তাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করতে হবে। শিশুদের মুক্তমনা ও মুক্তবুদ্ধি চর্চার সুযোগ দিতে হবে। অন্যের সঙ্গে তুলনা ও পড়াশোনায় চাপ দেওয়া তো যাবেই না, বরং পরীক্ষায় বা কোনো কাজকর্মে খারাপ ফলাফল করলে কাছে বসিয়ে উৎসাহ দিতে হবে। শিশুকে আত্মবিশ্বাস ও সাহস যোগাতে হবে। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

কোনোভাবেই আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, একবিংশ শতাব্দীর আলোর যুগে বাস করেও মানসিক অবসাদের বিষয়টিকে ন্যাকামি বা অতিরিক্ত আহ্লাদ বলে আমরা উপেক্ষা করি কী করে! বিশেষ করে এর মাধ্যমে আগামী দিনের দেশ গড়ার কারিগর তথা শিশুদের অঙ্কুরেই বিনষ্ট করছি আমরা, যে পরিণামদর্শিতার কারণে পিছিয়ে পড়ছে তরুণ প্রজন্ম, হারিয়ে যাচ্ছে শত শত তরুণ প্রাণ। তথ্যসূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক

 

পূর্বকোণ/সাফা/পারভেজ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট