চট্টগ্রাম সোমবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০২৩

২০ মে, ২০১৯ | ১:৫৯ পূর্বাহ্ণ

মিনহাজ হোসাইন

মৌলিক শিক্ষার বিকাশ ও মান-উন্নয়ন

বিশ্বে শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যেও ব্যাপকতর হারে কর্ম দক্ষতাহীন, মূল্যবোধহীন, বিচারবুদ্ধিহীন মানুষের অস্তিত্ব রয়েছে। ‘সবার জন্য শিক্ষা’ ও শিক্ষিতের হার বাড়ানোই রাষ্ট্রের উন্নয়নকে স্থায়ী করছে না, বরং রাষ্ট্রের সামাজিক চাহিদা পূরণে কখনো কখনো ব্যর্থ। দীর্ঘমেয়াদে ব্যক্তির বিচারবুদ্ধি বিকাশের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের আর্থ-সামাজিক পরিবর্তন, স্থায়ীত্ব, সাম্য প্রতিষ্ঠাও শিক্ষার উদ্দেশ্য ও শিক্ষিতের দায়িত্ব। তাই গুণগত শিক্ষা বা মানসম্মত শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। গুণগত শিক্ষার ধারণা নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে। অনেকেই পরিমাণগত শিক্ষা অর্জনের পর গুণগত শিক্ষার বিকাশ ঘটতে পারে বলে মত দেন। তবে ইউনেস্কো দ্বিমত পোষণ করে বলেছে পরিমাণগত ও গুণগত বিকাশ একই সাথে ঘটতে পারে। ইউনেস্কো ইতোমধ্যেই টেকসই উন্নয়নের প্রেক্ষিতে গুণগত শিক্ষার ধারণা ও গুরুত্ব বিশেষভাবে তুলে ধরেছে। ইউনেস্কো ২০০৫ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত দশ বছর জাতিসংঘ শিক্ষা দশক ঘোষণা করে। উদ্দেশ্যই ছিল গুণগত শিক্ষার লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, উপাদান ও কর্মপরিকল্পনা নির্ধারন। সংস্থাটি গুণগত শিক্ষাকে টেকসই উন্নয়নের পূর্বশর্ত হিসেবে গণ্য করেছে। পাশাপাশি গুণগত শিক্ষাকে একটি রাষ্ট্রের ভিশন বাস্তবায়নের সামাজিক সামর্থ্য বাড়িয়ে টেকসই উন্নয়নের মৌলিক বাহনও বলা হয়েছে। মোটাদাগে গুণগত শিক্ষার উদ্দেশ্য বলা যায়-
১. বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি ও কারিগরী দক্ষতা অর্জন করা
২.উদ্দীপনা লাভ ও বিচারবুদ্ধি সম্পন্ন ও সমাজ সহায়ক মনোভাব সৃষ্টি
৩.প্রয়োজনীয় আচরণ,মূল্যবোধ ও জীবনশৈলী প্রতিপালনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সাম্য নিশ্চিত।
এ পরিপ্রেক্ষিতে গুণগত শিক্ষার প্রধান ক্ষেত্র নির্ধারণ করা হয়েছে, এগুলো হচ্ছে-
১. মৌলিক শিক্ষার বিকাশ ও মান-উন্নয়ন
২.টেকসই উন্নয়ন সাধনের লক্ষ্যে সকল পর্যায়ে বিরাজমান শিক্ষা কার্যক্রমে নব দিগন্তের সূচনা করা
৩.প্রশিক্ষণ প্রদান ও
৪.উচ্চ শিক্ষা অন্তর্ভূক্তকরণ। তবে গুণগত শিক্ষার ক্ষেত্রে সম অধিকার ও সুযোগ পাওয়ার সম্পর্ক বিদ্যমান। গুণগত শিক্ষার ক্ষেত্রে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, শিক্ষার্থী-শিক্ষার্থী, অভিভাবক-শিক্ষক-শিক্ষার্থী, সমাজ-অভিভাবক-শিক্ষক-শিক্ষার্থী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান-প্রশাসন-সমাজ সম্পর্ক ও সমন্বয় জরুরি। সার্বিকভাবে বললে ব্যক্তির জ্ঞান, দক্ষতা, দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধের ইতিবাচক ও স্থায়ী পরিবর্তনে সহায়ক এবং পারিবারিক, আঞ্চলিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিপ্রেক্ষিতে বাস্তব জীবনের উপযোগী টেকসই শিক্ষা হচ্ছে গুণগত শিক্ষা। গুণগত শিক্ষা
