চট্টগ্রাম সোমবার, ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৯

সর্বশেষ:

২৭ অক্টোবর, ২০১৯ | ১২:৪৮ পূর্বাহ্ন

প্রবাস ডেস্ক

ছোট্ট সুন্দর ভুটানে শান্তির পরশ

শুধু প্রাকৃতিক দৃশ্য বা বৌদ্ধধর্ম নয়, ছোট্ট এই দেশ আমাদের শেখায় বেঁচে থাকার মানেও ভারত-চিনের মাঝে হিমালয়ের কোলে ছোট্ট দেশ ভুটান। ছবির পোস্টকার্ডের মতো ছিমছাম এই দেশে যাওয়ার উদ্দেশ্য শুধু মাত্র তার নৈসর্গিক দৃশ্য উপভোগ করা নয়। শুনেছিলাম যে, জিএনপি’তে (গ্রস ন্যাশনাল প্রোডাক্ট) নয়, ভুটান মনে প্রাণে বিশ্বাস করে জিএনএইচ-এ (গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস)। দেশের রাজা থেকে সাধারণ মানুষ, সকলের একটাই উদ্দেশ্য। তা হল আনন্দে থাকা, সুখে থাকা। এই ছোট্ট দেশটার কাছে মহাদেশগুলো হেরে গিয়েছে দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের দৌঁড়ে।

যাত্রা শুরু হল উত্তরবঙ্গের হাসিমারা থেকে। হাসিমারা থেকে ভুটানের ফুন্টশোলিং আধ ঘণ্টার রাস্তা। ফুন্টশোলিংয়ের ইমিগ্রেশন হাউস থেকে অনুমতিপত্র পাওয়ার পরে গাড়িনিয়ে সোজা ভুটানের রাজধানী থিম্পু। যাত্রা শুরুর আগে গাড়ির চালক জানিয়ে দিলেন, জেব্রা ক্রসিং দিয়ে রাস্তা পারাপার না করলে এবং যত্রতত্র ময়লা ফেললে জরিমানা দিতে হবে। এখানে নিয়ম ভেঙে চোখে ধুলো দেয়া যায় না। সুতরাং সাবধান! থিম্পু পৌঁছতে পৌঁছতে সন্ধে হয়ে গেল। মেঘের আড়াল থেকে উঁকি দিচ্ছিল আধভাঙা চাঁদ। পাহাড়ের গায়ে বাড়িগুলোর আলো যেন নক্ষত্র। একটা সময়ে অন্ধকার পাহাড়ি পাকদ-ী ঠেলে হুশ করে ঢুকে পড়লাম ঝলমলে আলোকিত গমগমে এক শহরের এটাই থিম্পু। হোটেলের বারান্দা থেকে চোখ চলে গেল বহু দূরে… পাহাড়ের মাথায় কে যেন একা বসে ! ধ্যানমগ্ন বুদ্ধ ! রুম সার্ভিসের মেয়েটি জানালেন, ওটা পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ বুদ্ধমূর্তি। ব্রোঞ্জের তৈরি, উচ্চতা ১৬৯ ফুট। জায়গাটির নাম বুদ্ধ পয়েন্ট।

পরদিন স্থানীয় রেস্তারাঁয় সুস্বাদু ভুটানি ডিশ বাথআপ (হাতে তৈরি নুডলস দিয়ে তৈরি থুক্পা), রুটি ও এমা দাশি (চিজ ও লঙ্কার পদ) সহযোগে প্রাতরাশের পর থিম্পু চষে বেড়ালাম। ন্যাশনাল টেক্সটাইল মিউজিয়ম, ফোক হেরিটেজ মিউজিয়ম, মেমোরিয়াল চোর্তেন (স্মৃতিসৌধ), মাইথাং টাকিন প্রিজার্ভ ইত্যাদি। টাকিন ভুটানের জাতীয় পশু। এখন অবশ্য অবলুপ্তির পথে। দেখা হল থিম্পুর সবচেয়ে পুরনো বৌদ্ধমঠ চাংগাংখা লাখাং, প্রায় ৮০০ বছরের পুরনো। নবজাতকের দীর্ঘায়ু কামনায় বাবা-মায়েরা আসেন এই মঠে। সবশেষে বুদ্ধ পয়েন্ট। সন্ধে নামার মুখে তখন চারিদিক মুখরিত গংয়ের আওয়াজে। থিম্পু থেকে পুনাখা যেতে সময় লাগে আড়াই ঘণ্টা। যাওয়ার পথে দোচুলা পাস। এখানে থামতেই হল। পাইন বনের মধ্যে কুয়াশার লুকোচুরি খেলার ফাঁকে ঝাঁকিদর্শন হচ্ছিল তুষারাবৃত হিমালয়ের। এখানে আছে ১০৮টি চোর্তেন, একসঙ্গে যাদের বলে ড্রুক ওয়াংগিয়াল চোর্তেনস। আছে একটি বৌদ্ধমঠও। দোচুলার কাফেতে ধোঁয়া তোলা কফি এবং টাটকা কেক-প্যাটি খেয়ে আবার যাত্রা শুরু। পুনাখা ভুটানের শীতকালীন রাজধানী। পাহাড়ের মাঝে মাঝে সোনালি ধানখেত। নীচ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে দু’টি নদী— পো চু এবং মো চু। এই দুই নদীর মাঝে পুনাখা জং (বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের গুম্ফা ও সরকারি দপ্তর)। টিকিট কেটে জংয়ের ভিতর ঘুরে দেখা যায়।

পুনাখা থেকে গন্তব্য পারো। পাহাড় ঘেরা পারোর বিমানবন্দর ভুটানের একমাত্র এয়ারপোর্ট ‘দ্য মোস্ট ডিফিকাল্ট কমার্শিয়াল এয়ারপোর্ট অব দ্য ওয়ার্ল্ড’। পারোর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে চোখ জুড়িয়ে যায়। পারো মিউজিয়ম, জং, বৌদ্ধমঠ ইত্যাদি দেখার পর অভিযানের প্রস্তুতি! উত্তর পারো থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে প্রায় সাড়ে ১০ হাজার ফুট ওপরে পাহাড়ের গায়ে তাকসাং বৌদ্ধমঠ যাওয়া একরকম অভিযানই বটে। ১৬৯২ সালে তৈরি হয় এটি। লোককথা, বৌদ্ধগুরু পদ্মসম্ভব বাঘের পিঠে চড়ে তিব্বত থেকে সোজা উড়ে এসেছিলেন এখানে। যার জন্য এই মঠের আর এক নাম টাইগার মনেস্ট্রি। তিব্বতের মতো ভুটানের মানুষ তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের উপাসক। শুধু ধর্ম নয়, পোশাক, খাদ্য, সংস্কৃতি… ভুটানে তিব্বতের ছোঁয়া স্পষ্ট। বাড়ি থেকে পোস্ট অফিস, পেট্রল পাম্প থেকে সুলভ শৌচালয় সবেরই নকশা এক রকম! অধিকাংশ হোটেল, রেস্তারাঁ, দোকান মহিলাকর্মী দ্বারা পরিচালিত। ভুটানিরা সদাহাস্যময়, বড় আলাপি। এখানে মেয়েরা যেমন সুন্দরী, তেমনই স্বাধীনচেতা। ছোট থেকে বৃদ্ধ… সকলেই সব সময়ে পরেন জাতীয় পোশাক।

পারো থেকে চেলে লা (গিরিপথ) হয়ে হা উপত্যকা। প্রায় ১৩ হাজার ফুট ওপরে চেলে লা পাসে কনকনে ঠা-া বাতাসের জন্য এক মিনিটও দাঁড়ানো দায়। কিন্তু সাদা-নীল ধবধবে আকাশ, হাজার হাজার প্রেয়ার ফ্ল্যাগের মধ্য দিয়ে বরফে মোড়া হিমালয়ের রূপ দেখতে দাঁড়াতেই হবে। সেখান থেকে হা উপত্যকা যাওয়ার পথের দু’ধারে রডোডেনড্রন ও পাইন, নাম না জানা গাছের লাল, হলুদ, কমলা পাতার কম্পোজিশন মনে করিয়ে দেয় প্রকৃতিই সর্বশ্রেষ্ঠ শিল্পী। আর পাহাড়ের চড়াই উতরাই ভাঙা নয়, বৌদ্ধমঠের ইতিহাস খুঁজে বেড়ানো নয়। হাতে আসা শুধুমাত্র প্রকৃতির মাঝে বসে একটু বিশ্রাম নেয়ার জন্য, আবার রোজকার জীবনে ফিরে যাওয়ার আগে।

The Post Viewed By: 73 People

সম্পর্কিত পোস্ট