চট্টগ্রাম সোমবার, ২১ অক্টোবর, ২০১৯

সর্বশেষ:

৪ মে, ২০১৯ | ২:৪২ অপরাহ্ণ

মীর নাজমিন

মফস্বল জীবনে ঈদ

বছর ঘুরে এলো খুশির এই ঈদ, খুশিতো লাগে মনে আসে নাকো নিদ- একটি জনপ্রিয় ঈদের গান। মূলত রমজান শুরু হওয়ার সাথে সাথেই ঈদের আমেজটা শুরু হয়ে যায় ঘরে ঘরে। শুরু হয়ে যায় দিন-ক্ষণ গণনা। আজ রোজা কয়টা গেল? ঈদের আর কয়দিন বাকী আছে? উৎসাহ উদ্দীপনার যেন সীমা থাকে না আর। চলতে থাকে ঈদ পরিকল্পনা। কিভাবে গৃহসজ্জা করবে, অতিথিদের জন্য কী কী পিঠাপুলি বানাবে, কোন ধরনের জামা কিনবে, কখন মার্কেটে গিয়ে কেনাকাটা করবে, ঈদে কোথায় কোথায় বেড়াতে যাবে ইত্যাদি ইত্যাদি। এমন হাজারো পরিকল্পনা করতে থাকে গ্রামীণ উৎসুক মুসলমান নরনারী। এবার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পালা।
রমজানের কয়েকদিন যেতে নাযেতেই শুরু করে দেয় গৃহসজ্জার কাজ। পাকা বাড়িকে নতুন করে রঙ করায়। মেঝে ধুয়ে মুছে ঝকঝকে তকতকে করার চেষ্টা করে। পাকাবাড়ি যাদের নেই তারাও ধুয়ে-মুছে-লেপে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে সামর্থ্যানুযায়ী বিভিন্নভাবে নিজেদের মনের মতো করে সাজানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে। ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা উতলা হয়ে ওঠে মার্কেটে যাওয়ার জন্য, নতুন জামা-জুতো কেনার জন্য। বাবা মায়ের কাছে তারা বারবার জানতে চায় কখন মার্কেটে যাবে? কখন নতুন জামা কিনবে? ঈদের কয়েকদিন আগেই তারা বাবা-ভাইয়ের সাথে মার্কেটে গিয়ে পছন্দের জামা জুতো কিনে আনে। আর নতুন জামা জুতো কেনার উল্লাসে নাচতে থাকে। রমজানের শুরু থেকেই মফস্বলের মার্কেটগুলো জমজমাট হয়ে ওঠে। তবে ঈদের কয়েকদিন আগে থেকে মানুষের উপচে পড়া ভীড় চোখে পড়ে এসব মার্কেট বা শপিংমলগুলোতে। স্থায়ী দোকানের পাশাপাশি রাস্তা বা ফুটপাতে বসে ভাসমান হকাররা। বাজারের সরু রাস্তাগুলোতে তখন হাটাই কষ্টকর হয়ে পড়ে। গ্রামের নিম্ন আয়ের লোকজন এসব ভাসমান হকারের কাছ থেকেই তাদের প্রয়োজনীয় কেনাকাটা সেরে নেয়। কারণ মার্কেটের দোকানগুলো থেকে এসব হকারের কাছ থেকে তুলনামূলক কম দামে পণ্য কেনা যায়।
