চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০১৯

সর্বশেষ:

২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ | ৬:২৪ পিএম

নিজস্ব প্রতিবেদক

শেয়ারবাজার : থামছেই না দরপতন

২০১৮ সাল থেকে ধারাবাহিক দরপতনে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স পয়েন্ট হারিয়েছে ২২ শতাংশ। এ সময় অধিকাংশ কোম্পানিই দর হারিয়েছে। আর এতে বড় অঙ্কের লোকসানে পড়েছেন বিনিয়োগকারীরা। পুঁজিবাজারের এই টানা দরপতন ঠেকাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও সরকারের পক্ষ থেকে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়া হলেও তা কাজে লাগছে না। সাময়িক বিরতির পর গত চার সপ্তাহ ধরে আবারও পুঁজিবাজারে টানা দরপতন চলছে।

পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ২০১৮ সালের শুরু থেকে ব্যাংক ব্যবস্থায় সৃষ্ট তারল্য সংকটের কারণে পুঁজিবাজারে দরপতন শুরু হয়। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কারণেও ব্যক্তিশ্রেণির বড় ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা সাইডলাইনে চলে যান। এতে ক্রেতা সংকট তৈরি হয়, যা দরপতন ত্বরান্বিত করে। ২০১৮ সাল থেকে বিদেশিরাও পুঁজিবাজার থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নিচ্ছেন। এছাড়া দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন কোম্পানি আইপিও (প্রাথমিক গণপ্রস্তাব) ছাড়াও প্লেসমেন্ট শেয়ারের মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করেছেন, যা বাজারকে বড় ধরনের তারল্য সংকটের মুখে ফেলে দিয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি ও পিপলস লিজিং এন্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস কোম্পানির অবসায়ন বাজারকে আরও তলানিতে নামিয়ে এনেছে। যদিও আস্থাহীনতার কারণে এ সময় নতুন বিনিয়োগ আসেনি। সূত্র : দেশ রূপান্তর।

টানা দরপতনের কারণে ২০১৮ থেকে গত ১৯ সেপ্টেম্বরে ডিএসইর প্রধান সূচকটি ৬২৪৪ থেকে ৪৮৫৫ পয়েন্টে নেমে এসেছে। এ সময় সূচকটি কমেছে ১৩৮৯ পয়েন্ট বা ২২ দশমিক ২৪ শতাংশ।

পুঁজিবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়াতে গত ১৬ মে পুঁজিবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগ হিসাবায়ন থেকে অতালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ বাদ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর ফলে পুঁজিবাজারে ব্যাংকগুলোর আরও ৫ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হয়। এর আগে দরপতন ঠেকাতে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) প্লেসমেন্ট শেয়ার ইস্যু বাতিল করে পাবলিক ইস্যু বিধিমালা সংশোধনের ঘোষণা দেয়। ফলে মূলধন বাড়াতে এসইসির কোনো অনুমোদন না লাগলেও কোনো কোম্পানি যদি প্লেসমেন্ট ইস্যুর মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে, তাহলে এসইসি ওই অর্থের ব্যবহার খতিয়ে দেখবে।

এছাড়া সরকারের উচ্চপর্যায়ের সঙ্গে আলোচনা করে বুক বিল্ডিং ও স্থিরমূল্য পদ্ধতিতে আইপিওর আকার বাড়ানো, উদ্যোক্তা পরিচালকদের শেয়ার ব্লক হিসাবে রাখা, শর্ট সেল আইন ও কোম্পানির বোনাস শেয়ার ইস্যুতে শর্তারোপসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়। পরবর্তীকালে বাজেটে দ্বৈতকর পরিহার, করমুক্ত লভ্যাংশ আয়ের সীমা বাড়ানো ও বোনাস শেয়ার ইস্যু নিরুৎসাহিত করে প্রণোদনা দেয় সরকার। তবে এর কোনো প্রভাবই পুঁজিবাজারে পড়েনি। এমন পরিস্থিতিতে গত ১৬ সেপ্টেম্বর পুঁজিবাজারের সব অংশীজনকে নিয়ে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বৈঠক করলেও দরপতন থামেনি।