নিশ্চিতকরণে অপরিহার্য উপাদানগুলো হচ্ছে-
১.আধুনিক ও যুগপোযোগী শিক্ষাক্রম
২.পর্যাপ্ত সংখ্যক যোগ্য শিক্ষক
৩.প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষাদান সামগ্রী ও ভৌত অবকাঠামো
৪. যথার্থ শিক্ষণ-শিখন পদ্ধতি
৫. কার্যকর ব্যবস্থাপনা ও তত্ত্বাবধান
৬.উপযুক্ত মূল্যায়ন পদ্ধতি
৭. গবেষণা ও উন্নয়নের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ
৮.ধারাবাহিক পরিবীক্ষণ। বাংলাদেশে বর্তমানে শিক্ষা সংখ্যাতত্ত্বের মারপ্যাঁচে আটকে আছে। বাংলাদেশে শিক্ষার প্রাথমিক পর্যায়ে বালক-বালিকার সংখ্যা বৃদ্ধি, ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়া, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি, উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার প্রসার, প্রাথমিক-মাধ্যমিক-উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে পাসের হার বৃদ্ধি, উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের হার বৃদ্ধি পরিমাণগত শিক্ষার ইতিবাচক দিক তুলে ধরলেও শিক্ষার মান উন্নয়নে অগ্রগতি বহুদূর। বেশিরভাগ শিক্ষার্থী শিক্ষার প্রান্তিক যোগ্যতা অর্জনে পিছিয়ে। এছাড়াও নীতি নির্ধারকদের কাছে শিক্ষার্থী জীবনকেন্দ্রিক ও সমাজ উন্নয়ন সহযোগী শিক্ষাধারা গুরুত্ব পাচ্ছে না।
ফলে শিক্ষার নতুন অপচয় সৃষ্টি হচ্ছে। বাংলাদেশ ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমিয়ে, নারীদের ব্যপকহারে শিক্ষায় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সমর্থ হয়েছে। তবে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে উচ্চ শিক্ষিতের আধিক্যের ফলে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বৃদ্ধি, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিশেষত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রয়োজনের অধিক বিশেষ বিশেষ ফলিত বিষয়ে অধ্যয়নের সুযোগ, আধুনিক ও যুগপোযোগী শিক্ষাক্রমের অভাব, পছন্দের বিষয় না পাওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় স্তরেও ঝরে পড়া, মৌলিক বিষয় সম্পর্কিত গবেষণাগার ও চাকুরী না থাকা, কারিগরী শিক্ষা গ্রহণের সুযোগের স্বল্পতা, সহজ, সাবলীল, আধুনিক ও নির্ভুল পাঠ্য বইয়ের অভাব, কোচিং নির্ভরতা, অপর্যাপ্ত শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত, গ্রামাঞ্চলে ইংরেজি, বিজ্ঞান, গণিতের শিক্ষকের অভাব নতুনভাবে শিক্ষাবিজ্ঞান ও শিক্ষানীতির বাস্তবায়নে রাষ্ট্রের সদিচ্ছা বিচারের দাবী রাখে।
সময় বিবেচনায় রাষ্ট্রীয় উন্নয়নকে টেকসই ও সমতার স্তরে উপনীত করতে রাষ্ট্রকেই যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট