চট্টগ্রাম শনিবার, ১৬ জানুয়ারি, ২০২১

১৩ জানুয়ারি, ২০২১ | ১২:০২ অপরাহ্ণ

শিবু কান্তি দাশ 

করোনায় রপ্তানি কমছে স্থিতিশীল রেমিট্যান্স

অর্থনীতিতে বিপর্যয়ের শঙ্কা

মহামারী করোনার দ্বিতীয় ধাপে এসে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান দুটি খাত রপ্তানি ও রেমিট্যান্স নিয়ে খানিকটা উদ্বেগ দেখা দিয়েছে সরকারে। রেমিট্যান্স এখন পর্যন্ত স্থিতিশীল হলেও রপ্তানি কমছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আগামী কয়েক মাসে রপ্তানি ও রেমিট্যান্সে আঘাত লাগার আশঙ্কা বেশি। কারণ, দেশে বর্তমানে করোনা পরিস্থিতির অবনতি না হলেও ইউরোপজুড়ে এখনও করোনা তা-ব চলছে। এর আঘাত যদি রপ্তানি ও রেমিট্যান্স খাতে লাগে, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো দেশের অর্থনীতি। করোনা মহামারীর প্রথম ধাক্কায় দেশের অর্থনীতি ঠিকঠাক ছিল বলেই জানিয়েছিল সরকার। কিন্তু করোনার দ্বিতীয় ধাপে ইউরোপ পরিস্থিতিসহ কয়েকটি বড় দেশের ভয়াবহ অবস্থায় সরকারের শীর্ষ কর্তব্যক্তিদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়তে শুরু করেছে।

ইংল্যান্ডের পরিস্থিতি ভয়ানক উল্লেখ করে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)-এর গবেষক ড. জায়েদ বখত বলেন, ‘মনে হচ্ছে করোনার দ্বিতীয় ধাপের প্রভাবে ইউরোপের রপ্তানি বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একইভাবে ইউরোপের দেশগুলো থেকে পাঠানো রেমিট্যান্সেও আঘাত লাগতে পারে।

প্রসঙ্গত, করোনাভাইরাস মহামারীর শুরুর ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউয়ের ধাক্কা লেগেছে রপ্তানি খাতে। অবশ্য দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি রেমিট্যান্স খাতে এখনও তেজিভাব দেখা যাচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, করোনাকালে বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করেছে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। শুধু আর্থিকভাবেই নয়, করোনাকাল মোকাবিলায় সরকারের মনোবল বৃদ্ধিতেও বড় ভূমিকা রেখেছে প্রবাসীদের পাঠানো রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স। রেমিট্যান্সের কারণে ব্যাংকে তারল্যের সংকট দূর হয়েছে। এই রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়ে যাওয়ার ফলে সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন করা সহজ হয়েছে। রেমিট্যান্সের টাকায় ছোট ছোট হাজার হাজার উদ্যোক্তা তৈরি হয়েছে। গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হয়েছে। এই রেমিট্যান্সে ভর করে বাংলাদেশের রিজার্ভ ৪৩ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর এই ছয় মাসে রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩৭ দশমিক ৬০ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে, ডিসেম্বর মাসে ২০৫ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে। গত বছরের একই সময়ে এসেছিল ১৫৯ কোটি ১৬ লাখ ডলার। মহামারির মধ্যেই চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে দুই দশমিক ছয় বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স এসেছিল দেশে, যা এযাবৎকালের সর্বোচ্চ।

এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্স ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুরের মতে, বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান দুটি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হলে এর প্রভাব পড়বে পুরো অর্থনীতিতে।

তিনি বলেন, ‘করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের কারণে ইতোমধ্যে বিশ্ববাজারে তৈরি পোশাকের চাহিদা কমে এসেছে। নতুন রপ্তানি আদেশ খুব বেশি আসছে না।’

প্রসঙ্গত, মহামারী করোনাভাইরাসের কারণে গত মার্চ থেকে কয়েক ধাপে ৬৬ দিনের ছুটি ঘোষণা করে সরকার। সে সময় অর্থনীতির চাকা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলেও একমাত্র প্রবাসী আয় বাড়তে থাকে। এদিকে, করোনাভাইরাস মহামারীর অভিঘাতে তৈরি পোশাক রপ্তানি এবং রেমিট্যান্স কমে গিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক।

বিশ্বব্যাংকের অর্ধবার্ষিক প্রতিবেদন ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুকের’ জানুয়ারি সংখ্যায় এই ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনা মহামারীর কারণে বিশ্বজুড়ে তৈরি পোশাকের চাহিদা কমে যাওয়ায় বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষ রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বিশ্বব্যাংক বলছে, প্রবৃদ্ধির জন্য বাহ্যিক উৎসের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার হবে দুর্বল। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের কারণে বাংলাদেশে রপ্তানি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দুর্বল থাকবে। তবে উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার খুব শ্লথ হওয়ায় এবং যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে নতুন করে মহামারীর প্রকোপ বাড়ায় সামনের দিনগুলোতে বাংলাদেশসহ রেমিট্যান্সনির্ভর দেশগুলোর ঝুঁকি বাড়বে বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক।

এদিকে ঘুরে দাঁড়ানো রপ্তানি আয়ে ফের ধাক্কা লাগতে শুরু করেছে। সর্বশেষ গত ডিসেম্বরে আবার হোঁচট খেয়েছে রপ্তানি। করোনা মহামারীকালে বিদায়ী বছরের শেষ মাসে পণ্য রপ্তানি থেকে ৩৩১ কোটি ডলার আয় করেছে বাংলাদেশ। এই অঙ্ক ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের চেয়ে ৬ দশমিক ১১ শতাংশ কম। আর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম ৬ দশমিক ১৩ শতাংশ। ডিসেম্বরের এই ধসের ধাক্কা ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেও (জুলাই-ডিসেম্বর) লেগেছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরের চেয়ে এই অর্থবছরে একই সময়ে রফতানি কমেছে শূন্য দশমিক ৩৬ শতাংশ। যদিও অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে অর্থাৎ জুলাই-নভেম্বর সময়ে ১ শতাংশের মতো প্রবৃদ্ধি হয় রপ্তানি আয়ে।

এ প্রসঙ্গে নিট পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ’র সহ-সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘দ্বিতীয় ঢেউয়ের কারণে বিশ্ববাজারে তৈরি পোশাকের চাহিদা কমে এসেছে। এখন নতুন আদেশ খুব বেশি আসছে না।’ আগামী কয়েক মাস পরিস্থিতি খারাপ যাবে বলেই মনে করেন তিনি।

তৈরি পোশাক কারখানা মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি ড. রুবানা হক বলেছেন, করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের কারণে অনিশ্চয়তা আর শঙ্কায় আমরা বিপর্যস্ত। করোনার টিকার প্রাপ্যতা এখনও নিশ্চিত হয়নি। আমাদের শঙ্কা, পোশাক রপ্তানির নিম্নমুখী প্রবণতা আগামী এপ্রিল পর্যন্ত থাকতে পারে।

এদিকে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) হালনাগাদ যে তথ্য প্রকাশ করেছে, তাতে দেখা যায়, জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে তৈরি পোশাক রফতানি থেকে আয় হয়েছে এক হাজার ৫৫৪ কোটি ৫৫ লাখ ডলার। এই অঙ্ক গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে তিন শতাংশ কম। আর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম চার দশমিক ১২ শতাংশ।

পূর্বকোণ/পি-আরপি

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 566 People

সম্পর্কিত পোস্ট