পর্যালোচনায় দেখা যায়, চলতি বছর টানা ১৪ সপ্তাহের দরপতনের পর বাজেটে প্রণোদনাকে কেন্দ্র করে জুন মাসে কিছুটা স্থিতিশীলতা দেখা যায় পুঁজিবাজারে। তবে জুলাই মাসে আবারও অস্থিরতা দেখা যায়। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের নিষ্ক্রিয়তা ও বিদেশিদের শেয়ার বিক্রির চাপে ২৮৩ পয়েন্ট হারায় ডিএসইএক্স। এরপর গত ২৫ আগস্ট থেকে পুঁজিবাজারে আবারও টানা দরপতন দেখা দেয়, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে। গত চার সপ্তাহে ডিএসইএক্স ৩৮১ পয়েন্ট হারিয়েছে। চলতি বছর সবচেয়ে বেশি দর হারিয়েছে সিমেন্ট, বস্ত্র, পাট, এনবিএফআই, ট্যানারি ও ইস্পাত খাত। গত সপ্তাহে ডিএসইতে কেনাবেচা হওয়া ৩৫৫টি সিকিউরিটিজের মধ্যে দর হারিয়েছে ২৩৯টি। এতে ডিএসইএক্স প্রায় ৭৮ পয়েন্ট কমে ৪৮৫৫ পয়েন্টে নেমে এসেছে, যা ২০১৬ সালের ৬ ডিসেম্বরের পর সর্বনিম্ন। আগের সপ্তাহেও সূচকটি ৭৯ পয়েন্ট হারিয়েছিল।

খাতওয়ারি পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত সপ্তাহে টেলিকম ও বীমা ছাড়া অন্যসব খাত দর হারিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দর হারিয়েছে পাট খাত। এ খাতটি ৯ দশমিক ৩৭ শতাংশ দর হারিয়েছে। প্রায় ৮ শতাংশ দর হারিয়েছে সিরামিক খাত।

এছাড়া তথ্যপ্রযুক্তি ৬ শতাংশ, ফার্মাসিউটিক্যালস ও বস্ত্রখাত ৫ শতাংশ, প্রকৌশল খাত ৩ দশমিক ৫ শতাংশ, সেবা ও নির্মাণ খাত ২ দশমিক ২ শতাংশ দর হারিয়েছে। এদিকে সরকারের পাওনা নিয়ে বিটিআরসির সঙ্গে চলমান বিবাদ আলোচনার মাধ্যমে মেটানোর উদ্যোগ নেয়ায় গত সপ্তাহে শীর্ষ মূলধনী কোম্পানি গ্রামীণফোনের শেয়ারদর উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এ কারণে গত সপ্তাহে টেলিকম খাতের বাজার মূলধন বেড়েছে সাড়ে ৯ শতাংশ।

এছাড়া দেশের সব ভবন বীমার আওতায় আনতে অর্থমন্ত্রীর উদ্যোগের কারণে তালিকাভুক্ত বীমা কোম্পানির শেয়ারেও বড় প্রভাব পড়েছে। গত সপ্তাহে সাধারণ বীমা সাড়ে ৬ শতাংশ ও জীবন বীমা কোম্পানির বাজার মূলধন ৮ শতাংশ বেড়েছে।

গত সপ্তাহে সবচেয়ে বেশি দর হারিয়েছে মুন্নু সিরামিক। কারসাজির সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে শাস্তির আওতায় আনতে এসইসির ঘোষণায় গত সপ্তাহে এ কোম্পানির শেয়ারদর কমেছে ৩৮ শতাংশ। একই গ্রুপের মুন্নু জুট স্টাফলার্সের দর কমেছে প্রায় ১৯ শতাংশ। কারসাজির অপর কোম্পানি আলহাজ টেক্সটাইলের দর কমেছে ২৫ শতাংশ।

এছাড়া জেএমআই সিরিঞ্জ, সায়হাম কটন, কেঅ্যান্ডকিউ, জেমিনি সী ফুড, স্টাইলক্রাফটস, ওয়াটা কেমিক্যাল ও সায়হাম টেক্সটাইল উল্লেখযোগ্য পরিমাণে দর হারিয়েছে।

পূর্বকোণ/রাশেদ

The Post Viewed By: 268 People