সচরাচর গ্রামের পুরুষরা পাঞ্জাবি, পায়জামা, লুঙ্গি আর মহিলারা শাড়ি পড়ত ঈদের সময়। কিন্তু বর্তমানে এই দৃশ্যপট অনেকটাই পাল্টে গেছে। আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে গ্রামের উপকণ্ঠেও। আবহমান গ্রামে বেড়ে উঠলেও বর্তমানের তরুণ-তরুণীরা শুধু পাঞ্জাবি পায়জামা বা শাড়িতে আর সন্তুষ্ট নয়। শহুরে ধাচের আধুনিক পোষকই তাদের পছন্দ। শার্ট, টি-শার্ট, জিন্স, ফতুয়া, সেলোয়ার, কামিজ, টপ আর জিন্স এসবই এখন তাদের পছন্দের পোষাকের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। অনেকে আবার অনলাইন আর স্যাটেলাইট চ্যানেলের বদান্যতায় হলিউড/ডালিউড/বলিউডের জনপ্রিয় হিরো হিরোইনকে অনুকরণ অনুসরণ করে পোশাক পরিধানের চেষ্টা করে। মফস্বলের শপিংমলগুলোতে তাদের প্রত্যাশিত পোষাকগুলো পাওয়া যায়না বলে অনেকে আবার ঈদের কেনাকাটার জন্য ছুটে যায় নগরীর শপিংমলগুলোতে। কিনে নিয়ে আসে তাদের কাক্সিক্ষত পরিধেয় পোশাক-আশাক।
ঈদের আগের দিন সবাই উদগ্রীব হয়ে থাকে-ঈদের চাঁদ উঠবে তো আজ! ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা সন্ধ্যা হবার আগে থেকেই সদলবলে ঘরের বাইরে অবস্থান নেয়। চেয়ে থাকে পশ্চিমাকাশে। কখন উঁকি দেবে ঈদের বাঁকা চাঁদ। বড়রা যখন শেষ রমজানের ইফতার নিয়ে ব্যস্ত হঠাৎ বাচ্চারা সমস্বরে গলা উঁচিয়ে বলতে থাকে “চাঁদ দেখা গেছে।” তিন শব্দের ছোট্ট এই বাক্যটি কানে যাওয়া মাত্রই সবার মনে বয়ে যায় খুশির হাওয়া। মুহূর্তেই যেন শিহরণ জাগে সবার প্রাণে। ইফতারের পরপরই সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ে নানান কাজে। মহিলারা ঘরকন্নার কাজে আর পুরুষরা বাইরে। পাড়ার তরুণ যুবারা ছুটে যায় ঈদগাহের পানে। সবাই মিলে পরামর্শ পরিকল্পনা করতে থাকে কিভাবে সাজানো হবে ঈদগাহ ময়দান আর পাড়ার রাস্তাঘাট। যেই পরিকল্পনা সেই কাজ শুরু। সবাই মিলে সারারাত জেগে মনের মতো করে সাজায় ঈদগাহ প্রাঙ্গণ। রাত ভোর হলেই যেখানে হাজারো মুসল্লির সমাগম হবে ঈদের নামাজ আদায়ের জন্য। খুশি যেন আর ধরে না তাদের। বর্তমানে সাজসজ্জার কাজের সাথে আরো কিছু যোগ করে নিয়েছে তারা। উচ্চস্বরে গান বাজানো তার সাথেসাথে আতশবাজি ফুটানো। যা কিছুদিন আগেও গ্রামের পরিবেশের সাথে বড্ড বেমানান ছিল। কিন্তু বর্তমান তরুণ প্রজন্মের কাছে এযেন স্বাভাবিক একটি ব্যাপার। ঘরের মহিলারা ব্যস্ত হয়ে পড়ে বিভিন্ন পিঠাপুলি বানানো নিয়ে। রাত জেগে প্রতি ঘরে ঘরে চলে বিভিন্ন রকম পিঠা বানানোর উৎসব। অনেকেই আবার কোরমা পোলাও রান্না করে ঈদের দিনের জন্য। তরুণীরা ব্যস্ত হয়ে পড়ে রূপচর্চা নিয়ে। কিভাবে নিজেকে আরো আকর্ষণীয় করে সাজানো যায় সেটা নিয়ে। রাত জেগে মেহেদিতে হাত পা রাঙানো নিয়ে ব্যস্ত, কেউ কেউ আবার বিভিন্ন প্যাক বানিয়ে ত্বকে লাগায়। অনেকে আবার নিজের উপর ভরসা করতে না পেরে চলে যায় বিউটি পার্লারে।
ঈদের আগে বিউটি পার্লারগুলোতে ফ্যাশন সচেতন মহিলাদের উপচে পড়া ভিড় থাকে। জমে ওঠে তাদের ব্যবসা। অথচ ক’দিন আগেও এই বিউটি পার্লার সম্পর্কে গ্রামের মানুষের কোন ধারণাই ছিল না। এভাবেই কেটে যায় ঈদের আগের রাত। কেউ হয়তো একটু ঘুমায়, তবে অধিকাংশই কাটায় নির্ঘুম ব্যস্ত রজনী। ভোরের আলো ফুটার আগেই জেগে উঠে শিশু কিশোররা। চোখভরা আনন্দ নিয়ে তাকায় মিটিমিটি করে। তবে আমার মতো কিছু ঘুমকাতুরে থাকে যাদের অনেকবার ডেকেই ঘুম ভাঙাতে হয়। আবার ব্যস্ততার শুরু।এবার সবাই স্নান করা নিয়ে ব্যস্ত। কে কার আগে স্নান করবে সেটা নিয়ে যেন প্রতিযোগীতা চলে। অনেক সময় শীতের ভোরে গরম পানি দিয়ে গোসল করে অনেকে। সদ্য আলো ফুটা ভোরে নতুন সুগন্ধি সাবানের গন্ধে পুরো গ্রাম যেন ম ম করে। চারিদিকে সাজ সাজ রব পড়ে যায়। ছেলেরা নতুন পাঞ্জাবী পায়জামা বা লুঙ্গি পড়ে, গায়ে সুগন্ধি মেখে ছুটে যায় ঈদগাহের পানে। সাথে হাত ধরে নিয়ে যায় ছোট শিশুকেও। আর মহিলারা রান্না করেন ফিরনি, পায়েস, সেমাই ইত্যাদি। ঈদের নামাজ শেষে সবাই সবার সাথে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়। কোলাকুলি করে, বুকের সাথে বুক মিলিয়ে এক প্রাণের আনন্দ যেন ছড়িয়ে দেয় অন্য প্রাণেও। সবাই যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। সারা বছরের জমানো ক্ষোভ আর অভিমান ভুলে সবার মধ্যে আবার সৌহার্দ্য সম্প্রীতি গড়ে তোলাই ঈদের মূলমন্ত্র। কাজী নজরুল তাই তাঁর গানে গেয়েছিলেন “আজ ভুলে যা তোর দোস্ত দুশমন হাত মিলাও হাতে/ তোর প্রেম দিয়ে গড় বিশ্ব নিখিল ইসলামের মুরিদ।” গ্রামের সবাই সবার ঘরে ঘরে গিয়ে সালাম দোয়া বিনিময় করে। পাশাপাশি মিষ্টিমুখও করা হয়। এ যেন গ্রামীণ ঈদের হাজার বছরের ঐতিহ্য। ছোটছোট ছেলেমেয়েরা ও এঘর থেকে ওঘরে ছুটে বেড়ায় ঈদ সালামির আশায়। নাস্তা খাওয়ার চেয়েও সালামির কিছু টাকা পেলেই যেন তারা খুশিতে আত্মহারা হয়ে যায়। সালামীর আশায় নানার বাড়ি, খালার বাড়ি যেতাম ঈদের সময়। তবে এখন বড় হয়ে যাওয়ায় অনেকেই আর সালামী দেয় না। উল্টো নিজের থেকেই খোয়া যায়।
গ্রামের তরুণ তরুণীরা আগে ঈদকার্ড দিয়ে একে অপরকে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করতো। একে অপরকে নিজের বাড়িতে দাওয়াত দিতো। অত্যন্ত মজার ছিল সেসব দিনগুলি। কিন্তু বর্তমান ডিজিটাল যুগে ঈদকার্ডের সেই এনালগ সিস্টেম যেন তার সৌন্দর্য আর আবেদন হারিয়ে ফেলেছে। এখনকার তরুণ সমাজ ঈদকার্ডে আর শুভেচ্ছা বিনিময় করে না। তারা শুভেচ্ছা বিনিময় করে ডিজিটাল সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে। মোবাইলে এসএমএস, ফেইসবুক, টুইটার, হোয়াটস আপ, ভাইভার আর ইমুতেই ওদের শুভেচ্ছা বিনিময় আর ঈদের অনুভূতি শেয়ার করা। ঈদকার্ড তাদের কাছে এখন রম্য গল্পের মতো।
গ্রামীণ মানুষের আন্তরিকতা, আতিথেয়তা, সরলতা এসবের কোন সীমা থাকে না। একে অপরের খোঁজ খবর নেওয়া, দেখভাল করা এগুলো গ্রামে খুবই স্বাভাবিক। আর যেসব আত্মীয়ের বাসায় খুব একটা আসা যাওয়া হয় না ঈদের সময় বছরে একবার হলেও তাদের বাসায় যাওয়া হয়, কুশলাদি বিনিময় হয়। কিন্তু বর্তমান তরুণ প্রজন্মের কাছে এসব যেন অতিরিক্ত কিছু এবং সবচেয়ে বিরক্তিকর কাজ। তাদের কাছে আন্তরিকতা যেন অযাচিত একটি বস্তু। প্রয়োজন ছাড়া কোথাও কোন আত্মীয়ের বাসায় এক পা ফেলতেও তারা নারাজ। ডিজিটাল যুগের এই যান্ত্রিকতা কেড়ে নিয়েছে তাদের আবেগ, তাদের আন্তরিক অনুভূতি। শহুরে আধুনিকতার ছোঁয়ায় তারা ধীরে ধীরে যান্ত্রিক হয়ে যাচ্ছে। শিথিল হয়ে যাচ্ছে আত্মীয়তার বন্ধন। কারো বাসায় গিয়ে কুশলাদি বিনিময়ের চেয়ে মোবাইলে ভিডিও গেইমস খেলা, ফেইসবুকে চ্যাট করায় তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। অথচ আমাদের বাবা দাদারা ঈদের সময়ে তাদের সব আত্মীয়ের সাথে দেখা সাক্ষাত করাকে রীতিমত কর্তব্য বলে মনে করতেন। বর্তমান তরুন প্রজন্মের যে মন মানসিকতা তা চলতে থাকলে গ্রামীণ ঈদের যে স্বতন্ত্র স্বকীয়তা, গ্রামীণ ঈদের যে সৌন্দর্য তা অচিরেই ম্লান হতে বাধ্য।
শুধুমাত্র ঈদ নয়, গ্রামীণ যে একটা নিজস্ব সমৃদ্ধ ঐতিহ্য, সমৃদ্ধ সংস্কৃতি রয়েছে আধুনিকতার ছোঁয়ায় গ্রামীণ তরুণরা আজ তা হারিয়ে ফেলতে বসেছে। ভুলে যেতে বসেছে গ্রামীণ মানুষের যুগযুগ ধরে চলে আসা জীবনাচার। এটা সত্য যে বর্তমান যুগ আধুনিক যুগ, ডিজিটালাইজেশনের যুগ। স্রোতের অনুকূলে গা ভাসিয়ে গ্রামের তরুণদেরও এগিয়ে যেতে হবে সামনের দিকে। সমানে সমানে পাল্লা দিতে হবে বিশ্বের সাথে। কিন্তু শিকড়কে ভুলে নয়। যুগযুগ ধরে চলে আসা গ্রামীণ এসব সংস্কৃতি বর্ধন করেছে গ্রামের সৌন্দর্যকে। বারবার আকর্ষণ করেছে সংস্কৃতিপ্রেমীদের। এতো সমৃদ্ধ, আকর্ষণীয় সংস্কৃতিকে অবহেলা করে নয়, বরং তাকে বুকে ধারণ করেই সামনে এগুতে হবে তরুণ প্রজন্মকে।

The Post Viewed By: 338 People

সম্পর্কিত পোস্ট